বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থাগার পেশা বিষয়ক মাসিক অনলাইন সাময়িকী

logo

librariansvoice@gmail.com

ব্লক পদ গ্রন্থাগারিকদের পদ বৈষম্য নিরসনে প্রস্তাব

আবু মো. হান্নান: গ্রন্থাগারিকতা পেশার দীর্ঘদিনের একটি পুঞ্জীভূত সমস্যা হচ্ছে, চাকরি ক্ষেত্রে এ পেশার যথাযথ মর্যাদা বা পদোন্নতি নেই। সমগ্র চাকরিজীবনই তাদের কাটে পদোন্নতিবিহীনভাবে। অর্থাৎ যেখানে শুরু সেখানেই তার শেষ, যাকে বলে ব্লক পদের বিড়ম্বনা। চাকরি ক্ষেত্রে কম-বেশি সবারই পদোন্নতি ঘটে। ব্যতিক্রম শুধু লাইব্রেরিয়ান ও অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইব্রেরিয়ানদের ক্ষেত্রে, যা কর্মক্ষেত্রে একই পরিবেশে অন্য পেশার সঙ্গে লাইব্রেরি পেশাজীবীকে অবমাননাকর পরিস্থিতিতে নিপতিত করে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে সুষ্ঠু কর্মপরিবেশের অন্তরায়।

ধরা যাক, সচিবালয়ের কোনো একটি লাইব্রেরিতে সমমর্যাদা বা স্কেলে একজন সহকারী গ্রন্থাগারিক ও একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা) হিসেবে যোগদান করেন। নির্দিষ্ট সময়ে সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ডের ভিত্তিতে প্রথমেই তিনি (এও বা পিও) সহকারী সচিব ও চার বছর পর তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব এবং বয়স থাকা সাপেক্ষে উপ-সচিব পদেও পদোন্নতি পেয়ে থাকেন (পিওদের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে, যা খুবই যুক্তিসংগত)। নিয়োগবিধি অনুযায়ী উভয়েরই স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন। তবে অতিরিক্ত হিসেবে সহকারী লাইব্রেরিয়ানের ক্ষেত্রে এক বছরের একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রি প্রয়োজন পড়ে, একটি ডিগ্রি বেশি থাকা সত্ত্বেও সমগ্র চাকরিজীবনে একজন সহকারী গ্রন্থাগারিককে তার সমপর্যায়ের কলিগকে বস মেনে কাটাতে হয়।

অন্যদিকে একটি কলেজে সমান শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে দুই বন্ধুর একজন প্রভাষক ও অপরজন লাইব্রেরিয়ান পদে যোগদান করেন। নির্দিষ্ট সময়ান্তে প্রভাষক পদোন্নতি পেয়ে একদিন প্রফেসর হন আর লাইব্রেরিয়ান বন্ধুটি পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করেন। আর রুমালে চোখ মুছে জীবন কাটান। সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজসহ দেশের ২৭টি সেক্টরে কর্মরত লাইব্রেরিয়ান ও সহকারী লাইব্রেরিয়ানদেরই এ করুণ অবস্থা। অথচ লাইব্রেরি পেশাজীবীরাই কর্মক্ষেত্রে অকাতরে তথ্য পরিষেবা, বই-পুস্তক, সাময়িকীসহ বিভিন্ন গবেষণা জার্নাল ও ই-বুক সরবরাহ করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরল সংগ্রহগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যবহার উপযোগী করার জন্য তিনি বিজ্ঞানসম্মতভাবে তা সংরক্ষণ করেন। দুষ্প্রাপ্য এসব রেকর্ড একটি জাতির অতীত ও বর্তমানের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে থাকে। দুর্ভাগ্য হলো চাকরি ক্ষেত্রে তাদের মর্যাদা নেই। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০টি ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে বেসরকারি স্কুল ও কলেজের সহকারী লাইব্রেরিয়ানদের প্রচলিত শিক্ষক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। অথচ স্কুলের সহকারী লাইব্রেরিয়ানরা লাইব্রেরি পরিচালনার পাশাপাশি প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি ক্লাস নিয়ে থাকেন। তাদেরও সমগ্র চাকরিজীবনে কোনো পদোন্নতি নেই, বরং তাদের শিক্ষক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা ভীষণ অবমাননাকর।

পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের নীরব কর্মী দেশের ২৭ সেক্টরে কর্মরত লাইব্রেরি পেশাজীবীদের বিদ্যমান বৈষম্য জাতীয় স্বার্থেই দূরীভূত হওয়া উচিত। আগামী দিনে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার ভিত্তিতে ২৭টি সেক্টরকে এক মঞ্চে সমবেত হতে হবে। অতঃপর জাতীয় সংগঠনের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে পথ চললে কাক্সিক্ষত ফল আসবে। এজন্য একটি খসড়া প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট সর্বসাধারণের বিবেচনার জন্য পেশ করা হলো:

গঠন করা যেতে পারে ‘বাংলাদেশের গ্রন্থাগার পেশাজীবী ঐক্য মোর্চা (Bangladesh Library Professionals Oikko Morcha–BALPOM)|

দাবি হতে পারে:

এক. গ্রন্থাগারিক ও সহ-গ্রন্থাগারিকদের চাকরিতে ‘ব্লক পদ’ প্রথার বিলোপ চাই;

দুই. সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত (স্কুল-কলেজসহ) সর্বস্তরে পদোন্নতির ব্যবস্থা রেখে ইউনিফর্ম নিয়োগ বিধি চাই;

তিন. এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারিক ও সহ-গ্রন্থাগারিকদের হৃত শিক্ষকমর্যাদা ফেরত চাই;

চার. এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারিক ও সহ-গ্রন্থাগারিকদের মর্যাদাহানিকর পরিপত্র প্রত্যাহার চাই;

পাঁচ. গ্রন্থাগার পেশজীবীদের প্রশিক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান চাই;

ছয়. সমগ্র গ্রন্থাগার পেশজীবীদের চাকরি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি পৃথক বিভাগ চাই;

সাত. গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পৃথক ক্যাডার সার্ভিস চাই;

আট. জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সব মহল্লায় গ্রন্থাগার চাই;

নয়. মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক গ্রন্থাগার, তথ্য বিজ্ঞান ও আর্কাইভস বিষয়টির অন্তর্ভুক্তি চাই;

দশ. ডিজিটাল গ্রন্থাগার সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় তথ্য বাতায়নে সরকারি গ্রন্থাগারের সংযুক্তি চাই।


আবু মো. হান্নান, গ্রন্থাগারিক, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়

কেন্দ্রীয় কাউন্সিলর, বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (ল্যাব)

প্রথম প্রকাশ: সাপ্তাহিক সম্ভাবনা

8 Responses to “ব্লক পদ গ্রন্থাগারিকদের পদ বৈষম্য নিরসনে প্রস্তাব”

  • Nayeem Moortoza / Reply

    সুন্দর প্রস্তাব।


  • মোঃ ইব্রাহিম / Reply

    পৃথিবীতে ঐ সকল জাতি উন্নত,যে জাতির লাইব্রেরি বেশি সম্মৃদ্ধ।


  • মোহাম্মদ ঈশা খাঁন। / Reply

    অনেক ভাল প্রস্তাব।


  • মোহাম্মদ ঈশা খাঁন। / Reply

    অনেক ভাল প্রস্তাব।


  • মোহাম্মদ ঈশা খাঁন। / Reply

    অনেক ভাল প্রস্তাব।বাস্তবায়ন হলে অবহেলিত সবার অনেক উন্নতি হবে।


  • Aminul / Reply

    মাদ্রাসায় 2018 এমপি নীতিমালার কেন আমরা সাধারণ বিভাগের গ্রন্থাগার কোর্স সম্পন্ন কারিগর, গ্রন্থাগারিক পোস্টে নিয়োগ নেওয়া যাবে না?, তা জানতে চাই ।


  • মিহির কান্তি চাকমা / Reply

    দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ।


  • Md.Kawser ali liton / Reply

    সহমত


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *