বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থাগার পেশা বিষয়ক মাসিক অনলাইন সাময়িকী

logo

librariansvoice@gmail.com

ডিজিটাল লাইব্রেরী, এর উপাদান ও বাংলাদেশে এর অবস্থান ধারণা

অন্তরা আনোয়ার:

ডিজিটাল শব্দটি আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সকালের এলার্ম থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ডিজিটাল ডিভাইস সমূহ আমাদের জীবনের উপর প্রভাব ফেলে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চমানের শিখরে পৌঁছাতে গেলে এখন উচ্চ গতিসম্পন্ন হ্যান্ডসেট এবং ল্যাপটপ কম্পিউটার ব্যবহারের বিকল্প নেই। এককালে বই লেখা হতো মাটির ফলকে, প্যাপিরাস পাতায়, চামড়ায়। তারপর এসেছে কাগজের বই। এখন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসেছে ই-বই যা কম্পিউটারে পড়া যায়, শোনা যায়।

বর্তমান যুগে বহুল আলোচিত একটি শব্দের সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি আর তা হচ্ছে ডিজিটাল লাইব্রেরী। ডিজিটাল লাইব্রেরী শব্দটি প্রথমে ১৯৯৪ সালে এনএসএফ / ডারপা / নাসা ডিজিটাল লাইব্রেরি ইনিশিয়েটিভ দ্বারা জনপ্রিয় হয়। কম্পিউটার নেটওয়ার্কগুলির উপলব্ধতার সাথে তথ্য সম্পদগুলি বিতরণ এবং অ্যাক্সেস প্রয়োজনমত ব্যবহার্য হবে এই চিন্তা থেকেই এর উদ্ভব। ধাপে ধাপে তথ্যপ্রযুক্তি প্রসারের সাথে সাথে এর প্রসার ঘটেছে বহুগুণ।

ডিজিটাল লাইব্রেরি কি?

ডিজিটাল লাইব্রেরিগুলো ডিজিটাল কনটেন্টগুলোর সংরক্ষণ এবং প্রসার ঘটায়। এই ডিজিটাল কনটেন্টের ফরম্যাট তৈরী করা হয় মুদ্রিত উপকরণ এবং নথিগুলির ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে বা পূর্বে বিদ্যমান মুদ্রিত উপকরণ এবং নথিগুলির পুনঃ-রচনা করে। প্রথম নথিগুলোকে ডিজিটালকৃত নথি হিসাবে পরিচিত, এবং পরবর্তী ধরনের নথিগুলো প্রকৃতিগত ডিজিটাল নথি হিসাবে পরিচিত। ডিজিটাইজকৃত নথিগুলো সাধারণত ইমেজ বা টেক্সট ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা হয়।

 

ডিজিটাল লাইব্রেরির উপাদানঃ

১। ডিজিটাল সংগ্রহঃ

সংগ্রহ অবকাঠামো সাধারণত দুটি উপাদানে বিভক্ত, মেটাডেটা এবং ডিজিটাল কনটেন্ট। ডিজিটাল বস্তুর জন্য মেটাডেটাগুলো গ্রন্থাপঞ্জীগত তথ্য সরবরাহ করে। ডিজিটাল অবজেক্টগুলি হলো প্রাথমিক দস্তাবেজ যা ব্যবহারকারীদের কনটেন্টগুলো ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু মেটাডেটা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর অনুসন্ধান সনাক্তকরণ, পুনরুদ্ধার এবং অবস্থানকে সহজ করে তোলে। একটি ডিজিটাল লাইব্রেরির তথ্য বিষয়বস্তু যা মিডিয়ার প্রকারের উপর নির্ভর করে, তার মধ্যে রয়েছে কাঠামোগত / অনির্ধারিত টেক্সট, সাংখ্যিক তথ্য, স্ক্যান করা চিত্র, গ্রাফিক্স, অডিও এবং ভিডিও রেকর্ডিং এবং অন্যান্য মাল্টিমিডিয়া সামগ্রীর সমন্বয়। বিভিন্ন ধরণের সেবাগুলি ডিজিটাল লাইব্রেরীতে ভিন্নভাবে পরিচালিত করা হয়।

 

২। ডিজিটাল জ্ঞানের সংগঠনঃ

কোনো প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল কনটেন্ট অনুসন্ধান এবং নেভিগেশান ছাড়া সম্পূর্ণরূপে নিরর্থক এবং অর্থহীন হবে কারণ এই ডিজিটাল বস্তুগুলিকে সংগঠিত করা এবং ব্যবহারকারী সম্প্রদায়ের কাছে অ্যাক্সেসযোগ্য করতে হয়। একটি কার্যকরী অ্যাক্সেস প্রক্রিয়া থাকতে হয় যা একটি ব্যবহারকারীকে ডিজিটাল সংগ্রহগুলিকে ব্রাউজ করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নেভিগেট করতে অনুমতি দেয়; কারণ সময়ের সাথে সাথে সংগ্রহের ইলেকট্রনিক সংস্থানগুলি সংখ্যা এবং ধরণে বৃদ্ধি পায়। ডিজিটাল লাইব্রেরিগুলি সম্পূর্নভাবেই ওয়েব এবং ইন্টারনেট প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল এবং ইন্টারনেটের প্রোটোকলগুলিও ব্যবহার করে থাকে। ডিজিটাল কনটেন্টের সাজনোর পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

  • মেটাডেটা স্কিমের উন্নয়ন;
  • প্রতিটি ডিজিটাল কনটেন্টে মেটাডেটা সরবরাহ করা;
  • প্রতিটি ডিজিটাল কনটেন্টে অনন্য অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার নির্ধারণ করা;
  • তাদের ব্রাউজিং, অনুসন্ধান এবং নেভিগেশান সহজতর করার জন্য সংশ্লিষ্ট মেটাডেটা সহ ডিজিটাল কনটেন্টগুলি লিঙ্ক করা;
  • ডিজিটাল বস্তু এবং সংযুক্ত মেটাডেটাকে ডাটাবেসের মধ্যে সংগঠিত করা;
  • ব্রাউজ, অনুসন্ধান এবং ন্যাভিগেশন ইন্টারফেস তৈরী করা।

Digital Library services

৩। এক্সেস ইনফ্রাস্ট্রাকচারঃ

ব্যবহারকারীরা ওয়েবে অনুসন্ধানের জন্য ইন্টারফেস ব্যবহার করে ডিজিটাল লাইব্রেরিতে ইন্টারঅ্যাক্ট করে। ডিজিটাল লাইব্রেরী ব্রাউজিং, অনুসন্ধান এবং নেভিগেশনকে সমর্থন করে এমন একটি ইন্টারফেস দেয় যা ব্যবহারকারীর জন্যও সহজে তার অনুসন্ধানের ফলকে ত্বরান্বিত করে।

একটি লাইব্রেরীর জন্য অ্যাক্সেস ইনফ্রাস্ট্রাকচারটি OPAC / WebOPAC (জার্নাল ধারণক্ষমতাসম্পন্ন), অ্যাক্সেস ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ডিজিটাল লাইব্রেরির জন্য ব্রাউজ, অনুসন্ধান এবং নেভিগেশনাল ইন্টারফেস, বিশেষ স্থানীয় সংগ্রহগুলির জন্য বিশেষ সূচক, পোর্টাল বা ওয়েবের জন্য বিভিন্ন গেটওয়েগুলি রয়েছে। রিসোর্স এবং লাইব্রেরী OPAC সহ একটি লাইব্রেরি অ্যাক্সেসযোগ্য সমস্ত ই-সংস্থানগুলির জন্য একটি সমন্বিত ইন্টারফেস প্রদান করে থাকে ডিজিটাল লাইব্রেরী।

৪। কম্পিউটার এবং নেটওয়ার্ক ইনফ্রাস্ট্রাকচারঃ

একটি বিতরণযোগ্য ক্লায়েন্ট-সার্ভার পরিবেশের আদর্শ ডিজিটাল লাইব্রেরির সার্ভারে ও ক্লায়েন্ট সাইডে একইসাথে হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার থাকে। ক্লায়েন্ট হলো সেই যন্ত্রগুলি যা অন্যপ্রান্তে ব্যবহারকারীকে ডিজিটাল লাইব্রেরী ব্যবহারে সাহায্য করে যখন সার্ভারটি ডেটাবেস, ডিজিটাল কনটেন্ট, ব্রাউজ, অনুসন্ধান এবং নেভিগেশনাল ইন্টারফেসগুলিকে লাইব্রেরী সংগ্রহের অ্যাক্সেস সহজতর করে। ডিজিটাল লাইব্রেরির জন্য কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, সফ্টওয়্যার এবং নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে নিম্নলিখিত চারটি বিভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে:

i) সার্ভার-সাইড হার্ডওয়্যারের উপাদানগুলি হল ইনপুট ডিভাইস, স্টোরেজ ডিভাইস, কমিউনিকেশন ডিভাইস, ইত্যাদি;

ii) সার্ভার-সাইড সফটওয়্যার সামগ্রী হল ইমেজ ক্যাপচারিং বা স্ক্যানিং সফ্টওয়্যার, ইমেজ বর্ধন এবং ম্যানিপুলেশন সফ্টওয়্যার, ওয়েব সার্ভার, তথ্য পুনরুদ্ধার সফ্টওয়্যার, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রেকগনিশন (ওসিআর) সফটওয়্যার, ডেটাবেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (বিডিএমএস) সফ্টওয়্যার, ডিজিটাল রাইটস ম্যানেজমেন্ট (ডিআরএম) ইত্যাদি;

iii) ক্লায়েন্ট সাইড হার্ডওয়্যার হল পিসি, ল্যাপটপ এবং মোবাইল ডিভাইস; এবং

iv) ক্লায়েন্ট-সাইড সফ্টওয়্যার উপাদানগুলি হল ওয়েব ব্রাউজার, অ্যাক্রোব্যাট রিডার, মিডিয়া প্লেয়ার, ওয়ার্ড প্রসেসিং সফটওয়্যার, স্প্রেডশীট সফটওয়্যার, ইমেজ প্রসেসিং সফ্টওয়্যার ইত্যাদি।

৫। ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট এবং ডিজিটাল রাইটস ম্যানেজমেন্টঃ

কপিরাইট অতীব জরুরী একটি বিষয়। মার্কিন ডিজিটাল মিলেনিয়াম কপিরাইট অ্যাক্ট (DMCA-2000) এর ধারা 108 অনুযায়ী, প্রকাশিত কাজের মুদ্রণ শেষ হয়ে যেত পারে সেই সুবাদে গ্রন্থাগারগুলিকে অপ্রকাশিত বা প্রকাশিত সামগ্রীর তিনটি কপি পর্যন্ত সংরক্ষণ করার অধিকার দেয় । উপরন্তু, ডিজিটাল কপিগুলি যতক্ষণ লাইব্রেরী প্রাঙ্গণের ভিতরে ডিজিটালভাবে বিতরণ করে ততক্ষণ সেই সংগ্রহগুলোর ব্যবহার কপিরাইটের আওতায় পরে।

ডিজিটাল লাইব্রেরিগুলিতে অ্যাক্সেস ম্যানেজমেন্ট বলতে সাধারণত অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ, শর্তাবলী, লাইসেন্সিং শর্তাবলী এবং ডিজিটাল রাইটস ম্যানেজমেন্ট (ডিআরএম) বোঝায় । ডিজিটাল রাইটস ম্যানেজমেন্ট (ডিআরএম) সমাধানের একটি সিস্টেম যা পরিকল্পনা করা হয়েছে অননুমোদিত অ্যাক্সেস, অনুলিপি এবং কপিরাইটযুক্ত ডিজিটাল মিডিয়া অবৈধ বন্টন প্রতিরোধ করার উপায় হিসাবে। ডিআরএম টেকনোলজিটি তৈরী হয়েছে প্রকাশকদের জন্য যাতে তারা তাদের কাজগুলোর অবৈধ পুনঃউৎপাদন ও বিতরণ করতে পারে। অনলাইন পরিবেশে ডিজিটাল কনটেন্টের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের অপব্যবহারের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে ডিজিএম সাহায্য করবে। অ্যাক্সেস পরিচালনার চারটি স্বতন্ত্র দিক হলঃ

i) লাইসেন্স চুক্তি এবং নীতিমালা;

ii) ব্যবহারকারী প্রমাণীকরণ এবং অনুমোদন;

iii) ডিজিটাল কনটেন্টের সঠিকতা এবং সম্পূর্ণতা; এবং

iv) ডিজিটাল কনটেন্ট বা তার মেটাডেটা চালানোর অনুমতি।

বাংলাদেশে ডিজিটাল লাইব্রেরীর কিছু উদাহরণ:

প্রয়োজনীয় পুরনো বইকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল লাইব্রেরি দিয়েছে পথের দিশা। পুরনো বইয়ের সন্ধান পাওয়া যথেষ্ট দুষ্প্রাপ্য বিষয়। কাগজে মুদ্রণের কারণে সেসব বই অনন্তকাল টিকেও থাকে না। পুরনো বইগুলো এখন খুজে পাওয়া দুষ্কর। বিপুলসংখ্যক বইয়ের সংগ্রহশালা নিয়ে তৈরি ওয়েবসাইটই হলো অনলাইন লাইব্রেরি বা ‘ই-লাইব্রেরি’। এ ধরণের লাইব্রেরীতে পিডিএফ, স্ক্যান ইমেজ এবং টেক্সট ফরম্যাটে থাকা সফট কপিটি ডাউনলোড করে সংগ্রহ করারও সুযোগ থাকে। অনলাইন ডিজিটাল লাইব্রেরির জগতে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে ‘ই-বুক’ সবার কাছেই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হাতের মুঠোয় প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে। ই-বুক এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হচ্ছে।

সরকারি বেসরকারি বেশকিছু লাইব্রেরি অনলাইন হয়েছে এবং হবার পথে। দেশের প্রধান লাইব্রেরি ‘সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার’ লাইব্রেরির সবচেয়ে বড় সংগ্রহ থাকবে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সংবাদপত্রের স্ক্যান কপিগুলো। এর পাশাপাশি দৈনিক আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ, পাকিস্তান অবজারভার, দি ডন এইসব পত্রিকার কপি রয়েছে পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেসবের স্ক্যান কপিও দেওয়া হবে অনলাইন লাইব্রেরিতে। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোকেও ডিজিটাল লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এছাড়া, বাংলা একাডেমিও তাদের লাইব্রেরিকে ডিজিটাল লাইব্রেরিতে রূপান্তরের কাজ শুরু করেছে। অনলাইন লাইব্রেরি করেছে বুয়েট, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। আর, বেসরকারি পর্যায়েও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি ইতোমধ্যেই তাদের লাইব্রেরিকে ডিজিটাল লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত করেছে।

অনলাইনে সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগার

প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে অনলাইন গণগ্রন্থাগারের কাজ শুরু হয়েছে শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরিতে। ‘অনলাইনে গণগ্রন্থাগারসমূহের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশীষ কুমার সরকার –এর ভাষ্যমতে, দেশের লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এ জন্য পাবলিক লাইব্রেরির ৪০ থেকে ৫০ হাজার বই অনলাইনে স্ক্যান করে প্রকাশ করা হবে। এরমধ্যে সব বই কপিরাইট আইনের জন্য প্রকাশ করা হবে না। তবে, সব বইয়ের প্রথম আট পৃষ্ঠা স্ক্যান করে দেওয়া হবে। যাতে পাঠকরা জানতে পারেন এ বইটি গ্রন্থাগারে রয়েছে।

তিনি আরো জানান, বই ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সারা দেশেই ‘সরকারি গণগ্রন্থাগারসমূহের অনলাইন সেবা ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সকল সরকারি গণগ্রন্থাগারে নিজস্ব সার্ভারের মাধ্যমে অনলাইন কানেকটিভিটি প্রদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় লাইব্রেরি

এটি একটি বিশেষ গ্রন্থাগার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে রেফারেন্স সেবা প্রদানের জন্য এ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠত হয়। ১৯৯১ সালে গ্রন্থাগারটির নাম হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় লাইব্রেরি। ১৯৯১ সালের আগে গ্রন্থাগারটির নাম ছিল রাষ্ট্রপতির সচিবালয় গ্রন্থাগার।

এ গ্রন্থাগারে বর্তমানে ৩১ হাজারের বেশি প্রকাশনা রয়েছে। এখানে লাইব্রেরি প্রকাশনাসমূহ ‘ডিউই ডেসিমেল ক্লাসিফিকেশন’ নিয়ম অনুযায়ী বিন্যাসিত। এখানে ১৭ হাজারের বেশি বই অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে ৫ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের ই-প্রকাশনাও রয়েছে। এই গ্রন্থাগারে কিছু আর্কাইভাল সংগ্রহ রয়েছে। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের প্রথম হস্তলিখিত সংবিধানের খসড়া এবং বিভিন্ন কমিশনের রিপোর্টসমূহ। তবে, অনুমতিসাপেক্ষে গবেষকগণ তাদের গবেষণার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এ গ্রন্থাগার ব্যবহার করতে পারবেন।

দুষ্প্রাপ্য বই নিয়ে বাংলা একাডেমি অনলাইন গ্রন্থাগার

বাংলা একাডেমি গ্রন্থাগার-অনলাইন’ এর লক্ষ্য হচ্ছে ‘সবার জন্য জ্ঞান’। প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ১ লাখ পৃষ্ঠা সরাসরি ইন্টারনেটে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এখানে বই পড়া ও ডাউনলোড করা যাবে।

একটি ভিন্নধর্মী ডিজিটাল লাইব্রেরীর উদাহরণ হতে পারে গ্রন্থ ডট কম। সারাদেশের সবার কাছে বিনামূল্যে বই ছড়িয়ে দিতে তাদের এই মহৎ প্রয়াস। সৃজনশীল ধারার বইয়ের পাশাপাশি নৃবিজ্ঞান, ভাষা, ফোকলোর, বাংলা এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ক একাডেমিক বইগুলো রয়েছে এই সাইটে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়ামিন রহমান ইস্ক্রার চিন্তা থেকে পরবর্তীতে আইটি প্রতিষ্ঠান DevelopIT এবং ইয়ামিন রহমান ইস্ক্রার বেশকিছু বন্ধু-বান্ধবের প্রচেষ্টায় গ্রন্থ যাত্রার শুরু হয় ১ জানুয়ারি ২০১৪ সালে মাত্র ৫০টি বই দিয়ে। বর্তমানে অনলাইনে তাদের বইয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬শ।

কে না জানে বিজ্ঞাপনের দউরাত্মে বেশিরভাগ অনলাইন ওয়েবসাইটগুলোতে সেবা নিতে কতটুকু সমস্যা হয়, কয়েক মিনিট পরপর বিজ্ঞাপনে বিরক্ত হয়ে হয়ত সেই ওয়েবসাইটটিই ব্যবহার করা বন্ধ হয়ে যায়। এমন সমস্যায় পরতে হবে না আপনাকে গ্রন্থ ডট কমে । কেননা, অবাণিজ্যিক এই ডিজিটাল লাইব্রেরিটায় কোনো বিজ্ঞাপন নেই, যেমনটা বিভিন্ন অনলাইন সাইটগুলোতে আমরা অহঃরহ দেখে থাকি। বিজ্ঞাপন ছাড়া এ ধরণের ওয়েবসাইট কিভাবে সচল তা জানতে আসলেই মন চায়। প্রতিষ্টানটির বই কেনার বা ওয়েবসাইটের রক্ষণাবেক্ষণের অর্থসংকুলান হয় নিজস্ব তহবিল, DevelopIT -র তহবিল, বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া চাঁদা, রাবি শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন, বখতিয়ার আহমেদ, সুস্মিতা চক্রবর্তী সহ দেশের আরও বিভিন্ন মানুষের দেওয়া বই নিয়ে।

একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রন্থ ডট কম

গ্রন্থ ডট কমে বই ই স্ক্যান করে আপলোড করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ইবুক সাইট থেকেও বই সংগ্রহ করে আপলোড করা হয়। এখানে কপিরাইট আইনটিকেও মাথায়  রাখা হয় বই স্ক্যানের সময় এক্ষেত্রে তিনটি নীতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে। প্রথমত, বইটির লেখকের অনুমতি চাওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, দেশের ভিতরের লেখকের অনুমতি নেওয়া সম্ভব না হলে সে বইগুলো অনলাইন রিডিং এর ব্যবস্থা করা হয়। তৃতীয়ত, কপিরাইট উত্তীর্ণ বইগুলো  আপলোড করা হয়। গ্রন্থ ডট কম সাধারণত নতুন বই আনা হয় না,  তবে, যদি লেখক নিজে আগ্রহ দেখায় তাহলে তা করা হয়। ইতোমধ্যেই প্রফেসর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ফরহাদ মজহার, অদিতি ফাল্গুনী, অভিজিৎ রায়, গোলাম হোসেন হাবীব, প্রফেসর হেলাল মহিউদ্দীন এবং সেলিম রেজা নিউটনের মতো লেখকরা তাদের প্রকাশিত সমস্ত বই গ্রন্থ ডট কমে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। গ্রন্থে যে কেউ ইচ্ছা করলে তার লেখা বই উন্মুক্ত করে দিতে পারে। এজন্য ইমেইল করা যাবে grontho.com@gmail.com এই ঠিকানায়।

ডিজিটাল এনভারনমেন্টে লাইব্রেরী গড়ে তোলার আগে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। সেগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলোঃ

  • বইয়ের ধরণ অনুযায়ী যেমন ভালো-মন্দ দুটোই আছে, পাঠকভেদে পড়ার রুচি ভিন্ন। তাই বই নির্বাচনের সময় বইটির ভালোমন্দ দুটোই যাচাই করে নিতে হবে।
  • গণগ্রন্থাগারগুলোতে বইয়ের পাশাপাশি কম্পিউটার থাকা আবশ্যক। কেননা এখনো অনেকেরই ক্রয়সীমায় কম্পিউটার ডিভাইস নাও থাকতে পারে।।
  • কম্পিউটার ব্যবহারের সময় সেই সুপরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
  • গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব হবে একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করার যাতে পাঠক সহজেই ডিজিটাল লাইব্রেরীর সুবিধা ভোগ করতে পারে।

গন্থ ও গ্রন্থাগারের ইতিহাস অনেকদিনের। পর্যায়ক্রমিক ধাপে তা আবর্তিত হয়েছে। বই-ই হচ্ছে আমাদের ইতিহাস, সভ্যতা, জ্ঞান ও তথ্যের ভাণ্ডার আবার বিনোদন এবং বিনোদনের সূত্র। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ই-বই এসেছে যা আমরা ডিজিটালভাবে পেয়ে থাকি খুব সহজেই। এখনকার সময়ে একটি শক্তিশালী ল্যাপটপই হতে পারে অসংখ্য বইয়ে ঠাঁসা গ্রন্থাগারের সমান। ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে পারছি মুহূর্তেই। তবে আমাদেরকেই খেয়াল রাখতে হবে এই ডিজিটাল লাইব্রেরীগুলোর যাতে গ্রন্থাগারের মতে সঠিক সময়ে, সঠিক তথ্যটি, সঠিক পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়।


তথ্যসূত্রঃ 

১। Digital Library, Wikipedia

২। Digital Libraries, Dr Jagdish Arora (http://lisp8.epgpbooks.inflibnet.ac.in/)

৩। ডিজিটাল লাইব্রেরি গ্রন্থ.কম: জ্ঞানমুক্তির এক অবাণিজ্যিক প্রয়াস, priyo.com

৪। অনলাইন লাইব্রেরির জগতে বাংলাদেশ (আসিফুর রহমান সাগর্‌  দৈনিক ইত্তেফাক

৫। ডিজিটাল গ্রন্থাগার (ফজলে রাব্বি), নয়া দিগন্ত

One Response to “ডিজিটাল লাইব্রেরী, এর উপাদান ও বাংলাদেশে এর অবস্থান ধারণা”

  • TAMEEM SHAHRIAR / Reply

    বেশ ভালো, তথ্যবহুল লেখা, পরবর্তীতে মেটাডাটা নিয়ে বিস্তারিত লেখা পেতে চাই।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *