Blog Post

গ্রন্থাগারের তথ্য সেবার বর্তমান অবস্থা ও উন্নয়নে ভবিষ্যৎ করণীয়

ড. মোহাঃ আজিজুর রহমান

ড. মোহাঃ আজিজুর রহমান

ড. মোহাঃ আজিজুর রহমান এডিশনাল লাইব্রেরয়িান হসিবেে র্কমরত আছনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তথ্যবহুল এই প্রবন্ধে তিনি বাংলাদেশের গ্রন্থাগার ব্যবস্থার স্বরূপ তুলে ধরছেনে। তুলে এনেছেন বিদ্যমান সমস্যা, এর সমাধান ও সম্ভাবনার কথা।


ভুমিকা: শিক্ষা জনগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার। একটি জাতির শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়- তার জাতীয় আর্দশ, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও আর্থ- সামাজিক জীবন প্রবাহের ছবি, প্রতিবিম্বিত হয় তার আশা- আকাঙ্খা ও পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার পথ নির্দেশ। জাতীয় জীবনকে অজ্ঞানতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে জনগণের মনে গ্রন্থপ্রেম ও গ্রন্থচেতনা জাগিয়ে তোলা নিতান্ত আব্যশক। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সেই চেতনা সৃষ্টি করা সম্ভব। বাংলাদেশে প্রথম বিদেশী শাসন, পরে পাকিস্থানী আমল এমনকি বাংলাদেশ আমলে গ্রন্থাগার প্রচার ও প্রসারের জন্য কোন কার্যকরী আইন পাশ করা হয়নি । গ্রন্থাগারের এই সংকটপূর্ণ অবস্থার কথা বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবীগণ জানলেও কিছু করার ছিলনা তাদের।

দেশ স্বাধীন পরবর্তী সময় শিক্ষা পদ্ধতি পুর্নগঠিত করার জন্য একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় যা ড. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত। এই শিক্ষা কমিশনে গ্রন্থাগার উন্নয়নকে গুরত্ব দেওয়া হয়। এই কমিশনে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়,গণ-গ্রন্থাগার ও জাতীয় গ্রন্থাগারের উন্নতি সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনার পর প্রতিটি পর্যায়ে যথোপযুক্ত গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে সমগ্র দেশে জাতীয় শিক্ষানীতি, গ্রন্থনীতি, গ্রন্থাগার নীতি প্রণীত হলে এর প্রভাব চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারী উদ্যোগ বা পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় বিভিন্ন শ্রেণীর গ্রন্থাগার। ১৯৮০ সালে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি হতে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের যে প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল,তার সাফল্য নির্ভর করে গ্রন্থাগার আন্দোলনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে জনগণের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টি করা। যদি জনগণ পাঠাভ্যাসে উৎসাহিত না হয় তবে এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। কেননা গণশিক্ষার অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো ব্যাপক ভিত্তিক দেশের আনাচে কানাচে, পাড়ায় পাড়ায়, গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা ও জেলা পর্যন্ত সুসংগঠিত গ্রন্থাগার স্থাপনের উপর। দেশে গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন এবং গ্রন্থাগারিকতা পেশার দক্ষতা ও মান উন্নয়নের লক্ষ্যে পেশাজীবি সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। দেশের নীতিনির্ধারকসহ সকল মহলকে গ্রন্থাগার ও তথ্যসেবার গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করে একযোগে কাজ করতে হবে যাতে তথ্যভিত্তিক সমাজ গঠণের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় ।

১. বাংলাদেশের গ্রন্থাগারের বর্তমান অবস্থা:

বাংলাদেশের চার ধরনের গ্রন্থাগার ব্যবস্থা চালু রয়েছে যথা

(১) গণ-গ্রন্থাগার

(২) জাতীয় গ্রন্থাগার

(৩) একাডেমিক গ্রন্থাগার এবং

(৪) বিশেষায়িত গ্রন্থাগার

বাংলাদেশের গ্রন্থাগারের বর্তমান অবস্থা

১.১ গণ-গ্রন্থাগার:
বাংলাদেশের দুই ধরনের গণ- গ্রন্থাগার রয়েছে

১) বেসরকারী
২) সরকারী

১.১.১ বেসরকারী গণগ্রন্থাগার:

উনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে বাংলাদেশের বেশীরভাগ গ্রন্থাগার ছিল ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং বিত্তবানদের দখলে। গ্রন্থাগারিক ও অন্যান্য উৎসাহী নাগরিকদের বহু বছরের চেষ্টায় গ্রন্থাগারের এই সংকীর্ণতাকে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন করে এর বিস্তৃত ও অপরিহার্য সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্তমান সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছে। ১৭৭৮ সালে চার্লস উইলকিন্সের বাংলা হরফ নির্মাণ এবং ১৭৮৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির পত্তন বাংলাদেশের গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশে গ্রন্থাগার আন্দোলন জোরালোভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। মূলত ১৮৫৪ সালে বাংলাদেশের প্রাচীনতম চারটি গ্রন্থাগার স্থাপনের মধ্য দিয়ে এদেশের গ্রন্থাগার আন্দোলনের গোড়াপত্তন। এই চারটি গ্রন্থাগার হলো ১.উডবার্ণ পাবলিক লাইব্রেরি, বগুড়া ২. যশোর পাবলিক লাইব্রেরি, যশোর ৩. বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি, বরিশাল ৪. রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি, রংপুর। ঢাকার সবচেয়ে পুরাতন গণগ্রন্থাগার হিসাবে ‘নথব্রুক হল’ লাইব্রেরির কথা উল্লেখ করা যায়।


মূলত ১৮৫৪ সালে বাংলাদেশের প্রাচীনতম চারটি গ্রন্থাগার স্থাপনের  মধ্য দিয়ে এদেশের গ্রন্থাগার আন্দোলনের গোড়াপত্তন|


গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এই প্রচারণায় বগুড়া, যশোরের ন্যায় অন্যান্য স্থানেও পরিলক্ষিত হয়। উক্ত গ্রন্থাগারগুলি প্রধানতঃ এক বা একাধিক জন হিতৈষী ব্যক্তির উদ্যোগ, জন সাধারনের চাঁদা, স্থানীয় জমিদারের সামান্য অর্থ সাহায্য এবং কিছুটা সরকারী অনুদানের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তুু তাতে শীঘ্রই ভাটা পড়তে থাকে । ফলে এইসব গ্রন্থাগারগুলি সম্পূর্ণরুপেই এক প্রকার অসামঞ্জস্যপূর্ণ, স্বেচ্ছা সেবা মূলক ও ব্যক্তি বিশেষের উদ্যোগের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে । আর তাই প্রতিষ্ঠার প্রায় শতবর্ষ পর দেশ বিভাগের পরে বাংলাদেশ যখন এই গ্রন্থাগারগুলি উওরাধিকার সূত্রে লাভ করলো তখন এদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মোট ১৯৫৬ টি বেসরকারী গণ-গ্রন্থাগার রয়েছে ( ঢাকা মহানগর ১০৩ টি, ঢাকা বিভাগ ৪৫৭টি, চট্রগ্রাম বিভাগ ৩১৯টি , খুলনা বিভাগ ৩০৪টি , রাজশাহী বিভাগ ২৮১টি , ররিশাল বিভাগ ২১২টি ,রংপুর বিভাগ ২২৭টি, সিলেট বিভাগ ৫৩ টি) যেগুলো সন্তোষজনক অবস্থায় নেই । অধিকাংশ বেসরকারী গণগ্রন্থাগারের ভবন পুরাতন, নেই পেশাগত গ্রন্থাগারিক, রয়েছে আর্থিক দৈন্যতা, পর্যাপ্ত বইপত্র, আসবাবপত্র এর অভাবতো রয়েছে । সম্পদ সীমাবদ্ধ হওয়ার কারনে সেবাও সীমিত হয়েছে ফলে আগত পাঠক, ব্যবহারকারীগণ তাদের কাঙ্ক্ষতি মানের সেবা হতে বঞ্চিত হচ্ছে । তবে সীমাবদ্ধতার মাঝেও নিন্মোক্ত সেবা প্রদান করছে –

  • পাঠক সেবা,
  • পুস্তক লেনদেন সেবা,
  • সকল শ্রেণীর পাঠককে রেফারেন্স ও পরামর্শ সেবা প্রদান,
  • পাঠাভ্যাস বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ।

১.১.২ সরকারী গণগ্রন্থাগার:

গণগ্রন্থাগার জ্ঞান-ভিত্তিক সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজ থেকে নিরক্ষতা ও চিন্তার পশ্চাৎপদতা দূরীকরণ, অর্জিত শিক্ষার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি সহ আর্থ- সামাজিক প্রয়োজনে গণগ্রন্থাগারের ভুমিকা অপরিসীম । এ ভুমিকার প্রেক্ষাপটেই তৎকালীন সরকারের শিক্ষা বিভাগের ১০-০৫-১৯৫৫ তারিখের ১৪৯১- শিক্ষা সংখ্যক আদেশ বলে “সোস্যাল আপলিফট’’ প্রকল্পের অধীনে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক মঞ্জুরি প্রদান করা হয়। ১৯৫৮ সালের ২২ মার্চ ১০,০৪০টি পুস্তকের সংগ্রহ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গ্রন্থাগারটির দ্বারোন্মোচন করা হয়। ১৯৭৭ সালে গ্রন্থাগারটিকে শাহবাগ এলাকার বর্তমান অবস্থানে নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তর করা হয় এবং ০৬-০১- ১৯৭৮ তারিখে নতুন ভবনে গ্রন্থাগার উদ্ধোধন করা হয়। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রন্থাগারটি ১১,০০০ পুস্তক নিয়ে সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় । এটি বর্তমানে দেশের শীর্ষ গ্রন্থাগার হিসাবে কাজ করছে ।

বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারী পর্যায়ে ৭১টি গণ-গ্রন্থাগার রয়েছে ( সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার,ঢাকায় ১টি, ৭টি বিভাগীয় সরকারী গণগ্রন্থাগার( চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল , সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে), ৫৬টি জেলা শহরে, ২টি উপজেলা ( জামালপুরের বকশীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ), ৪টি শাখা গ্রন্থাগার ( আরমানিটোলা, মোহাম্মদপুর-ঢাকায়, সোনাদিঘীর মোড়- রাজশাহী এবং বাকৃবি- ময়মনসিংহে ) । সম্প্রতি গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়াস্থ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি কমপ্লক্সেস্থিত গ্রন্থাগারটি গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর অনুকূলে ন্যস্ত করা হয়েছে । ফলে সরকারী গণগ্রন্থাগারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১-এ। এক নজরে গণগ্রন্থাগারের বর্তমান অবস্থা নিন্মে উল্লেখ করা হলো।

এক নজরে গণগ্রন্থাগারের বর্তমান অবস্থা

(সূত্র: গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের ওয়েব পোর্টাল হতে সংগৃহীত)

১. ২ জাতীয় গ্রন্থাগার:

বাংলাদেশের জাতীয় গ্রন্থাগার জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মৌলিক মুদ্রিত সম্পদ রাষ্ট্রের আইনবলে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও তথ্যসেবা প্রদানকারী কেন্দ্রীয় সংগ্রহশালা । এটি বাংলাদেশের সৃজনশীল সকল প্রকাশনার ডিপোজিটরি লাইব্রেরি; দেশের সৃজনশীল মুদ্রিত সৃষ্টিকর্মের কেন্দ্রীয় সংগ্রহশালা। ১৯৭২ সালের ৬ নভেম্বর হতে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রন্থাগার আনুষ্ঠানিক কর্মকান্ড শুরু করে। বর্তমানে এটি ঢাকার শেরে বাংলা নগরে ৪ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। জাতীয় গ্রন্থাগারের সকল সংগ্রহ মিলিয়ে ৫,৫০,০০০ (পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) এর অধিক, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকরণকৃত ও নিত্য ব্যবহারযোগ্য বই, পত্র-পত্রিকার সংখ্যা ২ লক্ষ এর বেশী। সমুদয় সংগ্রহকে মোটামুটি ২৪টি ক্যাটাগরিতে বিন্যাস করে তথ্য সেবা প্রদান করা হয়। জাতীয় গ্রন্থাগারের তথ্য সামগ্রীর দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ এবং অনলাইন তথ্য ও গবেষণা সেবাদানের লক্ষ্যে গুরত্বপূর্ণ ও ক্ষয়িষ্ণু পুস্তক, গেজেট প্রভৃতি স্ক্যান করে সার্ভারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে । জাতীয় গ্রন্থাগার পাঠক, গবেষকদের জন্য নিন্মোক্ত সেবা প্রদান করে থাকে – পাঠক সেবা, গবেষণা ও রেফারেন্স সেবা, জাতীয় গ্রন্থপঞ্জি সেবা, আই এস বি এন বরাদ্দ সেবা, রিপ্রোগ্রাফিক সেবা, OPAC সেবা , ডিজিটাল তথ্য সেবা, ইন্টারনেট ও ফ্রি ওয়াই ফ্রি সেবা, পরামর্শ সেবা, অডিটোরিয়াম ব্যবহার সুবিধা ।

১.৩ একাডেমিক গ্রন্থাগার:

শিক্ষা ও গ্রন্থাগার একে অপরের পরিপূরক। সর্বস্তরের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, মানুষের জীবনব্যাপী শিক্ষা- সর্বক্ষেত্রেই গ্রন্থাগারের ভুমিকা মূখ্য। অপর দিকে গ্রন্থাগার নিজেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। গ্রন্থাগারের জ্ঞানভান্ডার থেকে মানুষ নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে, তার স্রষ্টাকে জানতে পারে, বিশ্বব্রহ্মান্ডের সব কিছু সর্ম্পকে ধারনা লাভ করতে পারে। একাডেমিক গ্রন্থাগার বলতে আমরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত যে সব গ্রন্থাগার গড়ে উঠে তাকে একাডেমিক গ্রন্থাগার বুঝি। বাংলাদেশে একাডেমিক গ্রন্থাগার সাধারনতঃ চার ধরনের হয়ে থাকে – স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়। এই সমস্থ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে গ্রন্থাগার রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৯ এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে যে একাডেমিক গ্রন্থাগারগুলি তার নিজ অবস্থান হতে পাঠকদের বিভিন্ন সেবা প্রদান করে থাকে তার একটি বিবরণ নিন্মে উল্লেখ করা হলো –

১.৩.১ বিদ্যালয় বা স্কুল গ্রন্থাগার:

স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক, সহায়ক ও সৃজনশীল পাঠ এবং শ্রবণ-দর্শন সামগ্রী ও আনুষাঙ্গিক উপকরণ নিয়ে যে গ্রন্থাগার গড়ে উঠে তাকেই স্কুল গ্রন্থাগার বলে । স্কুল গ্রন্থাগারের মূল উদ্দেশ্য- ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টি এবং স্কুলের শ্রেণী শিক্ষাকে সফল করার জন্য প্রত্যক্ষ সহায়তা প্রদান।স্কুল গ্রন্থাগারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীগণ অভিধান, বিশ্বকোষসহ নানা প্রকার রেফারেন্স সামগ্রী ব্যবহার করতে শিখে, শিখে এ্যাসাইমেন্ট, টার্মপেপার ইত্যাদি রচনার কলাকৌশল । এভাবে শিক্ষার্থীগণ গ্রন্থাগার ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত বিশ্ব-জ্ঞানরাজ্যের সাথে পরিচিত হতে পারে। বিদ্যালয় গ্রন্থাগারের গুরত্ব তুলে ধরতে গিয়ে ১৯৭৪ সালে প্রণীত ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে “গ্রন্থাগার বিদ্যালয়ের হৃৎপিন্ডস্বরুপ’’ অর্থাৎ হৃৎপিন্ড ছাড়া যেমন দেহ অসাড় তেমনি গ্রন্থাগার ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও অসাড় ।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৯ এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে ৫৯৯টি সরকারী স্কুল, ১৫৫৮৭ বেসরকারী স্কুল রয়েছে। অধিকাংশ সরকারী মাধ্যমিক স্কুলে গ্রন্থাগার নেই বললেই চলে ; নেই লাইব্রেরীর জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে গ্রন্থাগারের জন্য আসা অনুদানকৃত পুস্তকগুলি স্কুলের কোন এক কক্ষে অথবা টিচারস কমন রুমে অথবা প্রতিষ্ঠান প্রধানের ঘরে তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়। যে যার নিজেদের প্রয়োজনে আলমারীতে রাখা বই-পুস্তকগুলি (গ্রন্থাগারের সম্পদ) ব্যবহার করে এবং প্রয়োজন শেষে তদারকির অভাবে এই গুলি অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী হিসাবে স্থান পায়। গত ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১০ সালে সরকারী অধ্যাদেশের মাধ্যমে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে ১৮৭৭৫টি বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারিকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই পদে গ্রন্থাগারিক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। বর্তমানে স্কুল গ্রন্থাগারে নিন্মোক্ত সেবা প্রদান করা হয়-শিক্ষার্থীদের বই ধার দেওয়া, গল্প বলার আসর, রচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা, নতুন শির্ক্ষার্থীদের পরিচিতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রন্থাগার ব্যবহার বিধি সর্ম্পকে ধারনা দেয়া, শিশু কিশোরদের উপদেশমূলক সেবা প্রদান, নিউজ ক্লিপিংস সেবা, গ্রন্থ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা, ওয়াল ম্যাগাজিন সংরক্ষণ এবং শিক্ষামূলক প্রামান্য চিত্র দেখানো যা তাদের মূল্যবোধ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক ভুমিকা পালন করতে পারে।


বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৯ এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে ৫৯৯টি সরকারী স্কুল, ১৫৫৮৭ বেসরকারী স্কুল রয়েছে। অধিকাংশ সরকারী মাধ্যমিক স্কুলে গ্রন্থাগার নেই বললেই চলে।


১.৩.২ কলেজ গ্রন্থাগার:

কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাকে উচ্চ শিক্ষার ভিত বলা হয়। কাজেই কলেজ স্তরে প্রতিটি শিক্ষার্থী যাতে করে পরবর্তী উচ্চতর শিক্ষার ভিতকে মজবুত করতে পারে তার জন্য উপযুক্ত মানের গ্রন্থাগার গঠনে সহায়তা করা একান্ত প্রয়োজন । আমাদের দেশে কয়েক ধরনের কলেজ বিদ্যমান রয়েছে । পরিচালনার দিক বিবেচনায় কলেজগুলিকে সরকারী ও বেসরকারী এই ভাগে ভাগ করা যায় । এই ছাড়া কিছু কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নিন্মে বাংলাদেশের শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৯ এর বার্ষিক প্রতিবেদনে কলেজ পর্যায়ে যে প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার একটি বিবরণ উল্লেখ করা হলো – বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারী ৬৪টি বেসরকারী ১২০৪টি সহ মোট ১২৬৮ স্কুল এবং কলেজ রয়েছে, সরকারী ৫২টি বেসরকারী ১২৮৩টি সহ মোট ১৩৩৫ উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ রয়েছে, সরকারী ১৮৯টি, বেসরকারী ৯৩২টি সহ মোট ১১২১টি ডিগ্রি পাশ কলেজ রয়েছে, সরকারী ২৪৩টি বেসরকারী ৩৫৩টি সহ মোট ৫৯৬টি ডিগ্রী অনার্স কলেজ রয়েছে, সরকারী ১২৫টি বেসরকারী ৫০টি সহ মোট ১৭৫টি মাস্টার্স কলেজ রয়েছে, সরকারী ৫২টি, বেসরকারী ৩৮৭টি সহ মোট ৪৩৯ টি পলেটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে, সরকারী ৬৪টি আর বেসরকারী ১১০টি সহ মোট ১৭৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ রয়েছে, ৬৮ সরকারী, বেসরকারী ৯৬টি সহ মোট ১৬৪টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে, ১০ সরকারী, বেসরকারী ২৩টি সহ মোট ৩৩টি টক্সেটাইল ইনস্টিটিউট রয়েছে, ৪১ সরকারী, বেসরকারী ১০টি সহ মোট ৫১ট টেক্সটাইল ভকেশনাল কলেজ রয়েছে, ৩৭ সরকারী, বেসরকারী ৭৪টি সহ মোট ১১১টি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে, ২৩ সরকারী ৪৮ বেসরকারী মোট ৭১ নার্সিং কলেজ রয়েছে, ৫৬ সরকারী ,৩ বেসরকারী সহ মোট ৫৯ পিটিআই রয়েছে, ১৫টি সরকারী, ১০৪টি বেসরকারী সহ মোট ১১৯টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ রয়েছে, ৫টি সরকারী ২৫টি বেসরকারী সহ মোট ৩০টি শারীরকি শিক্ষা কলেজ সহ আরো অন্যান্য অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে গ্রন্থাগার রয়েছে। দেশের কিছু সংখ্যক কলেজ ছাড়া অধিকাংশ কলেজ গ্রন্থাগারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেই পৃথক গ্রন্থাগার ভবন, রয়েছে বাজেটের স্বল্পতা, জনবলের স্বল্পতা, আসবাবপত্রের অপর্যাপ্ততা, নিয়মিত পত্রিকা, সাময়িকী সংগ্রহের অভাব রয়েছে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কলেজ গ্রন্থাগারের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো দরকার । সাধারনত কলেজ পর্যায়ে মান সম্মত যে গ্রন্থাগারগুলি রয়েছে তার নিজ অবস্থান হতে নিম্নোক্ত সেবা প্রদান করে থাকে -পাঠ কক্ষ সেবা , লেনদেন সেবা , রেফারেন্স সেবা, সাধারণ ও সুনিদ্দিষ্ট তথ্য সেবা প্রদান, ফটোকপি সেবা, অডিও ভিজুয়্যাল সার্ভিস, নিউজ পেপার ক্লিপিং , ইন্টারনেট সার্ভিস ।

১.৩.৩ মাদ্রাসা গ্রন্থাগার:

মাদ্রাসা শিক্ষায়ও সাধারন শিক্ষার মতো পাঁচটি স্তর রয়েছে যথা- (ক) ইবতেদায়ী (খ) দাখিল (৩) আলিম (৪) ফাজিল (৫) কামিল । ইবতেদায়ী বা প্রাথমিক পর্যায়ে কোন গ্রন্থাগার নেই তবে কিছু সংখ্যক পবিত্র ও ধর্মীয় পুস্তক মাদ্রায় এক পাশে রক্ষিত থাকে। বাংলাদেশের শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৯ এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশে বেসরকারী দাখিল মাদ্রাসা ৬৫৫৩টি, বেসরকারী আলিম মাদ্রাসা ১৪১২টি এবং সরকারী কামিল মাদ্রাসা ৩টি এবং বেসরকারী ২৪১টি মাদ্রাসা রয়েছে। প্রতিটি মাদ্রাসায় ছোট, মাঝারি আকারে গ্রন্থাগার রয়েছে। যা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত গ্রন্থাগারিকের। সম্প্রতি মাদ্রাসা গ্রন্থাগার গুলো গ্রন্থাগারিকের পদ পূরণের জন্য আট হাজারের অধিক পদ সরকার সৃষ্টি করেছেন। পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মীয় গতানুগতিক মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারন শিক্ষার সাথে তাল মিলিয়ে যুগোপযোগী করা হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হলে প্রয়োজন মাদ্রাসা গ্রন্থাগারের সেবার মান বৃদ্ধি করা জরুরী । মাদ্রাসা গ্রন্থাগারগুলোতে সাধারনত যে সমস্থ সেবা প্রদান হয় তা হলো – পাঠ কক্ষ সেবা, পুস্তক লেনদেন সেবা, রেফারেন্স সেবা ।


বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারী পর্যায়ে (পাবলিক) ৪২টি, বেসরকারী পর্যায়ে ( প্রাইভেট) ১০৩টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার থাকার কথা । যার উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে সফল করা এবং ছাত্র-শিক্ষক ও গবেষকদের (ষ্ট্যাক হোল্ডারদের) সর্বোচ্চ তথ্য সেবা নিশ্চিত করা।

১.৩.৪ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার:

বিশ্ববিদ্যালয় হলো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠানও বটে। শিক্ষা ও গবেষণা কর্মকে সহায়তা করা ও জাতীয় শিক্ষার মানোন্নয়ন করে ক্রমান্বয়ে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়াই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারী পর্যায়ে (পাবলিক) ৪২টি, বেসরকারী পর্যায়ে ( প্রাইভেট) ১০৩টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার থাকার কথা । যার উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে সফল করা এবং ছাত্র-শিক্ষক ও গবেষকদের (ষ্ট্যাক হোল্ডারদের) র্সবোচ্চ তথ্য সেবা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এবং ডিজিটাল লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এই সেবা ও কার্যক্রম চালুর জন্য বিভিন্ন Consortium এর মাধ্যমে যেমন ইউজিসি ডিজিটাল লাইব্রেরি (ইউডিএল), Bangladesh INASP-PERI Consortium,  Research4life গঠনের মাধ্যমে ই-রিসোর্স ব্যবহারের সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

সাধারনত বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে পাঠক, গবেষক এবং শিক্ষকদের জন্য নিন্মোক্ত সেবা সমুহ প্রদান করা হয়ে থাকে -পাঠকক্ষ, লেনদেন, রেফারেন্স, বিবলিওগ্রাফিক ইন্সট্রাকশন ও লাইব্রেরি অরিয়েন্টেশন সার্ভিস, সাম্প্রতিক তথ্যজ্ঞাপন সেবা, নির্বাচিত তথ্য জ্ঞাপন সেবা, অডিও ভিজ্যুয়াল, রিপ্রোগ্রাফিক, নিউজ পেপার ক্লিপিং, এক্সটেনশন সার্ভিস, অনলাইন পাবলিক এ্যাকসেস ক্যাটালগ সার্ভিস, লিটারেচার সার্ভিস, কম্পিউটার সার্চ সার্ভিস, ইন্টারনেট ও ই-মেইল সার্ভিস, ডিজিটাল ই- রিসোর্স (ই-বুকস এন্ড ই-জার্নাল) এ্যাকসেস সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে।

১.৪ বিশেষায়িত গ্রন্থাগার:

বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত সরকারী, বেসরকারী, আধা সরকারী অথবা স্বায়িত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বীয় কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়নের লক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের নিমিত্তে বিশেষ ধরনের উপাদান সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারকে বিশেষ গ্রন্থাগার বলে। ১৯৪৭ সালের পাকিস্থান বিভক্তির সময় এ অঞ্চলে কোন বৈজ্ঞানিক বা গবেষণামূলক কোন স্থাপনা বা সংস্থা ছিল না। যা কিছু ছিল সেগুলোর অবস্থান ছিল ভারত কেন্দ্রীক, এর ফলে কলকাতা রয়েল সোসাইটি অব বেঙ্গল এ একটি বিখ্যাত গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে যা ছিল এশিয়ার মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থাগার। ডেপুটি কমিশনারের তত্ত্ববধানে এ অঞ্চলে প্রথম বিশেষ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৭ সালে ঢাকা কমিশনারের অফিসে। এছাড়া রাজশাহী কালেকটরেটে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৫ সালে এবং এর অনেক বড় সংগ্রহশালা ছিল। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের অফিস গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে। উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে ৭টি ল কলেজের সন্ধান মেলে যার মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন ঢাকা বার গ্রন্থাগার, যা ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় । বাংলাদেশ হাইকোর্ট বার এসোসিয়েশন গ্রন্থাগার এবং হাইকোর্ট জাজেস গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে । এছাড়া ঢাকা মিউজিয়াম গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালে। এছাড়া ১৯৫৭ সালে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও এশিয়াটিক সোসাইটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় । গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, ১৯৪০ সালের পর হতে এই দেশে বিশেষ গ্রন্থাগারের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১২১টি বিশেষ গ্রন্থাগার সন্ধান পাওয়া যায়। সারা দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় এক হাজারের মতো বিশেষ গ্রন্থাগার রয়েছে। যার মধ্যে কিছু বিশেষ ধরনের গ্রন্থাগার রয়েছে যেগুলি আধুনিক মানের- যেমন বাংলাদেশ সচিবালয় গ্রন্থাগার, জাতীয় সংসদ গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমী গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প পরিষদ গবেষণা গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক এন্ড টেকনিক্যাল ডকুমেন্টেশন সেন্টার (ব্যান্সডক) গ্রন্থাগার, আইসিডিডিআরবি লাইব্রেরি, বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি, বিআইডিএস সহ আরো বিভিন্ন স্তরে সরকারী, বেসরকারী পর্যায়ে বিশেষ গ্রন্থাগার রয়েছে যা ব্যবহারকারীদের প্রয়োজনে নিন্মোক্ত সেবা প্রদান করে থাকে – পাঠকক্ষ সেবা, গবেষণা ও রেফারেন্স সেবা, আন্তঃ গ্রন্থাগার ধার সেবা, Current Awareness Service, Selective Dissemination of Information Service, রিপ্রোগ্রাফিক সেবা, Audio Visual Materials, সেবা, ইন্টারনেট ও OPEC search সেবা, Computer search , Indexing , Extension সেবা.

২. সমস্যা:

বাংলাদেশের বিদ্যমান গ্রন্থাগার ব্যবস্থায় বেশ কিছু common সমস্যা রয়েছে যা নিন্মে উল্লেখ করা হলো:

  • ২.১ জনবলের স্বল্পতা: সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে গ্রন্থাগারে অন্যতম সমস্যা হলো জনবলের স্বল্পতা । কোন কোন গ্রন্থাগারে একটি মাত্র গ্রন্থাগারিকের অথবা সহকারী গ্রন্থাগারিকের পদ রয়েছে। একজন ব্যক্তির পক্ষে গ্রন্থাগারের মতো প্রতষ্ঠিানের সকল কর্মকান্ড সম্পন্ন করা বাস্তবে অসম্ভব।
  • ২.২ পাঠ্যোপকরণের অপ্রতুলতা: অধিকাংশ গ্রন্থাগারে শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ্য ও রেফারেন্স বই এর অভাব রয়েছে। তাছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বই, পত্রিকা,সাময়িকী সহ অন লাইন জার্নাল সংগ্রহের ব্যবস্থা নেই।
  • ২.৩ ভৌত সুযোগ সুবিধার অভাব: দেশের গ্রন্থাগারগুলোর নিজস্ব ভবন , পর্যাপ্ত পাঠকক্ষ অপ্রতুলতা, আসবাবপত্রের স্বল্পতা প্রকট।
  • ২.৪ বাজেটের স্বল্পতা ও সীমাবদ্ধতা: অর্থ সংস্থানের অপ্রতুলতা ও প্রকৃতপক্ষে অধিকাংশ গ্রন্থাগারের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ না থাকা এর উন্নয়নরে প্রধান অন্তরায়।
  • ২.৫ পেশাজীবিদের প্রশিক্ষণের অভাব: গ্রন্থাগারের পেশাজীবিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এর ব্যবস্থা নেই।
  • ২.৬ গ্রন্থাগারের বই পত্র ক্যাটালগিং করা প্রয়োজনীয় টুলসের অভাব রয়েছে ।

৩. করণীয় দিক সমূহ:

৩.১ জনবল কাঠামো পরিবর্তনসহ পদবী ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে: গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞানে শিক্ষিত কর্মী ছাড়া গ্রন্থাগার পরিচালনা যেমন অসম্ভব তেমনি পেশাগত গ্রন্থাগারিকদের পদবী ,পদমর্যাদা , বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, সিলেকশন গ্রেড ও পরবর্তীতে উচ্চতর পদোন্নতি না পাওয়ার ফলে এক অসহনীয় হতাশা বিরাজ করছে। ফলে কাঙ্ক্ষতি ও উন্নত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না ।

৩.২ আধুনিক রিডিং ম্যাটিরিয়েলস থাকতে হবে: আধুনিক যুগ হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির যুগ। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার বই এর পাশাপাশি যদি নন-বুক ম্যাটেরিয়ালস ও অডিও ভিজ্যুয়েল মেটেরিয়াল, ই-বুকস, ই-জার্নাল সহ , ই-রিসোর্স এর সংগ্রহের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরবিছিন্ন ইন্টারনেট এর ব্যবস্থা ( Broad Brand/ Wifi) পর্যায়ক্রমে চালুর করতে হবে । দেশের বড় , মাঝারী লাইব্রেরি গুলোতে আধুনিক মানের লাইব্রেরি সেবা ও কার্যক্রম এর আওতায় আনা খুবই জরুরী। এই জন্য কম্পিউটার, সার্ভার, নটেওর্য়াকিং ও ইন্টারনেট এ্যাকসেস এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে ।

৩.৩ ভৌত সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি: প্রতিটি গ্রন্থাগারের জন্য গ্রন্থাগার ভবন প্রতিষ্ঠা করা খুব জরুরী। ভবনের নকশাতে সম্প্রসারণ লে-আউট, খোলা শেলফের ব্যবস্থা, বই বিন্যাসকরণ, আদ্রতা কীটপতঙ্গরোধক ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকতে হবে। গ্রন্থাগার ভবনের নকশা তৈরীতে আর্কিট্যাক্টদের সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসক ও গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করলে ভাল হয়। আধুনিক গ্রন্থাগারের উপযোগী আসবাবপত্র যেমন-রিডিং টেবিল, চেয়ার, শেলফ, ক্যাটালগ কেবিনেট, ডিসপ্লে বোর্ড, ইস্যু ডেস্ক ইত্যাদির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পর্যাপ্ত আসবাবপত্র থাকলে গ্রন্থাগার সেবা প্রদান সহজ হয়।

৩.৪ গ্রন্থাগারের নিজস্ব বাজেটের ব্যবস্থা: গ্রন্থাগারে বই পুস্তক,সাময়িকী ও নন-বুক ম্যাটেরিয়ালস ক্রয় ও বাঁধাই সব মিলিয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মোট বাজেটের ৫% থেকে ১০% ব্যয় করা প্রয়োজন। এজন্য সরকারের অনুদান ও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে গ্রন্থাগার ফি ধার্য করা যেতে পারে।

৩.৫ গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের প্রশিক্ষণের জন্য অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রশিক্ষণ ছাড়া দক্ষতা বৃদ্ধি অসম্ভব। স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রন্থাগারিক/ সহকারী গ্রন্থাগারিকদের/ গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সেই সাথে পেশীজীবি সংগঠন বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (ল্যাব), বাংলাদেশ গ্রন্থাগারিক ও তথ্যায়নবিদ সমিতি (বেলিড), বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফর ইউনেস্কো কমিশন, জাতীয় গ্রন্থাগার, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (নেপ), জাতীয় শিক্ষা ও গবেষণা একাডেমী (নায়েম) এবং উদ্যোগে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

৩.৬ ক্যাটালগিং ও OPAC এর ব্যবস্থা গ্রহণ: শুধুমাত্র গ্রন্থাগারে সংগ্রহ থাকাই যথেষ্ট নয়। গ্রন্থাগারে বই পত্র ও অন্যান্য পাঠ্য সামগ্রী যদি সঠিকভাবে ক্যাটালগিং করা না হয় তাহলে বই যেমন খুঁজে পাওয়া যায়না ঠিক তেমনি গ্রন্থাগারও তার একাডেমকি কর্মকান্ড সম্পন্ন করতে পারবেনা। এই ক্ষেত্রে ক্যাটালগিং এর প্রয়োজনীয় টুলসগুলো যেমন ক্যাটালগ কোড (AACR2), শ্রেণীকরণ স্কীম (DDC), সিয়ার্স লিস্ট অব সাবজেক্ট হেডিংস, কাটারস ফিগার ও OPAC চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।


সর্বোপরি গ্রন্থাগার ও তথ্য সেবার গুণগত মানোন্নয়নে স্বতন্ত্র একটি ন্যাশনাল লাইব্রেরি কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। যে কমিশন গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের একটি রোল মডেল হিসাবে কাজ করবে ।


পরিশেষে বলা যায় যে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা SDG (Sustainable Development Goal) এর ১১.৪ অধ্যায়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এ দেশে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত গণগ্রন্থাগার নেটওয়ার্কিং সম্প্রসারণ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে । সে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি রেখে গণগ্রন্থাগার উন্নয়নে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন প্রকল্প, কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে । Bill & Melinda Gates Foundation এর আর্থিক সহায়তায় ব্রিটিশ কাউন্সিল কর্তৃক Libraries Unlimited প্রকল্প বাস্তবায়ন এর মাধ্যমে গণ গ্রন্থাগার সমুহের জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ এবং উন্নততর পাঠক সেবা দান নিশ্চিতকরণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সেই সাথে জাতীয় গ্রন্থাগার গবেষণার উন্নয়নে, সংস্কৃতির উৎকর্ষতায়, প্রযুক্তির বিকাশে তথ্যমূলক সহযোগিতাদানে গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে । গ্রন্থাগারের তথ্যসামগ্রীর দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ ও অনলাইন তথ্য ও গবেষণা সেবা দানের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ০৩ লক্ষ ডকুমেন্ট স্ক্যান করা হয়েছে। বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষার ভিতকে মজবুত করতে হলে শক্তিশালী কার্যকর গ্রন্থাগার সেবার কোন বিকল্প নেই। দেশের একাডেমিক গ্রন্থাগার গুলোর (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) নাজুক অবস্থা উওরণের জন্য সম্মিলিত কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন ।

সেই সাথে পেশাজীবি সংগঠন (ল্যাব, বেলিডের) কার্যকরী ভুমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিশেষ গ্রন্থাগার গুলোর সংস্কার, সেবা ও কার্যক্রমকে উত্তোরত্তোর উন্নত পর্যায়ে এগিয়ে নিতে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। সর্বোপরি গ্রন্থাগার ও তথ্য সেবার গুণগত মানোন্নয়নে স্বতন্ত্র একটি ন্যাশনাল লাইব্রেরি কমিশন গঠন করা প্রয়োজন । যে কমিশন গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের একটি রোল মডেল হিসাবে কাজ করবে।


তথ্যসুত্র:

১. আলী,মোহাম্মদ সাদাত (২০০৪)। গ্রন্থাগার বর্ষ স্মারক গ্রন্থ । ঢাকা ,সূচীপত্র ।
২. রহমান, মোহাম্মদ জিল্লুর ( ২০০৪) বাংলাদেশের গ্রন্থ উন্নয়ন ও গ্রন্থাগার। ঢাকা,শোভা প্রকাশ ।
৩. আহমদ, নাসির উদ্দীন (১৯৯৮) । সমাজ গ্রন্থাগার ও যোগাযোগ । ঢাকা, বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি ।
৪. আজিজুল,হাকিম মোঃ (১৯৯৪) বাংলাদেশের গণ গ্রন্থাগার আন্দোলন। ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা ।
৫. গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের ওয়েব পোর্টাল হতে সংগৃহীত, এ্যাকসেস ২৯/০৯/২০১৯ ।
৬. সিদ্দিক, আশরাফুল আলম (২০১৭)। বাংলাদেশ গ্রন্থাগার তালিকা । ঢাকা, বেসরকারী গ্রন্থাগার সমিতি
৭. বাংলাদেশে শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (২০১৯) । ঢাকা ,শিক্ষা মন্ত্রণালয় ।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close