Blog Post

ড্রাগনের দেশে ISLM পরিবার : শিক্ষা সফর ২০১৯, ২৩ তম ব্যাচ (ISLM-RU)

আলাউদ্দিন চৌধুরী পলাশ এবং এস. এম. লিমন

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি আকর্ষণ শিক্ষা জীবনের শেষ অধ্যায়ের স্টাডি ট্যুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের ন্যায় আমরাও শিহরিত ছিলাম কবে-কখন-কোথায় হবে আমাদের শিক্ষা সফর, দেশে নাকি বিদেশে? অনেক আলোচনা, অনেক জল ঘোলা হবার পর সিদ্ধান্ত আসে আমাদের স্টাডি ট্যুর ভারত ও ভুটানে হবে। দেশের বাইরে স্টাডি ট্যুর হবে শুনে আমার মতো যারা বিদেশ সফর ও অচেনা-অজানাকে জানতে আগ্রহী তাদের সবাই উচ্ছ্বসিত ও পুলকিত হয়েছে, আর অধির আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। বিদেশে স্টাডি ট্যুরের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অপরিহার্য উপাদান প্রয়োজন যেমন – শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাসপোর্ট, ভিসা, অর্থ ও ভ্রমণইচ্ছু দেশের অনুকূল আবহাওয়া। ট্যুরের সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষক সহযোগি অধ্যাপক জনাব নাজমুল হাসান স্যার, ট্যুর কমিটির আহ্বায়ক। কমিটির সদস্য সহকারি অধ্যাপক মো: মাহবুবুল ইসলাম; সহযোগি অধ্যাপক একেএম ইয়ামিন আলি আকন্দ স্যার; সহকারি অধ্যাপক পারভিন সুলতানা (ইলা) ম্যাম; খালিদ ফেরদৌস ( ডিউক) স্যার, সহকারি  অধ্যাপক জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি এবং কিছু উদ্যোমী শিক্ষার্থীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সব আয়োজন সফল ভাবে সম্পন্ন হয়। প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরের বাসনা পূরণের অপেক্ষা যেন আর ফুরোতে চায়না। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আসে স্বপ্ন পূরণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৩  ডিসেম্বর ২০১৯ প্রথম প্রহরে আমাদের ট্যুর টিম ভুটানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

ফুন্টসলিং:

খুব পরিচ্ছন্ন একটি দেশের নাম ভূটান, যে দেশ এর নাম শুনলেই চোখে ভাসে সবুজে ঘেরা একটি দেশ, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত মনোরম দৃশ্যে ভরা চারপাশ। ভূটানে আসলে আলাদা করে দেখার কিছু নাই, পুরো ভূটানটাই হচ্ছে দেখার মত। ভূটানের ভূ-প্রকৃতি সুইজারল্যান্ডের সদৃশ বলে দেশটিকে এশিয়ার সুইজারল্যান্ড বলা হয়। বহির্বিশ্ব থেকে বহুদিন বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ভূটান প্রাণী ও উদ্ভিদের এক অভয়ারণ্য। সড়কপথে যারা ভুটান ভ্রমণ করে তাদের জন্য ফুনটসলিং এন্ট্রি ও এক্সিট রুট।আমারা ভারতের জয়গা বর্ডার দিয়ে ভূটানের ফুন্টসলিং শহরে প্রবেশ করি। ভূটান গেট পেরিয়ে ফুন্টসলিং এ যখন প্রবেশ করি তখন সারাদিন আলো বিলিয়ে ক্লান্ত সূর্যটা উজ্জ্বল আাভা ছড়িয়ে অস্ত যাওয়ার অপেক্ষায়।চেংড়াবান্দা এক্সিট পয়েন্ট ভারত

উজ্জ্বল আভায় ছিমছাম, পরিস্কার , গোছানো, ট্রাফিক এর লালবাতিহীন শহর দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। বিধাতা যেন তার নিপুন হাতের কারুকার্য এখানে উজার করে দিয়েছেন। গোধুলিতে ভূটানের ফুন্টসলিং শহরের অপার সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় ম্লান হয়ে গিয়েছিলো দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি। মুগ্ধতা ছড়িয়ে সাঁঝের বেলায় ক্লান্ত পাখিদের নীড়ে ফেরার ন্যায় আমরাও পূর্ব নির্ধারিত হোটেল দামচেনে উঠে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে ইমিগ্রেশন পর্ব শেষ করে হোটেলে ফিরে প্রথমবারের মতো ভুটানের খাবারের স্বাদ গ্রহন করি। পরের দিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ভুটানের রাজধানী থিম্পুর উদ্দেশ্যে রওনা করতে হবে এ জন্য শিক্ষকদের নির্দেশমতো থিম্পুর সৌন্দর্য দেখার অধির আগ্রহ নিয়ে সবাই ঘুমোতে যাই।

থিম্পু:

ভুটানের রাজধানী থিম্পু হচ্ছে হিমালয়ের পাদদেশের সর্ববৃহৎ শহর। পাহাড়ের খাজ কেটে কেটে গড়ে তোলা হয়েছে এই চোখ ধাঁধানো দৃষ্টিনন্দন শহর। থিম্পুর নৈসর্গিক দৃশ্য অসম্ভব সুন্দর। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে পাহাড় ঘিরে সাজিয়ে রেখেছে তার সন্তান থিম্পু কে। ৪ ডিসেম্বর সকালে আমরা ট্যুর এজেন্সির গাড়িতে থিম্পুর পথে যাত্রা শুরু করি। পাহাড় কেটে তৈরী আঁকাবাকা রাস্তা ধরে পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা থিম্পুর দিকে যেতে থাকি। মাঝে মধ্যে পাহাড়ের নিপুন সৌন্দর্য ফ্রেমবন্দি করতে থাকি।

১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যখন আমরা থিম্পু পৌছালাম তখন দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। থিম্পুতে গিয়ে আমরা প্রথমে দেখতে যাই বৌদ্ধ মন্দির , যেটি পহাড়ের চূড়ায় ১৬৯ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত যা কিনা বিশ্বের বৃহত্তম বৌদ্ধ মন্দির। যখন আমরা বৌদ্ধ মন্দিরের নিকট পৌঁছাই তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আর হিমালয়ের প্রচন্ড হিম শীতল বাতাস। এতো শীতে আমরা অভ্যস্ত নই তবুও এই স্থানটির সৌন্দর্য দেখে আমার মধ্য দিয়ে আবেগের উষ্ণতা বয়ে চলছিল অবিরাম। এ দিনটি আমরা বৌদ্ধ মন্দির দেখেই আমাদের হোটেলে ফিরে আসি। পরের দিন ৫ ডিসেম্বর আমরা ভুটানের ন্যাশনাল মিউজিয়াম, ন্যাশনাল লাইব্রেরি ও ফার্মারস মার্কেট ঘুরে দেখি। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে আমরা ভুটানের শিক্ষা বিভাগের পরিচালকের সাথে একটি মতবিনিময় সভায় মিলিত হই। পরিচালকের মুখে আমরা ভুটানের বিভিন্ন ভবিষ্যত উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হই। থিম্পুর সিগন্যাল বিহীন রাস্তায় সুশৃঙ্খল গাড়ীর সারি, ভিক্ষুকমুক্ত পথ প্রান্তর দেখে আমরা বাংলাদেশি হিসাবে বিস্মিত না হয়ে পারিনা।

দোচালা পাস:

৬ ডিসেম্বরে সকালে আঁকাবাকা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে আমাদের গাড়ি চলছে দোচালা পাস এর উদ্দেশ্যে। ট্যুর গাইড- এল দর্জির ভাষ্য মতে, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলেই কেবল দোচালা পাস এর সৌন্দর্য দৃষ্টিগোচর হয়। অধিক উচ্চতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারনে দোচালা পাসের আকাশ অধিকাংশ সময় মেঘাচ্ছন্ন থাকে। তবে আমরা রৌদ্রজ্জ্বল স্বচ্ছ আকাশ পেয়েছিলাম, এমনটা সচারাচর দেখা যায়না, সবই স্রষ্টার কৃপা, ভাগ্য সুপ্রসন্ন আমাদের। প্রকৃতির ক্যানভাসে অসামান্য সৌন্দর্য বৌদ্ধ মনাস্ট্রির পবিত্রতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দোচালা পাস এর হিমালয় পর্বতমালা। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর স্রষ্টার এ নিদর্শন। খুব কাছ থেকে হিমালয় উপত্যকা দেখে যারপরনাই অভিভূত ছিলাম। মেঘেদের রাজ্য ছাড়িয়ে অবস্থান করছি তারও উপরে। অতিরিক্ত উচ্চতার কারনে এ পরিবেশে ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লেগেছিলো প্রথমটায়, শরীর গুলিয়ে আসছিলো, বমি হাওয়ার উপক্রম প্রায়। দেখি সবাই একহাত শূন্যে ভাসিয়ে সাহাদাত আঙুল দিয়ে কি যেনো নির্দেশ করছে, দৌড়ে গিয়ে চিরচেনা সেই ফ্রেমে বন্ধি হলাম। দোচালা পাস এর সৌন্দর্য বর্ণনায় প্রকাশ করার মতো না এবং ছবিতেও তার পূর্ণতা প্রকাশ পায় না।

পারো পর্ব:

শান্ত, সুন্দর সাজানো গোছানো ভূটানের ছোট্ট শহর পারো। উপত্যকা শহরটির মধ্যদিয়েই বয়ে চলেছে হিমশীতল চু-নদী। পারোর পথে প্রবেশের পর কিছুক্ষণ শুধুই এবড়ো-খেবড়ো ন্যাড়া পাহাড়। এখানে বড় গাছ খুব একটা দেখলাম না। কোথাও বা শুধুই রুক্ষ পাহাড়, ধ্বস নেমেছে কোথাও কোথাও। দৃশ্যপট বদল হলো ধীরে। পাথুরে পাহাড়ের গায়ে বিচিত্র রকম বনফুলযুক্ত ছোট ছোট ঝোপ, নাম না জানা বাহারি গাছ।

সবুজে ঢাকা পাহাড়ি রাস্তা পাহাড়ের গায়ে সবুজ কখনো বা হলুদ পাতার পাইন গাছের সারি, সঙ্গে শুভ্রমেঘের লুকোচুরি- তার উপর আকাশনীলের খেলা। মাঝে মধ্যেই দূর পাহাড়ে উঁকি দিচ্ছে দৃষ্টিনন্দন স্বচ্ছ পানির ঝরনা। পারোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর স্থান হলো টাইগার নেস্ট (এটি একটি বৌদ্ধ মনেস্ট্রি)। টাইগার নেস্টে উঠা অনেক সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। সমতল থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার ওপরে। হেঁটে উঠতে হয় ১০ হাজার ফুটের ওপর। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা টাইগার নেস্টে পৌঁছতে হলে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টা ট্রেকিং করতে হবে। উদ্যমী মাহবুব স্যার ও নাজমুল হাসান স্যারকে সঙ্গে নিয়ে কণ্টকাকীর্ণ এ দূর্গম যাত্রা শুরু করি, মেঘ ও সবুজের সঙ্গে রোমাঞ্চকর এ পথচলা। মাঝপথে মাহবুব স্যার খালিদ ফেরদৌস স্যারসহ কয়েক জন অপারগ হলেও আল্লাহর অশেষ কৃপায় নাজমুল হাসান স্যারকে সঙ্গে নিয়ে আমরা অধিকাংশই পাহাড় চূড়ায় উঠতে সক্ষম হয়েছিলাম।

একে এম ইয়ামিন আলি আকন্দ স্যার, পারভিন সুলতানা ম্যাম পাহাড়ে না উঠলেও বোধ করি দূরথেকে এর সৌন্দর্য দেখে তৃপ্ত হয়েছেন। এ শহরেই আছে ৭,২০০ফুট (২২০০মিটার) উচ্চতায় অবস্থিত ভুটানের একমাত্র বিমানবন্দর যা পৃথিবীর বিপদজনক বিমানবন্দরগুলির অন্যতম। ফিরতি পথে ড্রাইভার প্রেমাদা দেখালো ডানপাশে পারো এয়ারপোর্ট এর রানওয়ে। বলতে বলতেই আকাশ ভেদ করে মাথার ওপর থেকে একটা প্লেন উড়ে এল, এমন উন্মুক্ত এয়ারপোর্ট দেখে সত্যি বিস্মিত হলাম। পারোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এককথায় অনবদ্য। সর্বত্রই একটি শান্ত সৌম্য ও স্নিগ্ধ পরিবেশ বিরাজমান। ভুটানের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকেই বলেছেন এই ভূস্বর্গে একবার নয়, বারবার যেতে হয়। ৭ তারিখ বিকেলে পারো থেকে ফুন্টসলিং এর উদ্দেশ্য রওয়ানা হই, ৭ তারিখ হোটেল দামচেনে রাএি যাপন করে পরদিন ৮ ডিসেম্বর সকালে ইমিগ্রেশন শেষ করে জয়গা থেকে বাংলাবান্ধা বর্ডার হয়ে ৯ ডিসেম্বর সকালে সবাই সুস্থভাবে মতিহারের সবুজ চত্বরে ফিরে আসি


গ্যালারি


বৌদ্ধ টেম্পল, পারো
বৌদ্ধ টেম্পল, পারো
জাতীয় গ্রন্থাগার -থিম্পু
 জাতীয় গ্রন্থাগার -থিম্পু
জাতীয় জাদুঘর –থিম্পু
                                                                                                   জাতীয় জাদুঘর –থিম্পু
বৌদ্ধ মনাস্ট্রি- দোচালা পাস, পারো
                                                                                      বৌদ্ধ মনাস্ট্রি- দোচালা পাস, পারো
হিমালয় উপত্যকা- দোচালা পাস
হিমালয় উপত্যকা- দোচালা পাস
ভুটানের জাতীয় পোশাক পরিধান করে, ভুটানের শিক্ষা বিভাগের পরিচালকের সাথে মতবিনিময় সভার একাংশ
ভুটানের জাতীয় পোশাক পরিধান করে, ভুটানের শিক্ষা বিভাগের পরিচালকের সাথে মতবিনিময় সভার একাংশ
টাইগার নেস্ট অভিমুখে যাএা
                                                                                          টাইগার নেস্ট অভিমুখে যাএা
পাহাড় চূড়ার লক্ষ যখন দৃষ্টি সীমায়
পাহাড় চূড়ার লক্ষ যখন দৃষ্টি সীমায়
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close