Blog Post

মেডিকেল কলেজ গ্রন্থাগারে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ: সমস্যা ও সম্ভাবনা

মোঃ মনিরুল ইসলাম

লাইব্রেরিয়ান, আর্মি মেডিকেল কলেজ চট্টগ্রাম


আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি গ্রন্থাগারের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। নতুন নতুন সেবা প্রদান, বিদ্যমান সেবার মান উন্নয়ন এবং গ্রন্থাগারের সেবাকে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা দূর করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কম্পিউটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আজ বিশ্বব্যাপী বিপুল সংখ্যক গ্রন্থাগার নানা কাজে কম্পিউটার ও আধুনিক প্রযু্ক্তি ব্যবহার করে চলছে। চিকিৎসাবিদ্যা ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে মেডিকেল কলেজ লাইব্রেরিগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পাঠ্যসামগ্রী কলেজ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত থাকে, যেখান থেকে ডাক্তারগণ জ্ঞানঅর্জন করেন, নতুন নতুন ধারণা পান এবং সাম্প্রতিক উদ্ভাবিত প্রযু্ক্তি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। আধুনিকতার ছোয়ায় সর্বত্রই দ্রুত ও নিখুঁত তথ্য সেবা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। গ্রন্থাগারে আধুনিক প্রযু্ক্তি তথা অটোমেশন সফটওয়্যারের ব্যবহার সে চাহিদা পূরণে অনন্য ভূমিকা পালন করছে।

মেডিকেল কলেজ গ্রন্থাগারে আধুনিক প্রযুক্তি তথা অটোমেশন সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহ:

ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির সুবাদে আধুনিক গ্রন্থাগারে কম্পিউটারের ব্যবহার ব্যাপকতর হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক গ্রন্থাগারগুলোর পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ গ্রন্থাগারে নেট সংযোগের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি তথা লাইব্রেরি অটোমেশন সফটওয়্যারের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কোহা, গ্রিনস্টোন, স্লিমস এর মতো ওপেন সোর্স লাইব্রেরি অটোমেশন সফটওয়্যার ব্যবহার করার মাধ্যমে মেডিকেল কলেজ গ্রন্থাগারগুলো চিকিৎসাশাস্ত্রীয় জ্ঞান প্রসারে ও ভালো মানের ডাক্তার তৈরিতে অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। মেডিকেল কলেজ গ্রন্থাগারগুলোতে যে ধরনের সেবা প্রদানের জন্য অটোমেশন সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারে তার মধ্যে আছেঃ

  • নতুন সেবার সূচনা করা
  • বিদ্যমান সেবার উন্নতি করা।
  • পাঠকের সন্তুষ্টি বৃদ্ধিতে সহায়তা করা।
  • কম সময়ে বেশি সংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা প্রদান করা।
  • ডিজিটাল সামগ্রির সুষ্ঠু ও টেকশই ব্যবস্থাপনা।
  • ব্যবহারকারীর বহুমুখী তথ্য চাহিদা মেটানো।
  • গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের সামর্থ্য বৃদ্ধি ও মানোন্নয়ন
  • আন্ত:গ্রন্থাগার লেন-দেন তরান্বিত করা
  • গ্রন্থাগার ও তথ্য পেশার মানোন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধি

আধুনিক গ্রন্থাগারের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। একটি গ্রন্থাগারের চারটি প্রধান কর্মক্ষেত্র তথা বিভাগ হচ্ছে:

  • অ্যাকুইজিশন
  • প্রসেসিং
  • সার্কুলেশন
  • রেফারেন্স।

এছাড়া আন্তগ্রন্থাগার লেনদেন, কর্মী ব্যবস্থাপনা,  নিরাপত্তা বিধান ইত্যাদি কাজে কম্পিউটার তথা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মেডিকেল কলেজ গ্রন্থাগারে প্রযুক্তি ব্যবহারে সমস্যা ও সম্ভাবনা:

মেডিকেল কলেজ গ্রন্থাগারে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে সকল সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা দেখা দেয় সেগুলো যদি সঠিকভাবে বের করে সমাধান করা যায় তাহলে মেডিকেল কলেজ লাইব্রেরিগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নতমানের চিকিৎসাবিদ্যা প্রদান করে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ডাক্তার তৈরিতে অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মেডিকেল কলেজ লাইব্রেরিগুলো নিন্মোক্ত সমস্যাগুলো কাটিয়ে অচিরেই ভালো মানের ডাক্তার তৈরি করে চিকিৎসা সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রকৃত গ্রন্থাগার পেশাজীবীর অভাবঃ মেডিকেল কলেজ গ্রন্থাগারগুলোতে যারা নিয়োজিত রয়েছেন দেখা যায় তাদের অধিকাংশেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। অপেশাদার ও সেমি-পেশাদার দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে অধিকাংশ কলেজ গ্রন্থাগার। যার ফলে গ্রন্থাগারে আধুনিক গ্রন্থাগার প্রযু্ক্তি ব্যবহারে তাদের উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না বা পারেন না। এ সমস্যা কাটাতে গ্রন্থাগারে তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের নিয়োগ প্রদান করা দরকার।

পেশাগত দক্ষতার অভাবঃ পেশাদারি মনোভাবের অভাব আর পেশাগত অদক্ষতা আধুনিক গ্রন্থাগার পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। আধুনিক প্রযু্ক্তি ও নিত্য নতুন উদ্ভাবনের সাথে পরিচয় না থাকলে সেকেলে সেবা থেকে আধুনিক সেবায় উত্তরণ ঘটানো সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ কলেজ গ্রন্থাগারগুলোতে পেশাজীবীদের পেশাগত দক্ষতা ও পেশাদারি মনোভাবে অতিমাত্রায় ঘাটতি গ্রন্থাগারের আধুনিকায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের নিয়োগ দিয়ে ও গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের পেশাগত অদক্ষতা দূর করে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।

প্রযু্ক্তি ব্যবহারে অনীহাঃ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রে পূর্বেকার গ্রন্থাগার কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অনীহা কাজ করে। প্রযু্ক্তির সহায়তায় সেবা দান তাদের কাছে জটিল ও কষ্টকর মনে হয় এবং এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের অনিচ্ছাভাব পরিলক্ষিত হয়। সঠিক ভাবে এ সমস্ত গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহারে তাদের মনোভাব পরিবর্তন করে তথ্যসেবা প্রদান করতে হবে।

কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতাঃ কতিপয় মেডিকেল কলেজের কর্তৃপক্ষ সঠিক ও মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবা প্রদানে যথেষ্ট সচেতন নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের উদাসীনতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে। গ্রন্থাগার ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জমাদির আধুনিকায়নে তাদের উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। চিকিৎসাবিদ্যা ও সেবা যথাযথভাবে প্রদান না করে সামাজিকভাবে তারা চিকিৎসা সেবায় এক ধরনের জটিল সমস্যার সৃষ্টি করে চলছে। এ সকল ব্যবসায়ী মনোভাব সম্পন্ন কর্তৃপক্ষকে যথাযথ আইনের আওতায় এনে সঠিকভাবে কলেজ পরিচালনায় বাধ্য করলে গ্রন্থাগারসহ সর্বত্র মানসম্মত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা সেবায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে সাহায্য করবে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান মানবজীবনের অতিব জরুরী ও প্রয়োজনীয় একটি বিদ্যা। এ বিদ্যা অর্জন অনেক সাধনার বিষয়। কর্মঠ ও অদম্য মনোভাবাপন্ন শিক্ষার্থীরাই পারে এ বিদ্যা অর্জনে সক্ষম হতে। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ চিকিৎসাবিদ্যা প্রদানে অগ্রণি ভূমিকা পালন করে চলছে। জ্ঞান প্রসার ও সমৃদ্ধিতে এ সকল প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারগুলো সহায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। কার্যকর জ্ঞান প্রসারে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রন্থাগারে আধুনিক প্রযুক্তি তথা অটোমেশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বাংলাদেশের কলেজ গ্রন্থাগার।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close