Book Review

চোখের বালি: বিনোদিনী কি খলচরিত্র? (বুক রিভিউ )

ইশরাত জাহান

ইশরাত জাহান

অনিন্দ্য সুন্দরী, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও কর্তব্যপরায়ণা অকাল বিধবা বিনোদিনী, সংসারের সর্বময় কর্ত্রী ও পুত্রস্নেহে অন্ধ রাজলক্ষ্মী, অনভিজ্ঞা বালিকাবধূ আশালতা, আত্মদম্ভী মহেন্দ্র আর সুষম ব্যক্তিত্বের বিহারী- এই চরিত্রকতক নিয়েই আবর্তিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের চতুর্থ উপন্যাস ‘চোখের বালি’। তবে উপন্যাসটিতে আরো একটি চরিত্র রয়েছে যার উল্লেখ করতেই হয় – শ্বাশ্বত বাঙালি নারীর নিষ্কলুষ স্নেহশীলতা ও কল্যাণময়তার প্রতিচ্ছবি ‘অন্নপূর্ণা’।

১৯০৩ সালে সর্বপ্রথম এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এবং বিভিন্ন সময়ে রুশ, চীনা, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, জার্মান, কন্নড়, মারাঠি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটিসহ আরো বেশ কিছু ভাষায় অনূদিত হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস চোখের বালি। পারিবারিক গণ্ডিতেই মূলত তা চিত্রায়িত হয়েছে, সমাজ বা পারিপার্শ্বিকতার অবয়বে তেমন নয়। মানব-চরিত্রের নিরন্তর জটিলতা, সম্পর্কের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সূক্ষ্ম অনুভূতির সাথে প্রবৃত্তির সংঘাতের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই উপন্যাসটির উৎকর্ষতার প্রমাণ মেলে এর ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্রের বিন্যাসে।

চোখের বালিউপন্যাসটির খসড়া নাম ছিলো ‘বিনোদিনী’। এই নামটি থেকেই উপন্যাসের মূল চরিত্রকে খুঁজে পাওয়া যায়। বিধবা, কিন্তু স্বাধীন ও সংস্কারমুক্ত বোধের বিনোদিনী চরিত্রটির মনের গতিক সরল নয়, বরং সর্পিল। আর তার সাথে যে চরিত্রটি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, আত্মম্ভরি সে চরিত্রটি হলো মহেন্দ্র। উপন্যাসের সমগ্র চরিত্রগুলির চেয়ে মহেন্দ্র চরিত্রটিই তুলনামূলকভাবে জটিলতাহীন। মহেন্দ্রের যাবতীয় সংকটের মূলে রয়েছে তার নিজের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য। মহেন্দ্রের মাতৃভক্তি তার মা রাজলক্ষ্মীর মনে যে অতিরিক্ত স্নেহ ও বিধ্বংসী প্রশ্রয়ের সৃষ্টি করেছে, সেই  স্নেহই মহেন্দ্রের প্রবৃত্তি-সর্বস্ব স্বভাবধর্মের বাধাহীন অনুশীলনে প্রভাবক হিসেবে কিছুটা কাজ করেছে। যদিও মানসিকভাবে নিতান্ত দুর্বল মহেন্দ্র শৈশব থেকেই আত্মদম্ভী, খেয়ালি ও সংযমহীন। তাই মাতৃবাৎসল্যের আতিশয্যে মায়ের বাল্যসখীর কন্যা বিনোদিনীকে বিয়ের জন্য প্রথমে মত দিলেও মহেন্দ্র নিজের স্বভাবসুলভ খামখেয়ালিপনায় শেষকালে বেঁকে বসে। মহেন্দ্রের এই উচ্ছৃঙ্খল জেদ, ভোগবাদী প্রবৃত্তি ও নারী-রূপে অনাসক্তির মিথ্যে অহমিকা উপন্যাসের ঘটনাবলীকে দিয়েছে গতিময়তা। অস্থিরমতি মহেন্দ্র যে প্রবৃত্তির বশে মায়ের অনুরোধ উপেক্ষা করে বিনোদিনীকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই প্রবৃত্তির বশেই স্বার্থপরের মতো বন্ধু বিহারীর জন্য পাত্রী দেখতে গিয়ে মায়ের অসম্মতি সত্ত্বেও সে পাত্রীকে নিজেই বিয়ে করেছে। মহেন্দ্রের এই আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতাই ভবিষ্যতের সংকটের মূল কারণ। বিয়ের পর আশার সাথে দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রণয়লীলায় তার মাতৃভক্তি ভেসে গেছে খড়কুটোর মতো, বন্ধু বিহারীকে ঠেলেছে দূরে। মহেন্দ্র-আশার নাটকীয় দাম্পত্য জীবনের সূচনায় তাদের পারস্পরিক  অনুরাগ সত্যিই আন্তরিক ছিলো। কিন্তু আশার অপটুতা, আশাকে নিয়ে মহেন্দ্রের প্রণয়াবেগের বাড়াবাড়ি প্রকাশ সমস্ত সংসার থেকে আশাকে করে পৃথক, একগুঁয়ে রাজলক্ষ্মীর মনে আশার প্রতি সৃষ্টি করে আরো বিতৃষ্ণা, আশার মাতৃস্থানীয়া অন্নপূর্ণার সাথে সৃষ্টি করে রাজলক্ষ্মীর কোন্দল। ফলস্বরূপ রাজলক্ষ্মী চলে যান পৈতৃক বাড়িতে, অন্নপূর্ণা চিরতরে গৃহ ত্যাগ করেন। আপাতদৃষ্টিতেতে মহেন্দ্র-আশার নবজীবনকে অনুভূতির রসে টইটম্বুর মনে হলেও, তাতে নিয়মিত জলসিঞ্চনের জন্য যে পারিবারিক বন্ধন, দায়িত্ব-কর্তব্যের স্বাভাবিক বেড়াজাল প্রয়োজন তা শিথিল হয়ে যাচ্ছিলো।আদতে তাতে ঢিলে হচ্ছিলো পারিবারিক সংহতিই। মহেন্দ্রের উথালপাথাল প্রেমে ডুবন্ত ও মোহগ্রস্ত আশা সংসারের অমঙ্গল ক্রমাসন্ন বুঝেও  বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব ও সংকোচের দরুন মহেন্দ্রের বাসনাবিলাসকে নিবৃত্ত করার কোনো চেষ্টাই করতে পারেনি। সেখানেই তার অক্ষমতা ও অযোগ্যতা প্রমাণিত হয়। উৎকটভাবে প্রকাশিত তাদের দৃষ্টিকটু প্রেমময় জীবনও একসময় হারিয়ে ফেলে ছন্দ, হেঁটে চলে অনিবার্য ধ্বংসের দিকে। মহেন্দ্রের একসময়ের প্রত্যাখ্যাত বিনোদিনীর প্রবেশ তাই সহজেই সে সংসারের দুর্বলতা খুঁজে নেয়। বিধবা বিনোদিনীর সাথে মহেন্দ্রের সমাজ-অস্বীকৃত সম্পর্কে নানা ভাবানুভূতির দোলাচলে প্রকাশিত হয়েছে মানবহৃদয়ের বিচিত্র গতিরেখা। তবে মহেন্দ্র চরিত্রটিও অন্তর্দ্বন্দ্বে জ্বলেছে। একদিকে নিষ্কলুষ আশার খাদহীন ভালোবাসা, অন্যদিকে বিনোদিনীর প্রতি তার রাশছাড়া আকর্ষণ ইত্যাদি নিয়ে মহেন্দ্রও দোলাচলে ভুগেছে। বিবেককে ঘুম পাড়ানো মহেন্দ্র ও নিষ্পাপ আশার জীবনের এই সকল ক্রান্তিকালে বিহারী চরিত্রটি বরাবর স্ব-মহিমায় চিত্রিত হয়ে এগিয়ে এসেছে কল্যাণময় চিন্তা নিয়ে। উপন্যাসের শুরুর দিকে বিহারীকে কেবলই মহেন্দ্র ও তার পরিবারের একটা ছায়ারূপ মনে হলেও, উপন্যাসের ব্যাপ্তির সাথে সাথে ফুটে উঠেছে তার স্বাতন্ত্র্য। পরহিতব্রত, সংযমী জীবনাচার, কর্মপরায়ণতা, চেতনার গভীরতা ইত্যাদি সকল দিক থেকেই মহেন্দ্রের চেয়ে উন্নত প্রতিভাত হয়ে বিহারী পাঠকের ভক্তি ও ভালোবাসা  দাবি করে। উপন্যাসটির সবচেয়ে সুবিবেচক ,স্বাবলম্বী চরিত্র বিহারী চিরকালের নিঃসঙ্গ ও স্নেহকাতর। নিজের ভাবাবেগের বিষয়ে সে ছিলো নির্বিকার। তার চারিত্রিক দৃঢ়তা ও স্বকীয়তার সাথে প্রথম হৃদয়াবেগের জাগরণ ঘটে আশাকে ঘিরে। কিন্তু মহেন্দ্রের একান্ত স্বার্থপরতায় সে ভীরু ভালোবাসা পরিণতিহীন হয়ে রয়ে যায়। পরবর্তীতে আশার প্রতি বিহারীর এই শুদ্ধ অনুভূতিটি নিয়ে মহেন্দ্রের কুৎসিত বাক্যবাণ তাদের দাম্পত্যজীবনের সুখের জন্য বিহারীর কল্যাণ-প্রচেষ্টাকে করেছে কলঙ্কায়িত। বিনোদিনীর প্রতি বিহারীর সংযম ও ভাবনায় তার সুউন্নত পৌরুষ পাঠকের আরো মন কাড়ে।

বিনোদিনী কী খল চরিত্র? উপন্যাসটি একটু অভিনিবেশ নিয়ে পড়লে দেখা যায় মহেন্দ্র-আশার জীবনের দুঃখময় লজ্জাজনক অধ্যায়টির জন্য বিনোদিনীর ভূমিকা তত মুখ্য নয়। অস্থিরমতী মহেন্দ্রের কান্ডজ্ঞানহীনতা, অনিয়ন্ত্রিত ভাবাবেগ ও তার ‘আমিত্ববাদ’ই বহুলাংশে দায়ী। এছাড়াও আশার প্রতি রাজলক্ষ্মীর বিরাগের ফলস্বরূপ দৈনন্দিন জীবনের তিক্ততা রাজলক্ষ্মীকে প্রভাবিত করেছে আশাকে অস্বীকার করে সংসারে বিনোদিনীর কর্তৃত্ব সৃষ্টি করতে। সেই সাথে আশার অত্যধিক সরলতা, পরনির্ভরতা, কুণ্ঠাবোধ স্ত্রী হিসেবে তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যেমন অন্তরায় হয়েছে, তেমনি তার অযোগ্যতা মহেন্দ্রকে বেঁধে রাখার বেলায়ও বারবার প্রমাণিত হয়েছে যা পরবর্তীতে ভবিষ্যতের বিচ্ছেদকে ত্বরান্বিত করেছে।তাই মনোলোভা বিনোদিনীর লাস্যময়ী হাব-ভাব থাকা সত্ত্বেও একথা স্বীকার করতেই হয় যে, কোনো গোপন দুর্বলতা না থাকলে বিনোদিনী কখনোই মহেন্দ্রের সংসারে অশনি সংকেত হয়ে প্রবেশ করতে পারতো না। মহেন্দ্র-আশার আপাতমধুর সংসারের অনুক্ত ফাটলে বিনোদিনী কেবল সলতে উসকে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে বিনোদিনীকে খলচরিত্র বলা চলে না, সে ছিলো কেবল উপসর্গ মাত্র। অকাল বিধবা এই নারীর ব্যর্থ যৌবনের অন্তর্জ্বালা, অতৃপ্ত আদিম কাম, মহেন্দ্রের ভোগলালসা, মহেন্দ্র আশার প্রেমের বেসামাল অভিব্যক্তি ইত্যাদি সমস্ত কিছুতেই ক্ষুধিত বিনোদিনীর মনে জেগে উঠেছিলো খামখেয়ালি মহেন্দ্র কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপমানবোধ ও যন্ত্রণা। চিরযৌবন প্রেমসুধাবঞ্চিত এই নারীর প্রতিশোধস্পৃহা আরো জ্বলে ওঠে অযোগ্য আশার প্রতি সকলের ভালোবাসায়। আশার চেয়ে নিজেকে যোগ্য প্রমাণের এই শক্তি পরীক্ষার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলাফল হয় ভয়াবহ। মহেন্দ্রকে ভালো না বাসলেও তার ওপর মোহময়তার যে ইন্দ্রজাল বিস্তার করে বিনোদিনী, একসময় তাতে সে নিজেই  জড়িয়ে যায়। আশার সাথে খেলার ছলে পাতানো সম্পর্কের ‘চোখের বালি’ নামকরণে সে কী আশাকে তার চক্ষুশূল ভেবেছিলো? নাকি নিজে একসময় আশার চক্ষুশূল হবে বলেই এই তিক্ত-বাস্তব বাগধারাটিকে বেছে নিয়েছিলো? আশার প্রতি তার মিথ্যে আন্তরিকতাই এর উত্তর দেয়।

প্রথমে বিহারীর চক্ষুশূল হলেও পরে তার সাথে কথোপকথনে বিনোদিনীর  বিলাসী ও ছলনাময়ী নারীচরিত্রের বিপরীতে ফুটে উঠেছে ভীরুতার সৌন্দর্যমণ্ডিত এক কোমল ও শুভ্র নারীসত্ত্বা। এর বিনিময়ে মাধুর্যময় ও পবিত্র ভালোবাসার সত্য সম্ভাষণে সে পেয়েছে বঞ্চিত জীবনের পরম পাওয়া- বিহারীর গভীর আস্থা, মিটেছে তার আজন্মের প্রণয়জ্বালা।

এই মায়াবিনী বিনোদিনীরই অন্যরূপ প্রকাশিত হয়েছে পৌরুষদীপ্ত বিহারীর কাছে। মহেন্দ্রের বেপরোয়া আচরণের বাড়াবাড়িতে যখন বিনোদিনীর মনে জেগেছে তার প্রতি  নগ্ন ঘৃণা, বিহারীর কাছে নিজেকে সমর্পণের মাধ্যমে তার নারীত্ব খুঁজেছে নির্ভরতায় আশ্রয়। প্রথমে বিহারীর চক্ষুশূল হলেও পরে তার সাথে কথোপকথনে বিনোদিনীর  বিলাসী ও ছলনাময়ী নারীচরিত্রের বিপরীতে ফুটে উঠেছে ভীরুতার সৌন্দর্যমণ্ডিত এক কোমল ও শুভ্র নারীসত্ত্বা। এর বিনিময়ে মাধুর্যময় ও পবিত্র ভালোবাসার সত্য সম্ভাষণে সে পেয়েছে বঞ্চিত জীবনের পরম পাওয়া- বিহারীর গভীর আস্থা, মিটেছে তার আজন্মের প্রণয়জ্বালা। উপন্যাসে মানবচরিত্র ও মনের যে বিচিত্র ঘূর্ণাবর্ত অঙ্কিত হয়েছে, তাতে ঘটনার সৃষ্টিতে লেখক যতটা জীবনমুখী করার চেষ্টা করেছেন, ঘটনার মিলনান্তক পরিণতিতে ততটা হয়তো লক্ষ্যণীয় হয় না। বরং সমাজখুশি করা যবনিকাপাত চোখে পড়ে। তবু রবীন্দ্রনাথের লেখা মানেই গভীর অনুভূতিবোধে সিক্ত হয়ে জীবনকে কাছ থেকে দেখা। তাই তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে  বিধবা নারীদের যে পরিণতি, বিহারীর সম্মতিতে সত্য প্রেমের গন্তব্যবিন্দুতে পৌঁছালেও তাতে বিনোদিনীর চূড়ান্ত অসম্মতি প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ও সামাজিক যৌক্তিকতায় বাস্তবসিদ্ধ। চিরকাল নিয়ম-নীতিকে তুচ্ছজ্ঞান করে  চলা বিনোদিনীর এই অন্য অনন্য রূপ আর বিহারীর সাথে তার অসমাপ্ত প্রণয়েই যেন উপন্যাসটির সাহিত্য-রস সার্থক হয়েছে।


ইশরাত জাহান

  • বি. এ (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ,
  • তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ,
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close