Blog Post

উনিশ শতকে ঢাকার শিক্ষা ও সংস্কৃতি: গ্রন্থাগারের উদ্ভব ও বিকাশ

ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম
গ্রন্থাগার বিভাগের প্রধান, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চট্রগ্রামড. মোঃ রফিকুল ইসলাম


ভূমিকা:

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাহন হিসেবে গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রত্যেকটি সভ্যতার মাঝে গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব বিদ্যমান, যদিও সে সকল গ্রন্থাগার তৎকালীন রাজ পরিবার এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। তখনকার গ্রন্থাগারগুলো ছিল গণমানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। শুধু তাই নয়, গ্রন্থাগার ছিল তখনকার সমাজের আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষের ধারণা ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে। পাল আমলে নালন্দা মহাবিদ্যালয় গ্রন্থাগারে বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারের গ্রন্থাগারের সন্ধান পাওয়া যায়। মোঘল শাসনামলে ১৬১০ সালে ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী ঘোষণা করা হয়। তখন থেকেই অর্থাৎ সতের শতক থেকে ঢাকায় বুদ্ধিজীবী সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যদিও মোঘল আমলে কোনো গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তথাপি ঢাকা নগরীর বিশাল নগরায়নের ধারা থেকেই অনুমান করা যায় যে, এখানে বিভিন্ন প্রকার গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ যুগে আঠারো ও উনিশ শতকে ঢাকায় গণগ্রন্থাগারের ইতিহাস পাওয়া যায়। তখন থেকে অদ্যবধি বহু গ্রন্থাগারের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে।

১৮৭১ সালে ঢাকায় প্রথম বেসরকারিভাবে একটি গণগ্রন্থাগার গড়ে ওঠে। অথচ দেখা যাচ্ছে যে, ঢাকার বাইরে পূর্ববঙ্গে এ ঘটনার পূর্বেই ৪টি বিখ্যাত গণগ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ ১৮৫৪ সালে বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে ৪টি গণগ্রন্থাগার গড়ে ওঠে। তা হলো যশোর গণগ্রন্থাগার (প্রতিষ্ঠাকাল-১৮৫৪), উডবার্ন গণগ্রন্থাগার, বগুড়া (প্রতিষ্ঠাকাল-১৮৫৪), রংপুর গণগ্রন্থাগার (প্রতিষ্ঠাকাল-১৮৫৪) এবং বরিশাল গণগ্রন্থাগার (প্রতিষ্ঠাকাল-১৮৫৪)। এ সমস্ত গণগ্রন্থাগার সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে কতিপয় বিদ্যোৎসাহী ও সংস্কৃতিমনা আমলা এবং স্থানীয় জমিদার ও বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গের উৎসাহ বা উদ্দীপনায় ও আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়। উনিশ শতকে ঢাকার শিক্ষা ও সংস্কৃতিক অগ্রগতির পেছনে শতবর্ষীয় ঢাকার দু’টি গ্রন্থাগারের অবদান অনস্বীকার্য। এই দু’টি গ্রন্থাগারের উদ্ভব ও বিকাশের বিবরণ দেয়ার পূর্বে প্রাসঙ্গিক উপরি উক্ত বিষয়গুলি উপেক্ষিত হলে, সে সম্পর্কে অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই ঢাকায় কখন, কীভাবে, কার উদ্যোগে গ্রন্থাগার দু’টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তা জানার পূর্বে এর একটি প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা অতি আবশ্যক।

উনিশ শতকে ঢাকার শিক্ষা ও সংস্কৃতির অগ্রগতির ধারা:

উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ঢাকা শহরে কতিপয় কলেজ ও ইংরেজি বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। এ সময়ে ঢাকার শিক্ষার হার বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ঢাকায় তখন একটি আধুনিক মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিক জনমতের সৃষ্টি হয়? বলা যায় যে, ঢাকার মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব ঘটতে থাকে উনিশ শতকের চল্লিশের দশক থেকে। এর পূর্বে (১৭৬৫-১৮৩৯ পর্যন্ত) দীর্ঘ ৭৬ বছর কোম্পানি সরকার ঢাকা শহর উন্নতিকল্পে কোনো নীতি বা পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। এম মোফাখখারুল ইসলাম The Economic of Dhaka 1610-1947 (400 years of Capital Dhaka and Beyond Vol.2) গ্রন্থে ঢাকার সঙ্গে কলকাতার অবস্থা বর্ণনা করে লিখেন,

Dhaka never regained her glory as a centre of cotton manufacture. Much less did it witness the development of modern industries? Indeed, compared to Kolkatta, Dhaka became an even more parasite city, in a colonial setting, a never centre of colonial exploitation, rather than a generator of economic growth.

উনিশ শতকে ভৌগোলিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে সরকার আঞ্চলিক, প্রশাসন ও বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে নজরে দেয়। এ সময়কাল থেকে ঢাকাকে বস্তুত সরকারি নথিপত্রে পূর্ব বাংলার রাজধানী রূপে গণ্য করা হয়। বর্তমনে যে শিক্ষা ব্যবস্থা ঢাকা তথা বাংলাদেশে চালু আছে তার গোড়াপত্তন হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হওয়ার পর। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, কারিগরি-প্রকৌশল প্রভৃতি শিক্ষার যে ধারা এখন বিকশিত তার উৎসকাল ব্রিটিনের ঔপনিবেশিক শাসনের সময়েই। এক্ষেত্রে ঢাকায় যে সকল আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকাশ লাভ করে, তা পূর্ব বাংলার জনজীবনে বিশেষ অবদান রাখে। ১৮২৩ সালে গঠিত হয় Committee for Public Instruction. এই সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একটি বির্তক দেখা দিয়েছিল ভারতবর্ষে কোন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে; পাশ্চাত্য না প্রাচ্য? শেষ পর্যন্ত প্রাশ্চাত্য শিক্ষাকে উৎসাহ দানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ম্যাকলে মিনিট-এর মূল কথা ছিল,

To form a class who may be interpreters between us (The British) and the millions whom we govern, a class of persons Indian in blood and color but English in taste, In opinion, In morals and intellect.

১৮৩৫ সালে ঢাকা শহরের আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে সরকারি ভাবে লোকাল এজুকেইশন কমিটি গঠন করা হয়। ১৮৪০ সালে কোম্পানি সরকার ঢাকার গুরুত্ব অনুধাবন করে পৌর কমিটি গঠন করে। ১৮৫৮ সালের ১৮ অক্টোবরে কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে টেলিগ্রাফের সংযোগ স্থাপন করা হয়। এ সময় ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-নারায়নগঞ্জ রেললাইন চালু করা হয়, যা ঢাকার জন-জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। ফলে ব্যবসায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষিত মানুষের সমাগম ঘটে ঢাকা শহরে। উনিশ শতকের আশি দশকে ঢাকা, কলকাতার পরেই বাংলা প্রদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রশাসনিক উন্নতির সঙ্গে শিক্ষার কেন্দ্র প্রসারের একটি সম্পর্ক রয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন দফতর স্থাপনের পর আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই আধুনিক শিক্ষা প্রসারের ফলে ঢাকায় একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্য থেকেই আধুনিক সংবাদপত্র ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার উদ্ভব ঘটে।

উনিশ শতকের চল্লিশ দশকের দিকে ঢাকায় যে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন ঘটতে শুরু করে, সে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়গত ভাবে সমভাবে তা গ্রহণ করতে পারেনি। আধুনিক শিক্ষা অধিক গ্রহণ করেছিল হিন্দু সম্প্রদায়। যদিও পূর্ব বাংলা ও ঢাকা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। আর তা ঘটেছিল ঐতিহাসিক কারণেই। ঢাকার সন্নিকটে প্রাচীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুর পূর্ব থেকেই উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজ শাসনের শুরুতে এসে তা অব্যাহত থাকে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৮৫৪ সালেই বিক্রমপুরে একটি ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বলা বাহুল্য, ঢাকায় আধুনিক জনমতের উদ্ভবের ক্ষেত্রে এদের ব্যাপক অংশীদারিত্ব ছিল। ১৮৩৫ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুল নামে ঢাকার প্রথম ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘ঢাকা: ইতিহাস ও নগর জীবন’ গ্রন্থের লেখক শরীফ উদ্দীন আহমেদ লিখেন, “ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সময়ে এর অভাবনীয় শ্রী বৃদ্ধি যে ঢাকা শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনই ঘটায়, তাই নয়, এর পশ্চাৎ ভূমিতেও এক নবযুগের সূচনা করে।

১৮৪১ সালে ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষানীতির পরিবর্তনের ঢেউ ঢাকার জীবনেও প্রভাবিত হয়। এই নীতির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুলের সঙ্গে একটি কলেজ শাখা চালু করা হয়। এর নাম দেওয়া হয় ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজ। এটি ঢাকার প্রথম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজই পরবর্তীকালে ঢাকা কলেজ নামকরণ করা হয়। ১৮৪১ সালে যদিও ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুলকে কেন্দ্রীয় কলেজে (ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল) রূপান্তরিত করা হয় এবং এর সাথে একটি গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ঢাকা কলেজ ইতিহাস ও ঐতিহ্য ১৮৪১-১৯২১ গ্রন্থের লেখক শরীফ উদ্দিন আহমেদ লিখেন, ১৮৪১ সালের ৭ জুলাই এবং ১১ আগস্ট মাসের মধ্যবর্তী কোনো এক শুভদিনে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঢাকার একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে ঢাকা কলেজের অবদান ব্যাপক। পূর্ব বাংলার মানুষ আর শুধু কলকাতা কেন্দ্রিক না হয়ে খানিকটা ঢাকামুখি হতে শুরু করে। সাধারণ ও গরীব ছাত্রদের শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ১৮৪৬ সালে ঢাকা কলেজের প্রাক্তন ইংরেজ অধ্যক্ষ জে. আয়্যারল্যান্ড একটি ইউনিয়ন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলটির আর্থিক সাহায্যে এগিয়ে আসেন ঢাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি জে. জে. এন. পোগজ। পরবর্তীকালে স্কুলটি পোগজ স্কুল নামে নামকরণ করা হয়। ঢাকার আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে জে. জে. এন. পোগজ বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি ছিলেন আরমেনীয় নাগরিক এবং নীলকর। ঢাকার অপর ধনাঢ্য জমিদার ও ব্যবসীয় খাজা আব্দুল গণি ১৮৩৩ সালে গরীব মুসলমান ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষার জন্যে নিজ উদ্যোগে ফ্রি ইংরেজি স্কুল স্থাপন করেন।

উপরি উক্ত দুইজন শিক্ষানুরাগীই ছিলেন ঢাকার বহিরাগত বাসিন্দা। কিন্তু খাজা গণির স্কুলে মুসলমান ছাত্র পাওয়া যেতো না। ১৮৭৩ সালে স্কুলে মোট ১৯০ জন ছাত্রের সবাই ছির হিন্দু। এই অবস্থা থেকেই অনুমান করা যায় ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানটি। আর ঢাকার সকল স্কুল-কলেজেই যত স্থানীয় শিক্ষক ছিলেন সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। ১৮৫৬ সালে ‘দ্য ঢাকা নিউজ’ নামে যে প্রথম সংবাদপত্রের উদ্ভব হয় এর উদ্যোক্তা ছিলেন খাজা আব্দুল গণি এবং এন. পোগজ। এসব কর্মকান্ডই ঢাকায় আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও জনমত উদ্ভবের সূচনা করে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ঢাকায় শিক্ষা প্রসারের ফলে একটি প্রগতিশীল বাঙালি সমাজের উদ্ভব ঘটে। তাঁরা নিজ তাগিদেই ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সংস্কারকল্পে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ১৮১৮ সালের পর থেকেই কলকাতায় বাঙালি হিন্দু সমাজ সংবাদ সাময়িকীপত্র প্রকাশের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের যে উত্তাল ঢেউ তুলেছিল তার সেই প্রভাব ঢাকার নবসৃষ্ট সমাজকে প্রভাবিত করবে সেটাই স্বাভাবিক। এদের মধ্যেই ঢাকায় প্রথম প্রগতিশীল ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ গড়ে ওঠে। ১৮৫৬ সালে ব্রজসুন্দর মিত্রের নেতৃত্বে ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ১৮৪৬ সালে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মানে ধরে নেয়া যায় যে, চল্লিশের দশকেই ঢাকায় একটি বিদ্বৎ সমাজের সমাবেশ ছিল। আর উনিশ শতকের শুরুতেই রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে কলকাতার ব্রাহ্ম সমাজ সেখানকার সমাজ ও প্রশাসনের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। অথচ কলকাতা থেকে ঢাকার দূরত্ব সে সময়ে দু’শ মাইলের অধিক নয়। সম্ভবত এরুপ বিলম্বের কারণ ছিল ঢাকায় মুদ্রণযন্ত্রের অভাব। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে শুধু ব্রাহ্ম সমাজের ভূমিকা আলোকপাত হলো। সংস্কারপন্থী ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠায় ঢাকার বিদ্ব্যৎজন অংশগ্রহণ করেন। এঁদের মধ্যে জমিদার, শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিল।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত সমাজ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। এ সম্পর্কে ঢাকার গবেষক শরীফ উদ্দীন আহমেদ যথার্থই লিখেন, “এর ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন হয় তা হল ঢাকায় ইংরেজি শিক্ষিত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব যারা আস্তে আস্তে উচ্চপদে এবং ক্ষমতায় আসীন হন। এই শ্রেণিটির বুদ্ধিবুত্তিক এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল নতুন ধরনের।”একটি বিশেষ লক্ষণীয় বিষয়, কলকাতার ন্যায় ঢাকার নব উদ্ভব এ শ্রেণির উত্থান পর্বটি ছিল একচেটিয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকেই। কিন্তু কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় নবসৃষ্ট কলকাতা শহরে ঐতিহাসিক কারণেই বাঙালি হিন্দুর সমাবেশ ঘটেছিল এবং তারা ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল। কাজেই হিন্দুদের মধ্য থেকে কলকাতায় আধুনিক জনমতের উদ্ভব ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। আর এখানে বলা যেতে পারে যে, ঢাকা মোগল আমলে ইসলামী ঐতিহ্যমন্ডিত নগরী হলেও মোগলদের পতন এবং কোম্পানি শাসনের শুরুর দিকে ঐতিহাসিক কারণেই ঢাকার বনেদী মুসলিম পরিবারগুলি কোম্পানি শাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেনি। অধিকন্তু উনিশ শতকের চল্লিশ দশক থেকে ঢাকার পাশ্চাত্য শিক্ষার সুযোগ শুরু হলে সেখানেও নেতৃত্বে চলে আসে ঢাকার ধনী হিন্দু গোষ্ঠী। আর বসাক, গোপী ও মিত্র সম্প্রদায়টি নবাবি আমল থেকেই সম্পদের প্রাচুর্যে অগ্রসর ছিল। ইংরেজ শাসন ও আশীর্বাদ এদের উন্নতির পথে নতুন করে উন্মুক্ত করে দেয়। ১৮৪১ সালে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত কোনো সময়েই তিনজনের বেশি মুসলমান ছাত্র একত্রে ঢাকা কলেজে পড়াশুনা করেনি। এই রির্পোটটি ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এ ডব্লিউ, ক্র্যাফট এর। ঢাকার মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না করার পশ্চাতে শুধু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসই দায়ী নয়, নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় তা বহুলাংশে দায়ী ছিল। উনিশ শতকের ষাট দশকে ঢাকায় যে সকল সংবাদ ও সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছিল-সবগুলির পৃষ্ঠপোষক, সম্পাদক ও সাংবাদিক ছিলেন ঢাকার আধুনিক শিক্ষিত হিন্দু জনগোষ্ঠী। আধুনিক শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি তাদের সামাজিক-বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা চেতনা থেকেই রাজা রামমোহন বায় গ্রন্থাগারে জ্ঞান-চর্চা করেছিলেন। তবে গ্রন্থাগারে জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে কলকাতার মতো ঢাকার নব্য শ্রেণিটির বিকাশ শুধু বর্ণহিন্দু চট্রোপাধ্যায় ও বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, নিন্ম হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রসারিত ছিল। আর তাঁতী, কামার ও শাঁখারীর মধ্যেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশীদার ছিল। ঢাকার তাঁতী সম্প্রদায়ের রোহিনী কুমার বসাক ছিলেন ঢাকা কলেজের প্রথম গ্রাজুয়েট। এঁরা ছিলেন ঢাকার বনেদী ব্যবসায়ী।

শিক্ষার পাশাপাশি ঢাকার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ঘটে একই সময়ে। অর্থাৎ উনিশ শতকের ত্রিশ-চল্লিশ দশক থেকে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে ঢাকার অর্থনৈতিক জীবনের যে পুনরুত্থান ঘটে এর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে ঢাকার সাহিত্য চর্চার জগতের অর্থাৎ গ্রন্থাগারের। মোগল আমলে ঢাকা ছিল প্রাচ্যের বিখ্যাত ব্যবসা-বাণিজ্যের নগরী। আরব ও ইউরোপীয় বণিকদের আকৃষ্ট করত ঢাকার বাণিজ্য। মুর্শিদাবাদের প্রশাসনিক রাজধানী স্থানাস্তরের পরও ঢাকা ভারতবর্ষের বিখ্যাত ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থানটি দখল করে রাখে। ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের পতন শুরু হয় ১৭৬৫ সালে কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর। ১৭৬৫ থেকে ১৮৩০-৩৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের পতন কাল। ১৮৩৬ সালে অভ্যন্তরীণ শুল্ক এবং নগর শুল্ক প্রত্যাহারের পর ধীরগতিতে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্ভাবনা জেগে ওঠে। আঞ্চলিক প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার পুনরুত্থান শুরু হলে নগরায়ণের ধারাও গতি পায়। সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্রমবিকাশ ঘটে। এ নতুন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় পাট চাষ ও পাট ব্যবসা। এ সময়ে রেল যোগাযোগ ও স্টিমার ব্যবস্থা ঢাকার বাণিজ্যকে চাঙ্গা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো উনিশ শতকে এসব নব্য ব্যবসায়ীদের পরিচয় কী? আঠার শতকের শেষে ঢাকার বড় ব্যবসায়ীরা ঢাকা ত্যাগ করলে গুটিকতক স্থানীয় হিন্দু ব্যবসায়ী এবং আরমেনীয় ও কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। এখানে বাঙালি মুসলমানের কোনো অস্তিত্ব ছিলনা। বিষয়টি মোগল আমল থেকেই লক্ষ করা গেছে। ঢাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। এদের মধ্যে সুবর্ণ বণিক, সাহা ও বসাক ব্যবসা বাণিজ্য ও আর্থিক কর্মকান্ডের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে। ১৮৪০ সালের পর থেকে ঢাকার অর্থলগ্নী ব্যবসা পরিচালনা করে পোদ্দার সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দুরা। ঢাকার মুসলমানরা এসব ব্যবসায় ধর্মীয় কারণে আগ্রহ দেখাত না। তবে ঢাকার চামড়ার ব্যবসায় একটি বহিরাগত মুসলিম পরিবারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। ঢাকার চামড়া ব্যবসায়ী খাজা আলিমুল্লাহ এবং তার পুত্র আব্দুল গণি বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে ঢাকার জমিদারী লাভ করেন। খাজা আব্দুল গণি ও তার পরিবার আধুনিক ঢাকার সকল কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরমেনীয় ব্যবসায়ী পোগজ পরিবার ঢাকার শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখেন। ঢাকার পোদ্দাররাও এক পর্যায়ে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী বনে যান। ফরাসগঞ্জের দাস পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিখ্যাত মথুরানাথ পোদ্দার। তাদের পৈত্তিক নিবাস বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ে শুভড্যা গ্রামে। মথুরানাথও ঢাকার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। ফরাসগঞ্জের এই দাস পরিবার উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ঢাকার শিক্ষা-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জগতে ব্যাপক অবদান রাখে। সুতরাং ফরাসগঞ্জ তথা ঢাকার শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার ও নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার দু’টি ভূমিকা ছিল অপরিসীম।১০

ক. ঐতিহ্যবাহী রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগারের ইতিহাস:

প্রথম তিন দশক পর্যন্ত গ্রন্থাগারটির তেমন কোনো সংগ্রহ ছিল না, পৃথক কোনো ভবনও ছিল না। ব্রাহ্ম সমাজের মূল ভবনের দোতলার একটি অংশে সাময়িকভাবে গ্রন্থাগার স্থাপন করা হয়। গ্রন্থাগারটি পূর্ববাংলা ব্রাহ্ম সমাজের দ্বারা পরিচালিত একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান।১১ ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট কলকাতায় রাজা রামমোহন রায় একটি ভাড়া করা বাড়িতে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩৩ সালে ইংল্যান্ডে রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যু হলে ব্রাহ্ম সমাজ নির্জীব হয়ে পড়ে। ঐ সময়ে থেকে বাংলার নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা ব্রাহ্ম সমাজ পরিচালনা ও ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব নেন। ১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ ২১ জন ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন। ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবোধিনী পত্রিকা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।১০ ১৮৪৬ সালের ৬ ডিসেম্বরে ঢাকার আবগারী কালেক্টর ব্রজসুন্দর মিত্রের উদ্যোগে পূর্ববঙ্গের একমাত্র প্রধান শহর ঢাকায় প্রথম ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।১২

১৮৬৩ সালে ব্রজসুন্দর মিত্র ও দীননাথ সেন ঢাকায় ব্রাহ্ম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অবৈতনিক স্কুলটি ছিল মিড্ল ভার্নাকুলার স্কুল। ঢাকার আরমানিটোলায় ব্রাহ্ম সমাজ অফিসের সামনে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর্থিক অসুবিধার কারণে স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন শিক্ষানুরাগী জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী। তখন থেকে স্কুলটির নামকরণ করা হয় ‘জগন্নাথ স্কুল’। উনিশ শতকে জগন্নাথ স্কুল পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকার শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে আধুনিকতার দ্বার খুলে দেয়। গোগজ স্কুলের শিক্ষক গোপীমোহন বসাক জগন্নাথ স্কুলের প্রথম হেড মাস্টারের দায়িত্ব নেন। সেই জগন্নাথ স্কুলই পরবর্তীতে জগন্নাথ কলেজ এবং বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। উনিশ শতকের ঢাকায় বুদ্ধিভিত্তিক জাগরণ ও সংবাদ সাময়িকীপত্র প্রবন্ধের লেখক মো. এমরান জাহান লিখেন, “১৮৫৬ সালে ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজ নারী শিক্ষা প্রসারে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিল। এতে সহযোগিতা করেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ ব্রেনাল্ড এবং ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের হেডমাস্টার এফ. টিড (F. Tydd)। এতে স্থানীয় বুদ্ধিজীবী আনন্দ মোহন দাস এবং দীনবন্ধু মল্লিক (স্কুল ইনসপেক্টর) সম্পৃক্ত ছিলেন। ঢাকা বাংলা বাজারে স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল। ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজের অপর কর্নধার ছিলেন নবকান্ত চট্রোপাধ্যায়। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ঢাকার শিক্ষা সংস্কৃতির পুরোভাগে ছিলেন জগন্নাথ স্কুলের শিক্ষক এই নবকান্ত চট্রোপাধ্যায়। সামন্ত জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি স্কুল শিক্ষকের চাকুরি করেন এবং সংস্কারবাদী প্রগতিশীল ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন। ফলে তাঁকে রক্ষণশীল পিতা কর্তৃক ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করা হয়। তাদের উদ্যোগেই ঢাকায় জেনানা এজুকেইশন সোসাইটি প্রতিষ্ঠা পায়।” ১৮৬২ সালে ব্রজসুন্দর মিত্র ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ঢাকা কলেজে একটি ‘ল’ ক্লাস চালু করার আবেদন করেন।১৩ সরকার এ আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৮৬৩ সালেই Bachelor of Law এবং Licentiate in Law ডিগ্রির জন্য ঢাকা কলেজে একটি ‘ল’ ক্লাস চালু করেন।১৪

১৮৬৬ সালে ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক দীননাথ সেন প্রস্তাব করেছিলেন একটি গৃহ নির্মাণের। গৃহ নির্মাণের জন্য দীননাথ সেন পূর্ববঙ্গের অনেক ব্রাহ্ম কর্মীর কাছে চিঠি দেন। অনেকে সাহায্য প্রদানে সম্মতি জ্ঞাপন করে।১৫ ১৮৬৬ সালের ২৫ আগস্ট মাসে নয়জন কর্মীকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল একটি গৃহ নির্মাণ কমিটি। কমিটির নয়জন সদস্য হলেন-ঢাকার কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী অভয়চন্দ্র দাস, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রট রামকুমার বসু, কলেজিয়েট স্কুলের হেডমাস্টার কৈলাসচন্দ্র ঘোষ, বৈকুন্ঠনাথ সেন, পোগজ স্কুলের হেডমাস্টার গোপীমোহন বসাক, স্কুলসমূহের ডেপুটি ইন্সপেক্টর অক্ষয়কুমার সেন, কমিশনার অফিসের হেডক্লার্ক উমেশচন্দ্র দাস, জমিদার রাধিকামোহন রায়,কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক ও ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক দীননাথ সেন। এরপর কমিটির সদস্যগণ গৃহ নির্মাণের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে। গৃহ নির্মাণের জন্য ৫৮৫৭ জন ব্যক্তি চাঁদা প্রদান করে। এর মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ৫০০ টাকা, ব্রজসুন্দর মিত্র ৬০০ টাকা এবং দুর্গামোহন দাস ১০০০ টাকা চাঁদা প্রদান করেন। চাঁদা সংগ্রহের পর কমিটির সদস্যগণ গৃহ নির্মাণের জন্য কলেজিয়েট স্কুলের পাশে একটি জমি ক্রয় করে। সমাজগৃহের মন্দিরের নকশা প্রস্তুত করেন উমকান্ত ঘোষ। ১৮৬৭ সালের এপ্রিলে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অভয়কুমার দত্ত। ১৮৬৯ সালে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর এই ব্রাহ্মমন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়।

একটি সূত্রে জানা যায় ১৮৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শ্রীযুক্ত বাবু কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্ম সমাজ মন্দির উদ্বোধন করেন।পুরান ঢাকায় কোতোয়ালি থানার পাটুয়াটুলীর কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী অভয়চন্দ্র দাসের উদ্যোগে ১৮৭১ সালের ১৮ জানুয়ারিতে সমাজগৃহেই গণগ্রন্থাগার (পাবলিক লাইব্রেরি) প্রতিষ্ঠা করেন।১৬ ১৮৮১ সালে ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যগণ গ্রন্থাগার ব্যবহার করার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। পরবর্তীকালে ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যগণ রাজা রামমোহন রায় নামে গ্রন্থাগারটির নামকরণ করে।১৭ ১৯০৮ সালে ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা আজম গ্রন্থাগারটির উন্নয়নের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। একই সময়ে (১৯০৮সালে) কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক রত্নমনি গুপ্ত ব্যক্তিগতভাবে গ্রন্থাগারটির উন্নয়নের জন্য পাঁচ হাজার টাকা অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। এছাড়াও জমিদার রূপলাল দাসও আর্থিক সহযোগিতা করেন। ১৯১০ সালে সমাজগৃহের চত্বরে গ্রন্থাগারে জন্য একটি আলাদা ভবনে নির্মাণ করা হয়। গ্রন্থাগার ভবন উদ্বোধন করেন প্রথম ভারতীয় প্রিভি কাউন্সিলর কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্ত, আই.সি.এস। সে সময় গ্রন্থাগারের বইয়ের সংগ্রহ ছিল ১২ হাজার। আবুল কালাম শামসুদ্দীন এর রচিত অতীত দিনের স্মৃতি বইটিতে লিখেন, “১৯১৬ সালের দিকে তিনি এবং তাঁর সহযোগী আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্যের নেশায় রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগারে অধ্যয়নের জন্য নিয়মিত যেতেন। সে সময়ে রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগারে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিভিন্ন সাময়িকপত্র (মাসিক, সাপ্তাহিক ও দৈনিক) সর্বসাধারণের পাঠের জন্য উন্মুক্ত ছিল।”

প্রাচীন গ্রন্থাগারটি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বর্বরতার শিকার হয়। সন্ত্রাসীদের হামলায় গ্রন্থাগারে সঞ্চিত অসংখ্য সাময়িকী, দুর্লভ বইপত্র ও মূল্যবান নথিপত্র এক নিমিষে লোপাট হয়ে যায়। এমনকি গ্রন্থাগার ভবনের দরজা-জানালা পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীকালে লুট হয়ে যাওয়া বইপত্র উপযুক্ত মূল্যে ক্রয় করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্রাহ্ম সমাজের গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। প্রবাসী পত্রিকার দু’টি কপি ফেরত পাওয়া যায়। লেখক-গবেষক বদরুদ্দীন উমর গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষকে অবগত করেন যে, গ্রন্থাগারের একটি দুষ্প্রাপ্য বই তাঁর নিকট রক্ষিত আছে। তিনি দুষ্প্রাপ্য বইটি ফেরত দিতে সম্মতি জানায়। কিন্তু গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ বইটি ফেরত নেয়নি। বরং তাঁঁকে স্মারক গ্রন্থ হিসেবে বইটি উপহার দেন।

স্বাধীনতার পর ব্রাহ্ম সমাজ কর্তৃপক্ষ গ্রন্থাগারটি পুনঃস্থাপন করার উদ্যোগ নেয়। ব্রিটিশ আমলে রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগারটি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক অনুমোদন কিংবা নিবন্ধন করা ছিল কী না তার সঠিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থাৎ ১৯৮৪ সালের ১৭ এপ্রিলে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজ নামকরণ করে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধন করা হয়। যার নিবন্ধন সংখ্যা ঢ-০১৪৩৪। ১৯৯০ সালের দিকে গ্রন্থাগারটির সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবতীকালে গ্রন্থাগারটি আবার চালু করেন। রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার ভবনটি দীর্ঘদিন যাবৎ জরাজীর্ণ অবস্থায় বৃষ্টির পানি পড়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক নষ্ট হয়ে যায়।১৮

রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার ভবনের পরিস্থিতি:

কালের সাক্ষী রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার ভবনটি অনেক পুরনো বলে যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। এ জন্য ২০০৪ সালের ১৯ এপ্রিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নোটিশ পাঠায়। রাজউক ভবনটি পুরনো নকশাবিহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে চিহ্নিত করে। এক পর্যায়ে রাজউকের অথরাইজড অফিসার-১ স্বাক্ষরিত চিঠিতে সাত দিনের মধ্যে এ ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য তাগিদ দেন। তা না হলে ইমারত বিধিমালা সংশোধনী অ্যাক্ট নম্বর ১২/১৯৮৩ এর ৩ ধারার ৭ উপধারা মোতাবেক ভবনটি ভেঙে ফেলা হবে। উক্ত সময়ের মধ্যে ভবনটি না ভাঙলে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় অর্থ বহন করতে হবে এ মর্মে চিঠিতে উল্লেখ করে। ফলে নির্ধারিত সময়ে ভবনটি না ভাঙায় রাজউক ২০০৫ সালের ৯ মে শত বছরের ভবনটি ভাঙার অনুরোধ জানিয়ে আবারও পত্র দেয়। প্রাচীন পুরানো গ্রন্থাগার ভবন এবং একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিনিধিসহ ঢাকার সুধী মহল এতে বাঁধা দেয়। ২০০৫ সালে স্থাপনটি রক্ষা এবং গ্রন্থাগার চালু করার জন্য ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য ও ট্রাস্টির সদস্যগণ আদালতে একটি রিট পিটিশন আবেদন দাখিল করেন। যার নম্বর ৩৭৭৯। ট্রাস্টির সদস্যগণ উচ্চ আদালতের কাছে গ্রন্থাগার ভবনটি পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণের জন্য আবেদন করে। এছাড়াও স্থানীয় বাসিন্দা রবীন ঘোষ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি আবেদন করেন এবং প্রাচীন গ্রন্থাগার ভবনটি রক্ষার দাবি জানান।

উপরি উক্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে তদন্তপূর্বক একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোঃ শফিকুল আলম সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের বরাবরে একটি তদন্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে,পুরাকীর্তি আইনের আওতায় এ নিদর্শনটি প্রাচীন কীর্তি হিসেবে গণ্য করা যায় না এবং পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের উপযোগী নয়। তথাপি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার কমপ্লেক্স ভবন নামে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করে গ্রন্থাগারটি চালু করার পরিকল্পনা করে।১৯ কিন্তু উক্ত সিদ্ধান্তে নগর উন্নয়ন কমিটি বাঁধা দেয়। অর্থাৎ এলাকার শিক্ষিত সুশীল সমাজ ভবনটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসাবে উল্লেখ করেন।

২০০৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নগর উন্নয়ন কমিটি ভবন কর্তৃপক্ষের নিকট একটি নোটিশ পাঠায়। ২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবরে ডিসিসির (ঢাকা সিটি কর্পোরেশন) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোঃ সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয় যে, নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন ব্যতীত ভবনের কোনো কিছু অপসারণ, পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও পুননির্মাণ বা সংযোজন করা যাবে না। যার ফলে কর্তৃপক্ষ নতুন ভবন নির্মাণ বা পুরনো ভবন সংস্কার করতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার পূর্বের অবস্থাই আছে কালের সাক্ষী হয়ে।২০ ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারিতে পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার নিজস্ব অর্থায়নে নতুন ও পুরাতন সমস্ত প্রকাশনা নিয়ে ব্রাহ্ম সমাজের মন্দির পাশের ভবনে পুনরায় গ্রন্থাগারটি চালু করা হয়েছে।২১ ব্রাহ্ম সমাজের শতবর্ষীয় রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগারটির উদ্ভব ও বিকাশ আলোকপাত করা হয়েছে। ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের গ্রন্থাগারটি কখন, কীভাবে ও কার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, এর বিশদ আলোচনা ইতোমধ্যে করা হয়েছে। এছাড়াও উনিশ শতকে ঢাকার নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। উনিশ শতকে ঢাকার নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটির আবির্ভাব কীভাবে ঘটেছে এর ইতিহাস সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপন করা হয়েছে।

খ. নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারের আদি কথা

ফরাসগঞ্জে লালকুঠি হিসেবে পরিচিত একটি সুদৃশ্য ভবন। গবেষকদের মতে, ব্রিটিশ আমলে এখানে ফরাসি বসতি গড়ে ওঠেছিল। এটি মূলত ঢাকার দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর সংলগ্ন বাকল্যান্ড ঘাটের সন্নিকটে অবস্থিত ছিল।২২ পুরো ভবনটি লাল রঙের ছিল বলে সাধারণ মানুষ একে লালকুঠির নামেই অভিহিত করতেন। সেই থেকে নর্থব্রুক হলটি লালকুঠির নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।২৩ ১৮৭৯ সালে নর্থব্রুক হল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটিই ঢাকার টাউন হল বা মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।২৪ ১৮৮০ সালের ২৫ মে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুক ঢাকার পরিদর্শনের ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নর্থব্রুক হল নির্মাণ করা হয়।২৫ ব্রিটিশ ভারত শাসিত ভাইসরয় তথা ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুকের নামানুসারে নর্থব্রুক হল নামকরণ করা হয়েছে।২৬ ১৮৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নবাব আব্দুল গণি নর্থব্রুক হলটিতে একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিক অবস্থায় নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারের জন্য ভাওয়ালের

রাজা কুমার রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় অনুদান হিসেবে ৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। এছাড়াও যাঁদের পৃষ্ঠাপোষকতায় বা অনুদানে নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে। তাঁরা হলেন-ত্রিপুরার মহারাজা, বালিয়াটির জমিদার ব্রজেন্দ্র কুমার রায়, রানী স্বর্নময়ী, বাবু কালী কৃষ্ণ এবং শ্রীমতি বিশ্বেশ্বরী দেবী।২৭ শ্রী কেদারনাথ মজুমদার তাঁর ঢাকার বিবরণ ও ঢাকা সহচর গ্রন্থে লিখেন, “ঢাকার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগার হলো নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার।”২৮

১৮৮২ সালের ৮ ফেব্রæয়ারিতে নবাব আব্দুল গণির পুত্র নবাব আহসান উল্লাহ, জমিদার ব্রজেন্দ্র কুমার রায়, কুমার রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়, গোবিন্দ লাল বসাক প্রমুখ বিত্তশালী বিদ্যোৎসাহী প্রতিনিধিগণের অনুদানে নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার আরও সমপ্রসারিত হয়। পরবর্তীকালে নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটির দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারে জনসন হল নামে একটি ক্লাবঘর সংযুক্ত করা হয়। ১৮৯৩ সালে ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন লটমন জনসন।২৯ তাঁর নামানুসারে জনসন হল ক্লাবঘর নামকরণ করা হয়। নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারের পরিচালক জায়দুল ইসলাম বলেন, এই জনসন হল নামে ক্লাবঘরটি আর নেই।৩০ ১৮৮২ সালে নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটির ব্যয়ভার চলতো মূলত মিউনিসিপ্যালটির অনুদান ও সদস্যদের চাঁদার মাধ্যমে। ১৮৯০ সালে থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত সময়কালে গ্রন্থাগারটি পরিচালনার বার্ষিক বাজেট ছিল প্রায় ২০০০ টাকা। ঐ সময়ে নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারের বইয়ের সংগ্রহ ছিল ৬ হাজার ভলিউম।৩১ ২০১২ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারের বইয়ের সংগ্রহ ৩৯০৬ কপি।৩২ ১৯৫০ সালের পূর্বে নর্থব্রুক হলটি পাকিস্তান সরকার টেলিফোন অফিস হিসেবে ব্যবহার করে।৩৩ ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটির সকল কার্যক্রম বন্ধ ছিল।৩৪ ১৯৬৭ সালে নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটি শোচনীয় অবস্থায় পড়লে এগিয়ে আসেন ঢাকার ধনী ব্যক্তিত্ব মাওলা বখ্শ সরদার। তিনি ১৯৪৪ সালে ঢাকার নবাব পরিবার কর্তৃক ফরাশগঞ্জের মনোনীত সরদার। তিনি স্থানীয় মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে গড়ে তোলেন লালকুঠির কমিউনিটি সেন্টার। প্রথম দিকে টিনশেডে লালকুঠির কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৮ সালে লালকুঠিতেই এলাকাবাসীর শিক্ষা বিস্তারের জন্য মাওলা বখ্শ সরদার পুনরায় চালু করেন নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটি।৩৫ ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গ্রন্থাগারটি ভালো অবস্থায় ছিল বলে স্থানীয় জনসাধারণের কাছ থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পর থেকেই গ্রন্থাগারটির অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে পতিত হয়।

নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার ভবনের অবস্থা

স্বাধীনতার পর নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটির ভবন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহারে অযোগ্য হয়ে পড়ে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবনটি পুরনো নকশাবিহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ভবনটি ভাঙার নোটিশ দেয়। কিন্তু নগর উন্নয়ন কমিটি সরকারি উদ্যোগে বাঁধা দেয়। অর্থাৎ এলাকার শিক্ষিত সুশীল সমাজ ভবনটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পুরাকীর্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ২০০৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারিতে নগর উন্নয়ন কমিটি ভবন কর্তৃপক্ষের নিকট একটি নোটিশ পাঠায়। কমিটির অনুমোদন ব্যতীত ভবনের কোনো কিছু অপসারণ, পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও পুননির্মাণ বা সংযোজন করা যাবে না। যার ফলে কর্তৃপক্ষ নতুন ভবন নির্মাণ বা পুরনো ভবন সংস্কার করতে পারবে না। নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার ভবনটি পূর্বে অবস্থা ঠিক রেখে নতুনভাবে সংস্কার করা হয়।

নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারের বর্তমান অবস্থা:

নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটি পূর্বের অবস্থাই বিদ্যমান আছে। এ গ্রন্থাগারের আশে পাশে নতুন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। নতুন স্থাপনাগুলি মধ্যে মঈন উদ্দিন চৌধুরী মেমোরিয়াল হল, কমিশনার কার্যালয়, স্পোটিং ক্লাব, কমিউনিটি সেন্টার, ব্যায়ামাগার, বিট পুলিশিং অফিস ও ডায়াবেটিস সমিতির ছোট বড় সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ৭৯ নং ওয়ার্ডের বীর শহীদের ম্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নর্থব্রুক হলের প্রবেশ পথের মাঝামাঝি একটি সুদৃশ্য তাঁরা আকৃতির ফোয়ারা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও নর্থব্রুক হলের মূল ফটকের সামনে একটি রবীন্দ্র ম্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারটি সিটি কর্পোরেশনের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।

উপসংহার:

উনিশ শতকে ঢাকার শিক্ষার ও সংস্কৃতি প্রসারের ফলে বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাগারও গড়ে ওঠেছিল। তবে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য যে সকল ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল তম্মধ্যে গ্রন্থাগার অন্যতম। এখানে বলা যায়, যে দেশের গ্রস্থাগার যত বেশি উন্নত সে দেশের শিক্ষার মান তত বেশি উন্নত। সত্যিকার অর্থে জাতি গঠনে যেমন প্রয়োজন শিক্ষার। তেমনি শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন হয় বই-পুস্তক ও অন্যান্য তথ্য উপাত্ত। সে সমস্ত বই-পুস্তক ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন হয় গ্রন্থাগারের। তাই গ্রন্থাগার ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন কোনো ক্রমে সম্ভব নয়। শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০২ সালকে “গ্রন্থাগারবর্ষ” হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে শতবর্ষীয় গ্রন্থাগারগুলো আলোর মুখ দেখবে কাল-থেকে-কালান্তর। উনিশ শতকের ঢাকায় রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার ও নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার দু’টি ছিল জনগণের জন্য যুগোপযোগী। বিশেষ করে লেখক-সাংবাদিক ব্যক্তিত্বদের পদচারণায় গ্রন্থাগার দু’টি ছিল মুখরিত। আর এদিকে সমকালীন বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ঢাকায় শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করার পেছনে বুদ্ধিজীবী ও মুসলিম শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নের দিকে নজর দিলে এখানকার জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটতে থাকে আর ঐ সময়ে ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠিত রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার ও নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার দু’টি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।


তথ্যসুত্র:

  • ১. জাহান, ড. মো. এমরান, উনিশ শতকের ঢাকায় বুদ্ধিভিত্তিক জাগরণ ও সংবাদ সাময়িকীপত্র, (জার্নাল অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ, ভলিউম-৩), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৩, পৃ. ৬৬
  • ২. Islam, M. Mufakhrul, ÓThe Economy of Dhaka 1610-1947 Ó (400 year of Capital Dhaka and Beyond vol-2) Asiatic Society of Bangladesh, Dhaka 2011, p.31-34
  • ৩. ইফতিখার-উল-আউয়াল (সম্পা), ঐতিহাসিক ঢাকা মহানগরী: বিবর্তন ও সম্ভাবনা, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ২০০৩, পৃ. ১৫৪
  • ৪. জাহান, ড. মো. এমরান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৯-৭০
  • ৫. আহমেদ, শরীফ উদ্দিন, ঢাকা কলেজের ইতিহাস ও নগর জীবন ১৮৪০-১৯২১, একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি, ঢাকা, ২০০৬, পৃ. ৬৮
  • ৬. রফিকুল ইসলাম, ড. মোঃ, ঢাকার গ্রন্থাগারের ক্রমবিকাশ ও ব্যবস্থাপনা, সময় প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৮, পৃ. ১৭-১৮
  • ৭. ঐ, পৃ. ১৩৩
  • ৮. ব্রাহ্ম সমাজ সম্পর্কে দেখুন, Kopf, David, The Brahmo Samaj and the Shaping of the Modern India Mind
  • ৯. জাহান, ড. মো. এমরান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২-৭৩
  • ১০. বিস্তারিত, আহমেদ, শরীফ উদ্দিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬-২৭
  • ১১. দৈনিক সমকাল ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৯ আরও দেখুন, মুখোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার, রামমোহন ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, ১৯৬৫
  • ১২. মামুন, মুনতাসীর, উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের সমাজ, সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র, ঢাকা, ১৯৮৬, পৃ. ১৬০-১৮৪
  • ১৩. মামুন, মুনতাসীর, ঢাকার প্রথম, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১০, পৃ. ১০৫-১০৬,
  • ১৪. জাহান, ড. মো. এমরান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১-৭২
  • ১৫. আহমেদ, শরীফ উদ্দিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮
  • ১৬. রফিকুল ইসলাম, ড. মোঃ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০-২১
  • ১৭. ঘোষ, কাজল, নানা রঙের ঢাকা, নালন্দা, ঢাকা, ২০০৯, পৃ.২৯৯, আরও দেখুন, রাহমান, শামসুর, ম্মৃতির শহর, শিশু সাহিত্য বিতান, চট্রগ্রাম, ১৩৮৬, পৃ. ১০৫
  • ১৮. রফিকুল ইসলাম, ড. মোঃ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১-২২
  • ১৯. দৈনিক কালের কন্ঠ ৬ অক্টোবর, ২০১১
  • ২০. দৈনিক সমকাল ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
  • ২১. দৈনিক প্রথম আলো ২৫ জানুয়ারি, ২০১৫
  • ২২. রহমান, এস. এম. মাহফুজুর, নর্থব্রুক হল (সিরাজুল ইসলাম, প্রধান সম্পাদক , বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ), খন্ড -৬, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, ২০১১, পৃ. ৩৫৮
  • ২৩. আহমদ, মনোয়ার, ঢাকার পুরোনো কথা, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৮,পৃ. ৮৬
  • ২৪. আহমেদ, শরীফ উদ্দিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬১
  • ২৫. রাহমান, শামসুর প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৫-১০৬
  • ২৬. রহমান, এস. এম. মাহফুজুর, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৮
  • ২৭. রাহমান, শামসুর প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৬
  • ২৮. মজুমদার, শ্রী কেদারনাথ, ঢাকার বিবরণও ঢাকা সহচর, গতিধারা, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৫৬-৬৭
  • ২৯. মামুন, মুনতাসীর, ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী, খন্ড -২য়, অনন্যা, ঢাকা, ২০০৯, পৃ. ৭০
  • ৩০. সাক্ষাৎকার: জায়দুল ইসলাম, বয়স- ৫৫,পদবি-পরিচালক, নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগার
  • ৩১. রাব্বি, মোহম্মদ ফজলে, বাংলা সংস্কৃতির শতবর্ষ ঃ গ্রন্থাগার (মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারবর্ষ), রোদেলা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ১৮
  • ৩২. নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারের সংযোজন রেজিস্টার বহি থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ
  • ৩৩. ঘোষ, কাজল, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৩
  • ৩৪. নর্থব্রুক হল গ্রন্থাগারের অফিস রেকর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ
  • ৩৫. কাজল ঘোষ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৩
  • ৩৬. দৈনিক সমকাল ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
Show More

Related Articles

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close