Blog Post

করোনা সংকটে গ্রন্থাগার ভাবনা

আসিফ মাহতাব পাভেল

আসফি মাহতাব পাভেলপৃথিবীর গতিপথ হঠাৎ করেই যেন থেমে গেছে । বদলে গেছে চিরচেনা পরিপার্শিকতা। করোনা ভাইরাসের যে সুনামি সৃষ্টি হয়েছে চীনে তার ধাক্কায় চূর্ণবিচূর্ণ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ। বর্তমান বিশ্বে এক নম্বর সমস্যা কী জানতে চাইলে মনে হয় এক জনও মিলিবে না, যে করোনা সংক্রমণ ছাড়া অন্য কোনো উত্তর দেবে। হাঁ, উত্তর একটাই। করোনা ভাইরাস ডিজিজ-২০১৯, যার আক্ক্রনিম হলো COVID-19 । CO হলো করোনা, VI ভাইরাস, এবং D হলো ডিজিজ। আর ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯-এ প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয় বিধায় ১৯ সংখ্যাটি জুড়ে বসেছে COVID-এর সঙ্গে। চীনের উহান প্রদেশ থেকে যাত্রা আরম্ভ করে এরই মধ্যে বিশ্বভ্রমণ শেষ করে ফেলেছে এই ভাইরাস। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রই যেন স্থবির হয়ে আছে করোনার প্রভাবে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই বিশ্বজুড়ে গ্রন্থাগার সেবাকেও গ্রাস করেছে একই রকমের স্থবিরতা। পাঠকের মুখরিত পাঠকক্ষগুলোতে এখন শুধুই মহাশুন্যের নিস্তব্দতা। আমরা কেউ জানিনা কবে সরব হয়ে উঠবে গ্রন্থাগার সহ অন্নান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বাস্তবতার নিরিখে ঠিক এই মুহূর্তে গ্রন্থাগারকে সচল সেবার আওতায় নিয়ে আসার সময় হয়নি। কারণ এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের একমাত্র প্রতিষেধক হয়ে আছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ যেটা গ্রন্থাগার কার্যক্রমের বিপ্রতীপসম। যেখানে গ্রন্থাগার সর্বস্থরের জনসাধারণের একটা মলিনক্ষেত্র, সেখানে করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গ্রন্থাগারগুলোতে পাঠকসেবা স্থগিতকরণের কোনো বিকল্প ছিল না। ডিজিটাল সেবার বাইরে মুখোমুখি সেবা প্রদান থেকে বিরত রয়েছে সারা বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রন্থাগার। কী হবে করোনা পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতি তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে না। তবে বিশ্বব্যাপী গ্রন্থাগারসমূহকে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে এই বিষয়টি সহজেই অনুমেয়। কী কী বিষয়ে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করা যাক:

পাঠক সংখ্যা :

দীর্ঘসময় লকডাউন শেষে মানুষ তার নিত্য প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদার অভাবগুলো পূরণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অধিক সময় ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা গ্রন্থাগার ব্যবহারের সময়ের অভাবকে আরো বেশি প্রকট করে তুলবে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আরো বেশি প্রভাব বিস্তার করবে। গ্রন্থাগার ব্যাবহারকারীদের বড় অংশ ছাত্র-ছাত্রী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে, লকডাউন শেষে স্বাভাবিকভাবেই সিলেবাসের ঘাটতি পূরণের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে, এ ক্ষেত্রেও গ্রন্থাগারসমূহে ছাত্রদের উপস্থিতি কম হতে পারে।

বাজেট ঘাটতি:

দীর্ঘ সময়ের লকডাউন ইতোমধ্যেই অর্থনীতির গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার মন্দার আশঙ্কায় রয়েছে উন্নত দেশসহ বিশ্বের অদিখান গ্য দেশ। আর্থিক মন্দার প্রভাব গ্রন্থাগারগুলোকে স্পর্শ করবে না, এ কথা জোর দিয়ে বলা যাই না। ফলে ব্যহত হতে পারে গ্রন্থাগারের স্বাভাবিক উন্নয়ন কর্মকান্ড। অনুদান-নির্ভর বেসরকারি গ্রন্থাগারে এই সঙ্কট প্রকটতর হতে পারে।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি:

করোনা (Covid 19) ভাইরাসের প্রকোপ একেবারে নির্মূল কবে হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। সুতরাং লকডাউন শেষেও একে অন্যের সংস্পর্শে তা পুনরায় ছড়িয়ে পড়ার আশাঙ্কা থাকতে পারে। গ্রন্থাগারে পাঠকদের উপস্থিতিতেও থাকবে একই ধরণের স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশাঙ্কা। একই বই বা পাঠসামগ্রীর একাধিক ব্যবহার এই ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে।

প্রকাশনা সামগ্রীর অপ্রতুলতা:

সম্ভাব্য আর্থিক মন্দা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে প্রকাশনা শিল্পকেও। প্রকাশনা সামগ্রীর প্রয়োজনীয় উৎপাদন ব্যহত হতে পারে। এর ফলে গ্রন্থাগার সংগ্রহের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পরতে পারে। পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী প্রকাশনার অভাব উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠককে গ্রন্থাগারবিমুখ করে তুলবে।

কাজের ধীরগতি:

দীর্ঘ সময়ের লকডাউনের কারণে গ্রন্থাগারকর্মীদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ছন্দপতন ঘটেছে। এর প্রভাব লকডাউন পরবর্তী সময়ে দৃশ্যমান হতে পারে, যার ফলে গ্রন্থাগার সেবায় স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।

গ্রন্থাগারের নিরাপত্তা:

চলমান বিশ্ব বিপর্যয় শেষে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। আর্থিক মন্দার প্রভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধি, আয়ের অনিশ্চয়তা প্রভৃতি কারণে চুরি বা ছিনতাইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি আইন-শৃঙ্খলার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রেও বই ও লাইব্রেরি সম্পদ চুরির বিষয়ে আশাঙ্কা থেকে যাবে।

করোনা সংকটে গ্রন্থাগার ভাবনা

গ্রন্থাগার সম্পদের ক্ষতি:

দীর্ঘকাল অব্যবহৃত থাকায় বইসহ গ্রন্থাগারের বিভিন্ন সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। আবদ্ধ গ্রন্থাগারে উইপোকা, ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধির আশাঙ্কা রয়েছে, যা গ্রন্থাগারগুলোর জন্য যথেষ্ট চিন্তার কারণ হতে পারে।

তথ্যের ধারাবাহিকতা:

গ্রন্থাগার মানেই ধারাবাহিক ও সাম্প্রতিক তথ্যের সহাবস্থান। একটি মানসম্পন্ন গ্রন্থাগারে সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, জার্নাল, সাময়িকী প্রভৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়। করোনার প্রভাবে গ্রন্থাগারগুলো যেমন বন্ধ রয়েছে তেমনি অনেক সাময়িকীর প্রকাশনাও বন্ধ রয়েছে, যে কারণে তথ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।

উল্লিখিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের এখন থেকেই ভাবতে হবে। করতে হবে বহুমুখী পরিকল্পনা। গ্রন্থাগার সেবাকে জনমুখী করে তুলতে হবে। গ্রন্থাগারের কার্যক্রমের মধ্যে নিম্নবর্ণিত কাজগুলোর দিকে অধিক মনোনিবেশ করা প্রয়োজন:

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা:

গ্রন্থাগারের পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নেই। বুকসেল্ফ, বই, কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, রিডিং ফার্নিচারসহ যাবতীয় স্পেস জীবাণুমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার সামগ্রী এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য বাজেট বন্টনের ক্ষেত্র পূর্বের তুলনায় অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।

চাহিদা নিরূপণ:

গ্রন্থাগার সেবাগুলোকে আপ-টু-ডেট করতে হবে। বই বা পাঠ সামগ্রীকে পাঠক চাহিদার ভিত্তিতে সংগ্রহ করতে হবে এক্ষেত্রে Need assessment এর বিকল্প নেই। নতুন সেবা সংযোজনের ক্ষেত্রেও গ্রন্থাগার সেবাগ্রহীতাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং তাদের চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন:

গ্রন্থাগারকে জনগণের দারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়ার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। একটা লম্বা সময় গ্রন্থাগার বন্ধ রয়েছে সেকারণে পাঠকদের সাথে গ্রন্থাগারের যোগাযোগের ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নের বিকল্প নেই।

ডিজিটাল কনটেন্ট উন্নতকরণ:

ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের সঙ্কটকালে গ্রন্থাগার সেবা যেন ব্যহত না হয় সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল কনটেন্ট বৃদ্ধি ও ডাটাবেজ উন্নয়ন করে পাঠকদের ঘরে বসে সেবা দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কাজে লাগিয়ে গ্রন্থাগারের সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বইয়ের বিশেষ ব্যবস্থাপনা:

Covid 19 ভাইরাস পুরোপুরি নির্মূল কবে হবে তা এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে গ্রন্থাগারগুলো চালু হলে নিতে হবে বিশেষ ব্যবস্থা। কোন বই ব্যবহৃত হলে তা জীবাণুমুক্তকরণের ব্যবস্থা রাখতে হবে গ্রন্থাগারে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বইটি পৃথক বা আইসোলেটেড রাখার বিষয়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। এছাড়াও পাঠকক্ষের বাইরে বিশেষ সার্কুলেশন বুথ স্থাপন করা যেতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন:

দীর্ঘ লকডাউনে গ্রন্থাগার কর্মী ও পাঠকসহ সকলের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে পারে। বিষন্নতা ও অবসাদগ্রস্থতা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে। অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য (Motivational Speech) এর আয়োজন হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে উপকৃত হবে গ্রন্থাগার সংশ্লিষ্ট সকল মানুষ।

স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য:

করোনা ভাইরাসসহ বিভিন্ন ধরণের ভাইরাসজনিত রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সারের মতো রোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ গ্রন্থাগারে এ রোগসমূহের প্রতিষেধক, প্রতিকার, চিকিৎসা, সচেতনতা প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের গ্রন্থাগারসমূহে স্থানীয় চিকিৎসা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে মেডিকেল ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা সম্পর্কিত তথ্য উন্নয়ন:

অর্থনৈতিক মন্দায় হ্রাস পেতে পারে বিনিয়োগ এবং বৃদ্ধি পেতে পারে বেকারত্বের সংখ্যা। এ দিকটি বিবেচনা করে গ্রন্থাগারে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা সম্পর্কিত তথ্য উন্নয়ন করতে হবে। বহির্বিশ্বের উন্নত গ্রন্থাগারগুলোর আদলে বিজনেস কর্নার স্থাপনের বিষয়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে যেখানে থাকবে বিজনেস পোর্টফলিও, আইডিয়া ব্যাংক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন।

আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ উন্নয়ন:

গ্রন্থাগারের একার পক্ষে সেবাসমূহের সম্প্রসারণ করা কষ্টসাধ্য। পাঠকবৃদ্ধিসহ নতুন নতুন সেবা সংযোজনের জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানাধরণের সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। সেমিনার-কর্মশালা, আলোচনা সভা প্রভৃতি আয়োজনের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের সহেযোগিতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রেও যোগাযোগের বিকল্প নেই। এছাড়াও আন্তঃগ্রন্থাগার যোগাযোগের মাধ্যমে ধারণা বিনিময়, প্রশিক্ষণ বৃদ্ধিসহ গ্রন্থাগার সামগ্রী বিনিময়ের বিষয়টিও নিশ্চিত করা যেতে পারে।

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে বর্তমান পর্যায়ে আসার জন্য মানবজাতিকে প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে আসতে হয়েছে। মহামারী ছাড়াও ঝড়, জলোচ্ছাস, ভূমিকম্পসহ নানা রকমের বিধ্বংসীকর প্রাকৃতিক ঘটনা মোকাবেলা করে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে মানুষ। সঙ্কট যেমন থাকবে তা থেকে উদ্ধারের মানসিকতাও মানুষের রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সাহসী যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বর্তমান বিশ্ব সংকট থেকেও আমাদের মুক্তি হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

ঘরে থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।


লেখক,

সহকারী পরিচালক (উন্নয়ন ও আইসিটি),

গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, ঢাকা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close