Blog Post

গ্রন্থাগারের তথ্যসেবা : একটি ব্যক্তিগত পর্যালোচনা

মোঃ মাসুদ রানা বর্তমানে লাইব্রেরিয়ান হিসাবে কর্মরত আছেন জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের আলোকে গ্রন্থাগার ও তথ্য সেবার বর্তমান ধারণা, অবস্থান এবং এই সেবার উন্নয়নে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক লিখাটি শুধুমাত্র লাইব্রেরিয়ান ভয়েস-এর জন্য লিখেছেন। 


গ্রন্থাগারের বর্তমান ধারণা (Present concept of library):

বলা হয়ে থাকে শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক গ্রন্থাগার ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হৃৎপন্ডিস্বরূপ। আবার এও বলা হয়ে থাকে একটি গ্রন্থাগার সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের বা জাতির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সেতুবন্ধনের অন্যতম ক্ষেত্র (Libraries are bridging past, present and future)। আর প্রতিটি গ্রন্থাগারের এক একটি বই হলো এক একটি জীবিত বা মৃত পন্ডিতের অমৃত কথন (Every book is the existence of the past and present scholar) । এও বলা হয়ে থাকে যে একটি উন্নত গ্রন্থাগার যে কোন জাতির জন্য উন্নত মনন ও মেধা চর্চার আয়না (Libraries are the mirrors of a nation’s pedagogy) । বিশেষ গ্রন্থাগার বা জাতীয় গ্রন্থাগার গুলোতো অনেকটা আমজনতার কাছে প্রথম শোনার মতো কিছু। উন্নত বিশ্বে পাবলিক লাইব্রেরিগুলো সর্বাধুনিক পরিচিতি ও প্রসার লাভ করলেও বাংলাদেশে এখনো তা আড্ডাখানা বা ক্লাব হিসেবে টিকে আছে। গ্রামে-গঞ্জে বা বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় যে কয়েকটা লাইব্রেরি ধুকে ধুকে টিকে আছে সেগুলোর অনেকগুলো  আবার অভিভাবকদের কাছে আড্ডাখানা ও নেশার আখড়া হয়ে ভীতির সঞ্চার করছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার বাস্তবিক অর্থে হচ্ছেও তাই। সবকিছু মিলিয়ে গ্রন্থাগার আপামর জনগণের কাছে এখনো আগার (store) হয়েই পরিচিত হয়ে আছে। সরলীকরণ করলে দাঁড়ায় গ্রন্থাগার নামে বিশেষ একটা শিক্ষার জায়গা আছে এবং তা বিশেষ শিক্ষায় শিক্ষিত বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগারকর্মী দ্বারা পরিচালিত সেটা অধিকাংশজন জানেন না। তবে হ্যাঁ গ্রন্থাগারগুলীতে দৈনিক পত্রিকা কিছুটা হলেও পরিচিতির একটা বড় ভূমিকা রাখছে যদিও তা সার্বিকভাবে গ্রন্থাগারের ভাবমূর্তিতে স্থায়ী কোন প্রভাব ফেলছে না।

শিক্ষিত ও অশিক্ষিত (educated or uneducated) অথবা স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ও নিরক্ষর (literate or illerate) ব্যক্তি উভয়ের কাছেই বই বলতে কিন্তু একটা জ্ঞান গরিমার জিনিস (knowledge thing) বোঝায় এবং সেরকম একটা ভাবের ও মনের মধ্যে উদয় হয়। অপরপক্ষে সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচলিত ধারণা গ্রন্থাগার হচ্ছে গ্রন্থের আগার বা ভান্ডার (merely or store of books)। কিন্তু বেশ লক্ষনীয় এবং অবাক করার বিষয় হলো গ্রন্থাগার বলতে অনকেইে বই বিক্রির দোকানকে বোঝেন। অনকেইে বোঝেন না যে গ্রন্থাগার হচ্ছে সেই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যেখানে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত একাধিক গ্রন্থাগার কর্মী দ্বারা পরিচালিত আরামদায়ক পরিবেশে বসে সম্পূর্ন ফ্রিতে ইচ্ছেমত পুস্তক ও অন্যান্য পাঠ্যসামগ্রী পড়ার সুযোগ প্রদান করা হয়। মোদ্দা কথা বই বা পুস্তক যেমন সকলের কাছে সার্বজনীনভাবে শিক্ষিত ব্যক্তি বিশেষের ব্যবহার্য বা চর্চা করার বিষয় বোঝায় ঠিক তেমনিভাবে গ্রন্থাগার কিন্তু সর্বমহলের আমজনতার কাছে ঐরকম বিশেষ শিক্ষিত ব্যক্তির ব্যবহারের জন্য বিশেষ কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান বোঝায় না বা বোঝানো হয়ে উঠার মতো করে পরিচিতি লাভ করেনি। অর্থাৎ আমরা বর্তমানে বই এর দোকানগুলোকেও গ্রন্থাগার বলাটা মেনে নিতে বিন্দু পরিমান দ্বিধাবোধ করিনা। এমনকি এ দ্বিধাবোধ শিক্ষিত ব্যক্তিদের মাঝেও নেই বললেই চলে। আরো অবাক করার মতো বিষয় যে আমরা যারা গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী বা শিক্ষক অথবা গ্রন্থাগার ও তথ্যকেন্দ্রের সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িত তারাও এ বিষয়টি নিয়ে তেমনভাবে সক্রিয় কোন প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ দেখাই না।

তথ্যসেবার বর্তমান অবস্থা (Present Situations of information Services):

আমরা আসলে কেমন সেবা প্রদান করছি সে বিষয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে খুব সহজেই বোঝা যাবে যে সেবাগুলো কতটুকু চাহিদা বান্ধব। আমাদের দ্বারা প্রদত্ত সেবাগুলো আসলেই কি আমাদের পাঠকদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারছে? যেগুলোকে আমরা সেবা হিসেবে ভেবে প্রতিদিন সেবা প্রদান করে যাচ্ছি সেগুলো আসলে কতটুকু কার্যকর প্রভাব রাখছে। অনেকগুলো পুস্তক সংগ্রহে রাখা বা ডিসপ্লে করতে পারা অর্থাৎ নাম্বার গেমই কি গ্রন্থাগারের মূল লক্ষ্য? আমরা যারা গ্রন্থাগার কর্মী রয়েছি তারা সকলে কিন্তু এগুলোকে নিয়েই সেবার মানোন্নয়নের স্বপ্ন দেখছি এবং এগুলোকে কেন্দ্র করেই নতুনত্ব ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করে রাখছি না কি? আমরা যা পড়ছি বা পড়াচ্ছি তা কি যুগসম্মত? আমাদের পাঠ্যসূচি কি আমাদের কোন নিজস্বতা বহন করছে? আমাদের পাঠ্য বিষয়গুলো কি আমাকে একজন স্বতন্ত্র পেশাজীবী হিসেবে তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট? এ বিষয়ে পড়ে আমরা কি কোন মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে পারছি? আমাদের কি আসলেই কোন স্বতন্ত্র পাঠ্যসূচি আমরা তৈরী করতে পেরেছি বা পারছি? আমাদের পাঠ্যসূচিতে আজ পর্যন্ত কি স্বতন্ত্র কোন বিষয় সংযোজন করতে পেরেছি?

গ্রন্থাগার যে একটি সেবা তথা তথ্যসেবা প্রদানকারী অন্যতম শিক্ষার ক্ষেত্র এটি এ পেশার মানুষের কাছেই কি কার্যকরভাবে স্বীকৃত হতে পেরেছে? আমরা যারা এ পেশায় নিয়োজিত রয়েছি তাঁরা গতানুগুতিক সেবা তথা পাঠ্যসামগ্রী সংগ্রহ, বিতরণ ও শ্রেণিকরণ এবং উপস্থিত হয়ে থাকবার দায়িত্ব পালন করেই ক্ষান্ত। আধুনিক শিক্ষার চল পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব, প্রচার ও প্রসারের (technological impact, usage and expansion) কারণে শিক্ষা ব্যবস্থা এখন আরো সহজলভ্য (handy) হয়েছে। প্রযুক্তির এ অগ্রযাত্রা অন্য সকল পেশার মতো গ্রন্থাগার ও তথ্য পেশাকওে সমৃদ্ধ ও অগ্রগামী করলেও তথ্যসবোর মান এখনো সে র্অথে পাঠকরে আস্থা র্অজন করতে পারেনি।

গতানুগুতিক সেবা দিয়ে পেশাজীবীরা আজ তাঁদের পেশার সেরকম কোন প্রভাব লক্ষ্য করছে না। গতানুগুতিক সেবা বলতে যতটা সহজ করে আমরা ভেবে থাকি তা কিন্তু অতটা সহজ নয়। সেবা আর কার্যক্রম কিন্তু এক জিনিস নয়। প্রতিদিন লাইব্রেরি খোলা রাখা, এসি কামরায় চেয়ার-টেবিল ও সোফা রাখা, কম্পিউটার এর মাধ্যমে বই লেনদেন করা এসব কিন্তু সেবা নয়। এসব কার্যক্রম মাত্র। বিশেষত গ্রন্থাগারের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এগুলো কখনই সেবা বলা যাবে না।

তথ্যসেবার উন্নয়নে ভবিষ্যৎ করণীয় (Future Plan of information service development):

আমাদের স্বতন্ত্র সেবাগুলো তাহলে কী কী হওয়া উচিত? হ্যাঁ! এটাই হচ্ছে মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন?

আমরা আজ গ্রন্থাগার ও তথ্য সেবার উন্নয়ন নিয়ে উদগ্রীব ও উচ্ছসিত। আধুনিক বিশ্বে তথ্যসেবার কাঙ্খিত সেই উন্নয়নের জন্য আধুনিক মন দিয়ে তা চিন্তা ভাবনা করে সামনের দিকে এগোতে হবে। আমাদেরকে এমন একটি যুগোপযোগী পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করতে হবে যার প্রতিটি পাঠ্য বিষয় হবে আমাদের বিষয়ের স্বতন্ত্র। যেগুলোর স্বতন্ত্র কার্যপ্রণালী থাকবে। এ পাঠ্যসূচি প্রণয়নে আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যেন এগুলো ভবিষ্যতে আরো বেশী প্রসার করা যায়। আধুনিক যুগের তথ্যসেবার উন্নয়নে নিন্মের বিষয়গুলো নিয়ে ভেবে দেখা যেতে পারে।

১) তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তির যোগ্যতা কি হওয়া উচিত?

নিয়ম করা উচিত যে কোন বিভাগ থেকে শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারবে তবে অবশ্যই আবেদন করার অন্যতম শর্ত থাকবে আবেদনকারীকে প্রচুর বই পড়ার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে তাঁর মৌখিক পরীক্ষার অধিকাংশ সময় জুড়ে প্রশ্ন থাকবে পাঠ অভ্যাস এর উপরে। এ বিষয়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়ার অভ্যাস, বিশ্বের বিভিন্ন সাম্প্রতিক বই সম্পর্কে সাম্প্রতি জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তাঁদেরও নিয়োগ হওয়া উচিত।

২) তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের কারিকুলাম কেমন হওয়া উচিত?

কারিকুলামে থাকবে পুস্তক পর্যালোচনা দক্ষতা, পত্রিকায় কলাম লেখনি অভিজ্ঞতা, পুস্তক প্রকাশনা অভিজ্ঞতা, প্রবন্ধ লেখনির অভিজ্ঞতা, ফিচার লেখনির অভিজ্ঞতা, ভাষার দক্ষতা, বাগ্মীতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, সভা/সেমিনার/সিম্পোজিয়াম/কনফারেন্স পরিচালনার অভিজ্ঞতা, আবৃতি চর্চা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের খবরাখবর, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও পর্যালোচনা, ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস ও পর্যালোচনা, বিশ্ব সাহিত্যের ধরণ ও পর্যালোচনা, বিশ্বের নাম করা সাহিত্যিক ও তাঁদের সাহিত্য নিয়ে পর্যালোচনা, বিশ্বের সকল মূল ও ফলিত বিষয়ের লেখক ও গবেষকদের জীবনী ও কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনা, বিশ্বের সকল বিষয়ের বিষয়ভিত্তকি জারগন, বিশ্বের সকল ধর্মের তুলনামূলক আলোচনা। বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কার, বিশ্বের সকল বিষয়ের সকল গবেষণা  জার্নালের বিস্তারিত পাঠ, বিশ্ব রাজনীতির সহজপাঠ, বিশ্বের বিভিন্ন বিপ্লবের তুলনামূলক আলোচনা, বিশ্বের সকল বিষয়ভিত্তকি অভিধানের তুলনামূলক সহজপাঠ, প্রযুক্তির সর্বশেষ আবিস্কার এর সবিস্তার আলোচনা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের উপর সম্যক ধারনা, প্রকৌশল প্রযুক্তির উপর লভ্যজ্ঞান এবং কৃষির আদি ইতিহাস ও সর্বশেষ চাষাবাদ প্রক্রিয়ার সবিস্তার পাঠ। এরকম হাজারো বিষয় যার আধেয় ও ডিজাইন আমাদের নিজেদের ঠিক করে নিতে হবে। আমরা যেহেতু বই এর ভান্ডারে থাকবো বা থাকি সুতরাং আমাদের তাবৎ পৃথিবীর জ্ঞানকে সম্মিলিত করে সেরকমভাবে গড়ে উঠতে হবে।

৩) তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক কেমন হওয়া উচিত?

আধনিক যুগে যতই অতি আধুনিক প্রযুক্তির আবিষ্কার হোক, পড়ালেখা যতই যন্ত্রের মাধ্যমে সহজবোধ্য হোক। যতক্ষণ না দক্ষ গ্রন্থাগার পেশাজীবী তৈরী করা সম্ভব হবে না ততক্ষণ পেশাজীবীদের নিজেদের ও নিজ পেশা নিয়ে সবসময়ই শঙ্কিত থাকবেই। তাই গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের সেবা পরিবর্তনের আগে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের শিক্ষা পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। গতানুগুতিক সিলেবাস বাদ দিয়ে উপরের বিষয়গুলোর উপর সুদক্ষ ব্যক্তিকেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া উচিত।

৪) তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার সেবা কেমন হওয়া উচিত?

আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আধুনিক লাইব্রেরি যতটা না দরকার তার চাইতে বেশী দরকার আধুনিক দক্ষ পেশাজীবী যিনি সর্ব বিষয়ে সর্ব গুনে গুনান্বীত হবেন। পেশাজীবীদের গতানুগুতিক সেবা প্রদানের ভ্রান্ত ধারনা থেকে বের হয়ে এসে নিন্মোক্ত উপায়ে সেবা প্রদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবেঃ

    • ক) পুস্তক/সাহিত্যিক আড্ডা
    • খ)সভা/সেমিনার/সিম্পোজিয়াম (জনগুরুত্বপূর্ন বিষয়/নন্দিত সাহিত্যিক/নন্দিত সাহিত্য/জনসচেতনতামূলক বিষয়ের উপর)
    • গ) উপস্থিত বিতর্ক প্রতিযোগীতা
    • ঘ) কনফারেন্স আয়োজন
    • ঙ) লেখক সম্মেলন করা
    • চ) টক-শোর আয়োজন করা
    • ছ) বুক রিভিউ প্রতিযোগীতা
    • জ) আবৃত্তি প্রতিযোগীতা
    • ঝ) সামাজিক সংলাপ
    • ঞ) বইপাঠ প্রতিযোগীতা
    • ট) বুক-টক
    • ঠ) উদ্যোক্তা কথন
    • ড) শিক্ষা উন্নয়ন সংলাপ ইত্যাদি
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close