Blog Post

বাংলাদেশের গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের জনকঃ জীবন ও কর্ম

মোঃ মাইন উদ্দীন হাসান, লাইব্রেরিয়ান, ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ, ঢাকা

মুহাম্মদ সিদ্দিক খান (এম. এস. খান)


বাংলাদেশের গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের জনক মুহাম্মদ সিদ্দিক খান (এম.এস.খান) ১৯১০ সালের ২১ মার্চ বর্তমান মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতিৃক নিবাস টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার ধুবুরিয়া গ্রামে। ছোট বেলায় তিনি তাঁর বাবাকে হারান। তিনি ইয়াঙ্গুনে তাঁর শৈশব, কৈশোর কাটান। তাঁর পরিবারের পূর্বপুরুষরা মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সন্তানদের শিক্ষার জন্য ইয়াঙ্গুন গমন করেছিলেন।মুহাম্মদ সিদ্দিক খান

ছোটবেলা থেকেই তিনি খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন, তাঁর স্বাক্ষর তিনি তাঁর একাডেমিক পরীক্ষাগুলোতে রেখেছেন। ১৯২৫ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ৪টি বিষয় লেটার মার্কসহ মেধাতালিকায় ৫ম স্থান অধিকার করেন। ১৯২৭ সালে আইএ পরীক্ষাতে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং জার্ডিন পুরস্কার লাভ করেন। ১৯২৯ সালে ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৩২ সালে বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৬ সালে ইতিহাসে এমএ পরীক্ষায় ইয়াকুব আবদুল গণি স্বর্ণপদক লাভ করেন।

এম.এস.খান ১৯৩১ সালে ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) চলে আসেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ইস্ট পাকিস্তান ট্রেডিং করপোরেশনের ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৫০ সালে মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।


১৯৫৬ সালে পাকিস্তান গ্রন্থাগার সমিতি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার বিজ্ঞান বিভাগ (বর্তমানে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৫৭, ১৯৫৮ এবং ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান গ্রন্থাগার সমিতির সহসভাপতির এবং পূর্ব পাকিস্তান গ্রন্থাগার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এশিয়ান ফেডারেশন অব লাইব্রেরি এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দ্যা ইস্টার্ন লাইব্রেরিয়ান সম্পাদনা করেন।


১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোয়াজ্জেম হোসেনের সচিব হিসেবে যোগদান করেন। উপাচার্য হিসেবে ডব্লিও এ জেনকিন্স অধিষ্ঠিত হলে ১৯৫৪ সালে এম.এস. খানকে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে পড়ার জন্য লন্ডনে পাঠানো হয়। ১৯৫৪ সালে তিনি লন্ডনে আসেন এবং অধ্যাপক আরউইনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়মিত কোর্সের কাজ শুরু করেন এবং কোর্স শেষে তিনি এক একাডেমিক বছর গ্রেট ব্রিটেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন বিখ্যাত গ্রন্থাগারগুলোতে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। তিনি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। তিনি অধ্যাপক আরউইনের তত্ত্বাবধানে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত লন্ডন স্কুল অফ লাইব্রেরিয়ানশিপ অ্যান্ড আর্কাইভস-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক তত্ত্ব ও অনুশীলনের উপর দুই বছরের কোর্স সম্পন্ন করার পর দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগদান করেন।


“জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে। বাংলা একাডেমী ১৯৯৪ এবং ১৯৯৬ সালে তাঁর দুটি সংকলন গ্রন্থঃ মুহাম্মদ সিদ্দিক খান রচনাবলি ১ম খন্ড এবং Complete Works of Muhammad Siddiq Khan Vol-2 শিরোনামে বের করে। পান্ডিত্যপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে রয়েল হিস্টরিক্যাল সোসাইটির ফেলো প্রদান করা হয়। জাতীয় জীবনে তাঁর অবদানের স্বীকৃতস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করেন।”


১৯৫৬ সালে পাকিস্তান গ্রন্থাগার সমিতি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৭ সালে বার্ষিক সাধারণ সভায় সমিতির প্রথম কার্যকরী পরিষদের সভাপতি ছিলেন। গ্রন্থাগার সমিতি সর্বপ্রথম বাংলাদেশে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের উপর সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেন। তথ্যনির্ভর সমাজে জাতির ইতিহাস, ঐহিত্য, সংগ্রহ ও সংরক্ষণকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে দক্ষ গ্রন্থাগারিক গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার বিজ্ঞান (তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ) বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। ৩০ জুন, ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি গ্রন্থাগার বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান থাকাকালীন অবসরগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৭, ১৯৫৮ এবং ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান গ্রন্থাগার সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) গ্রন্থাগার সমিতির সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও তিনি ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এশিয়ান ফেডারেশন অব লাইব্রেরি এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি হলিডে এবং বাংলাদেশ অভজারভারে কলাম লিখতেন। এছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সংবাদ বুলেটিন প্রকাশ করেন। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দ্যা ইস্টার্ন লাইব্রেরিয়ান সম্পাদনা করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে তাঁর রচিত উল্লেখ্যযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনের গোড়ার কথা (বাংলা ১৩৭১), গ্রন্থাগার সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির উপায় (১৯৫৯), সহস্র বলাকা (১৯৬২), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিকথা (১৯৬৮)। বাংলা একাডেমী থেকে ১৯৯৪ ও ১৯৯৬ সালে তার দুটি সংকলন গ্রন্থ: মুহাম্মদ সিদ্দিক খান রচনাবলি ১ম খন্ড এবং Complete Works of Muhammad Siddiq Khan Vol-2 শিরোনামে বের হয়েছে। আমৃত্যু তিনি এ পেশার সাথে জড়িত থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণে জ্ঞানের আলো বিতরণ করে গেছেন। ১৯৭৮ সালের ১৩ আগস্ট মুহাম্মদ সিদ্দিক খানের কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে অবদানের জন্য তাকে বাংলাদেশের গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।

তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ অবদানের জন্য রয়েল হিস্টরিক্যাল সোসাইটির ফেলো প্রদান করা হয়েছিল। সামগ্রিক কর্মময় জীবনের অবদান এবং দেশ ও জাতির মাঝে জ্ঞানের আলো বিতরণের পথপ্রদর্শক হিসেবে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে তাকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।


তথ্যসূত্র:

  • উইকিপিডিয়া
  • বাংলাপিডিয়া
  • বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি

লেখকঃ মোঃ মাইন উদ্দীন হাসান,মোঃ মাইন উদ্দীন হাসান

লাইব্রেরিয়ান, ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ, ঢাকা

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close