Blog Post

ভারতীয় পেটেন্ট আইনে পেটেন্ট সুরক্ষিত কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধক ব্যবহারের অধিকার ও সুযোগ

ডঃ সবুজ কুমার চৌধুরী

ডঃ সবুজ কুমার চৌধুরী

  • সহযোগী অধ্যাপক, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ,
  • কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ।
  • ইমেইল- sabujkchaudhuri@caluniv.ac.in

জোনাস সাল্ক ১৯৫৫ সালে পোলিও রোগের প্রতিষেধক আবিস্কার করে সারা বিশ্বকে এই মারণ রোগ হতে রক্ষা করেছিলেন। উনাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন-“এই প্রতিষেধকটিক পেটেন্ট কার?” তার উত্তরে তিনি বলেছিলেন-“এই প্রতিষেধকটির কোন পেটেন্ট নেই।” উনি আরো বলেছিলেন-“আপনি কি সূর্যের পেটেন্ট পেতে পারেন?” (Johnston & Wasunna, 2007) যখনই কোন একটি রোগ মহামারী অথবা অতিমারীর আকার ধারণ করে ও জনসবাস্থ্যকে বিপন্ন করে তোলে তখন তার নিয়ন্ত্রণের জন্য অবিমম্বে ঔষধ আবিস্কারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সাধারণতঃ কোন শিল্প-প্রয়োগ সম্পন্ন ও উদ্ধাবনী পদক্ষেপ যুক্ত মৌলিক উদ্ভাবনের জন্য উদ্ভাবককে পেটেন্ট দেওয়া হয়। উদ্ভাবক একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার (২০ বছর) জন্য পেটেন্ট পেয়ে থাকেন এবং তার পরিবর্তে তাকে তার উদ্ভাবনকে প্রকাশ করতে হয়। পেটেন্ট আসলে সমাজ ও উদ্ভাবকের মধ্যে একটি চুক্তি। ঔষধ, প্রতিষেধক ও আন্টিবাযোটিকের পেটেন্টের দুটো দিক থাকে-একটি অরথনৈতিক আর একটা নৈতিক। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে- পেটেন্টের বিকল্প হিসেবে আমরা কোন মৌলিক উদ্ভাবনকে উপযুক্তভাবে পুরস্কৃত করার কথা ভাবতে পারি, কারণ পেটেন্টই মৌলিক উদ্ভাবনকে সম্মান জানানোর একমাত্র উপায় হতে পারে না। TRIPS (Trade Related Aspects of Intellectual Property Rights) এর মাধ্যমে পেটেন্টের যে সঙ্গতিপূর্ণ (harmonised) নীতি সমগ্র বিশ্বসহ ভারতেও কার্যকরী হয়েছে, তা ভারত ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের বহুত্ব মূল্যবোধের (value pluralism) বিরোধী (Chaudhuri, 2020)। TRIPS- একটি মেধা সম্পত্তি অধিকার সম্পর্কিত বাণিজ্যিক বিষয়ক বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা ১ই জানুযারী, ১৯৯৫ সালে প্রথম কার্যকর হয়। এই চুক্তি, সদস্য দেশসমূহকে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স (compulsory licensing) দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছে। ভারত, TRIPS-র অন্যতম সদস্য।

সারা বিশ্বে হাতে গোনা কিছু দেশ বাদ দিলে ১৮৮ টি দেশ কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এখনো পর্যন্ত এই মারণ রোগে সারা বিশ্বে প্রায় ৪ লক্ষ্য লোকের এবং ভারতেও প্রায় ৭ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছে। ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের বাঁচিয়ে তুলতে। ভারতসহ সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞানীরা এই মারণ রোগের প্রতিষেধক ও ঔষধ উদ্ভাবনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। পেটেন্ট ও ঔষধের জটিল সমীকরণ এখনই আমাদের মনে প্রশ্ন এনে দিচ্ছে- এই কোভিড-১৯র প্রতিষেধক আমাদের মতো গরীব দেশের সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকবে কিনা। ভারতীয় পেটেন্ট আইন ১৯৭০-র compulsory licensing বা বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং বলে একটি অধ্যায় বা ধারা আছে। ভবিষ্যতে কোভিড-১৯র প্রতিষেধক বা ঔষধের উদ্ভাবন্টি পেটেন্ট পেলেও ভারত সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং প্রয়োগ করে সাধারণ মানুষের কাছে তা সাশ্রয়ী ও সুলভ রাখতে পারবে।

বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং-এ পেটেন্ট ব্যবহারকারিকে পেটেন্ট মালিকের কোন অনুমতির প্রয়োজন হয় না। তবে লক্ষণীয় বিষয় হল, TRIPS-র সদস্য দেশগুলির জন্য তাদের পেটেন্ট আইনে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স এর সংস্থান করা আবশ্যিক নয়। এই ধারাটি TRIPS দ্বারা স্বীকৃত হলেও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ভারত ও কানাডা ছাড়া অন্য কোন দেশের পেটন্ট আইনে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স-র কোন উল্লেখ নেই। এটা ছাড়াও ভারতের পেটেন্ট আইনে voluntary licensing বা স্বেচ্ছামূলক লাইসেন্সিং এর উল্লেখ আছে- যেখানে পেটেন্ট মালিক আর পেটেন্ট স্বেচ্ছায় আরেকজনকে ব্যবহারের জন্য দিতে পারেন এবং সে বিপরীত প্রকৌশলের   (reverse engineering ) মাধ্যমে সেই পেটেন্ট পাওয়া ঔষধের জেনেরিক উৎপাদন, বিপনণ ও রপ্তানী করতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানি বেয়ারের    (Bayer Corporation) নেক্সাভার (Nexavar) তৈরি করার জন্য ২০১২ সালে ভারতের ন্যাটকো ফার্মাকে (Natco Pharma) প্রথম বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং দেওয়া হয়। এই জীবনদায়ী ঔষধটি লিভার ও কিডনির ক্যান্সারের জন্য ব্যবহৃত হয়।

রেমডেসিভির (Remdesivir ) বর্তমানে কোভিড-১৯র চিকিৎসার জন্য সারা বিশ্বে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ঔষধ হিসাবে বিবেচিত এবং এটি যথাক্রমে ২০১৬, ২০১৯ এবং ২০২০ সালের প্রথম দিকে অনুমোদিত তিনটি ভারতীয় পেটেন্টের বিষয়। অ্যান্টিভাইরাল তৈরিতে বিশেষ দক্ষ আমেরিকান বায়োফর্মাসিউটিক্যাল সংস্থা গিলিয়াড সায়েন্সেস, ইনক (Gilead Sciences, Inc.), ২০২০ সালের মে মাসে চারটি ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থার সাথে স্বেচ্ছামূলক পেটেন্ট লাইসেন্সিং-এর চুক্তি স্বাক্ষর করার কথা ঘোষণা করেছে এবং তাদের ১২৭ টি দেশে রেমডেসিভির তৈরি ও বিক্রয় করার অধিকার দিয়েছে (Nigam & Pathak , 2020)।

বিশ্ব মেধা সম্পত্তি সংস্থার (World Intellectual Property Organization) মহাপরিচালক ফ্রান্সিস গ্যারি, ২৪ শে এপ্রিল ২০২০ ‘বর্তমান সময়’ নামাঙ্কিত এক বিবৃতিতে বলেছেন, “এখন মূল নীতিগত চ্যালেঞ্জটি হলো সমস্ত রকম উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা যাতে একটি প্রতিষেধক বা ঔষধ বা চিকিৎসা এবং নিরাময়ের পদ্ধতি উদ্ভাবিত হতে পারে, পাশাপাশি এমন উদ্ভাবনেও জোর দেওয়া যা সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করে।” কোভিড-১৯ অতিমারী মোকাবিলার বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organisation) পেটেন্টের অধিকার, প্রতিষেধক উদ্ভাবন সংক্রান্ত পরীক্ষার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি স্বেচ্ছামূলক একত্রীভবন (voluntary pool) তৈরির প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।

সুতরাং বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং ও স্বেচ্ছামূলক লাইসেন্সিং ভবিষ্যতে ভারতের নাগরিকদের সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে যাতে কোভিড-১৯র মত মারণ রোগের কোন প্রতিষেধক বা ঔষধের ব্যবহার থেকে আমরা বঞ্চিত না হই। আরো আশার কথা এই যে, সমস্ত বিশ্ব সংস্থাগুলোও কোভিড-১৯র উপর কার্যকারী যে কোন গবেষণালব্ধ ফল ও পেটেন্ট সমগ্র বিশ্ববাসীর মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য জোরালো সওয়াল করছে। আশা করা যায়, আগামী দিনে কোভিড-১৯র কোন প্রতিষেধক বা ঔষধ কোন মানুষেরই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকবে না।


তথ্যসূত্রঃ

  • Chaudhuri, S. K. (2020). Patents on Medical Innovations and Value Pluralism in India: Paradoxes and Choices. Asian Biotechnology & Development Review, 21 & 22(3 & 1), 41–81. Retrieved from http://ris.org.in/sites/default/files/ABDR March 2020_Web-min.pdf
  • Johnston, J., and A.A. Wasunna. 2007. Patents, biomedical research, and treatments: Examining concerns, canvassing solutions. Garrison, NY: Hastings Center.
  • Nigam, A., & Pathak, V. (2020, May 15). Affordable access to Covid-19 drugs: Are voluntary patent licenses here to stay? Retrieved from https://economictimes.indiatimes.com/industry/healthcare/biotech/pharmaceuticals/affordable-access-to-covid19-drugs-are-voluntary-patent-licences-here-to-stay/articleshow/75756605.cms?from=mdr

Acknowledgment: The article was published in  “Vigyan Katha” June 2020 (Special issue). Republished with permission from the Author and Vigyan Prasar, an organization of the Department of Science and Technology, Govt. of India.

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close