Blog Post

সহজ পাঠ: পান্ডুলিপি, গ্রন্থস্বত্ব অতিক্রমের পূর্ব ও উত্তর কালের প্রকাশনা

ড. পার্থপ্রতিম রায়, উপ-গ্রন্থাগারিক, বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন-৭৩১২০৪, ভারতবর্ষ

ভূমিকা:

পার্থ প্রীতিমরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) প্রথম কবিতা ‘হিন্দুমেলার উপহার’ রচনা করেন ১৮৭৫ সালে আর জীবনের শেষ প্রান্তে ১৯৪১ সালে প্রকাশিত হয় তিনটি গ্রন্থ যথা- জন্মদিনে, গল্পসল্প এবং কবির আত্মজীবনী ছেলেবেলার ইংরাজি অনুবাদ ‘Boyhood Days’ । রবীন্দ্রনাথ তাঁর দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে সাহিত্যের সমস্ত শাখা যথা উপন্যাস, নাটক, নৃত্যনাট্য, কবিতা, প্রবন্ধ,ছোটোগল্প, গান রচনা করেছেন, চিঠিপত্র লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ সমাজের সকল স্তরের সব বয়সের মানুষের জন্য রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি প্রকৃতি, ধর্ম,শিক্ষা,গ্রামোন্নয়ন, জাতিয়তাবাদ, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ইত্যাদি সমাজ জীবনের সমস্ত দিককে সমৃদ্ধ করেছে। সুতরাং রবীন্দ্র লেখনী যে শিশু সাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করবে এটাই স্বাভাবিক।১৯৩০ সালে সহজ   পাঠ প্রকাশের আগে রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকটি শিশু সাহিত্য, যথা শিশু(১৯০৩), শিশু ভোলানাথ (১৯২২),এবং শিশু পাঠ্যগ্রন্থ যেমন সংস্কৃত শিক্ষা (১৮৯৬),ইংরাজি সোপান (১৯০৪), ইংরাজি শ্রুতিশিক্ষা (১৯০৯),ইংরাজি পাঠ (১৯০৯), ছুটির পড়া (১৯০৯),পাঠ সঞ্চয় (১৯১২), বিচিত্র পাঠ (১৯১৫), অনুবাদ চর্চা (১৯১৭), ইংরাজি সহজ শিক্ষা (১৯২৯) রচনা করেন ।

‘সহজ পাঠ’ প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালের মে মাসে। মনে করা হয় কবি শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে পাঠরত শিশুদের বর্ণশিক্ষা , বাক্য ও প্রথম পাঠের শিক্ষার জন্য সহজ পাঠ রচনা করেন। সহজ পাঠ পশ্চিমবঙ্গে মাতৃভাষায় শিশুশিক্ষার সমার্থক হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে ভাষা শিক্ষার আবশ্যিক গ্রন্থ সহজ পাঠ। দুই খন্ডের সহজ পাঠ শিশুদের বাংলা ভাষা শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রবেশদ্বার হিসাবে বিবেচিত হয়। প্রথম ভাগে বাংলা বর্ণের পরিচয়, গঠন ও উচ্চারণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগ বাক্যের মধ্যে শব্দের প্রয়োগ , স্তবক গঠন এবং ছড়া ও গদ্য রচনা শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত সৃজনমূলক কাজের গ্রন্থস্বত্বের অধিকার বিশ্বভারতীকে দান করেন।  ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ গ্রন্থে এই বিষয়টি প্রথম উল্লেখিত হয়েছে। ফলে বিশ্বভারতী রবীন্দ্রগ্রন্থের গ্রন্থস্বত্ব পায়। রবীন্দ্রনাথের তিরোধানের (১৯৪১)পর থেকে বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ ২০০১ সাল অবধি রবীন্দ্রগ্রন্থের একক প্রকাশক হিসাবে গ্রন্থস্বত্ব ভোগ করে। আইন অনুসারে ২০০১ সালে গ্রন্থস্বত্ব অতিবাহিত হবার পর বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগের হাত থেকে রবীন্দ্রগ্রন্থ প্রকাশের একচেটিয়া অধিকার চলে যায়। বেসরকারি প্রকাশন সংস্থাগুলি এরপর থেকে রবীন্দ্র রচনা প্রকাশ করতে শুরু করে।

অধ্যয়নের উদ্দেশ্য

    • সহজ পাঠের পান্ডুলিপি প্রস্তুতকাল ও পাঠভেদ বিষয়ে আলোকপাত।
    • পাঠের আবশ্যিক উপাদান চিত্র বিষয়ে আলোচনা।
    • গ্রন্থস্বত্ব উত্তরকালে বেসরকারি প্রকাশন সংস্থাগুলির দ্বারা প্রকাশিত সহজ পাঠের মূল্য,চিত্র ও পাঠের মান নির্ধারণ।

গবেষণা : উৎস ও পদ্ধতি                                                     

রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘদিন ধরে সহজ পাঠের পান্ডুলিপির নানা পরিবর্তন করেছেন। পান্ডুলিপির পরিবর্তনের এই ধারা বুঝবার জন্য বিশ্বভারতী রবীন্দ্র গবেষণাগার রবীন্দ্রভবনে সহজ পাঠের মূল পান্ডুলিপি অনুধাবন করা হয়েছে। সহজ পাঠের প্রথম সংস্করণও উৎসগ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।

গ্রন্থস্বত্ব উত্তরকালে বেসরকারি প্রকাশকদের প্রকাশিত গন্থের সঙ্গে বিশ্বভারতী প্রকাশনার তুলনা করার জন্য ১৩৬২ সালে বিশ্বভারতী প্রকাশিত সহজ পাঠ প্রমান্য গ্রন্থ হিসাবে অধ্যয়ন করা হয়েছে। এই প্রকাশনকে সঠিক হিসাবে বিবেচনা করার কারণ এই গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে  “… সহজ পাঠের বর্তমান পুনর্মুদ্রণে রবীন্দ্র-পান্ডুলিপির সঙ্গে মিলিয়ে কয়েক ক্ষেত্রে পূর্বপাঠ সংশোধন করা হয়েছে। ”

বেসরকারি প্রকাশকদের প্রকাশিত গ্রন্থের সঙ্গে বিশ্বভারতী প্রকাশনার তুলনা করার জন্য তেরোটি বেসরকারি প্রকাশনার প্রতিটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যার ২৫ শতাংশ যদৃচ্ছভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। বেসরকারি প্রকাশনার মান নির্ণয়ের জন্য গ্রন্থপজ্ঞিগত তুলনা যথা- মূল্য, পৃষ্ঠাসংখ্যা, গ্রন্থের আকার, আন্তর্জাতিক গ্রন্থ ক্রমাঙ্ক সংখ্যা, গ্রন্থস্বত্ব ছাড়াও বিরাম চিহ্ন, বানানের ভ্রান্তি,শব্দ বা পংক্তি বাদ দেওয়া ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়েছে।  সহজ পাঠ চার ভাগে প্রকাশিত। এই অধ্যয়নের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ বিবেচনা করা হয়েছে কারণ এই দুটি গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথের লেখা ।  অপর দুই খন্ডে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অন্যান্য লেখকদের রচনা আছে।

সহজ পাঠ : পান্ডুলিপি

সহজ পাঠের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ  প্রকাশিত হয় ৫৩ ও ৫১ পৃষ্ঠার গ্রন্থ হিসাবে ।  সহজ পাঠের প্রাথমিক খসড়ার সন্ধান পাওয়া যায় ১৮৮৯ সালের “ Pocket Book of Rabindranath Tagore” থেকে।  খাতাটি আসলে পান্ডুলিপি। শ্রীশচন্দ্র মজুমদার বংশের সমীরচন্দ্র মজুমদারের সংগ্রহ । তিনি পান্ডুলিপিটি বিশ্বভারতীকে দান করেন। রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত ৪২৬ সংখ্যক এই পান্ডুলিপি ‘মজুমদার পান্ডুলিপি’ নামে পরিচিত। সহজ পাঠের  দ্বিতীয় খসড়া পাওয়া যায় ১৯২৭-২৮ সালে , পান্ডুলিপি সংখ্যা ১৯।  এই দুই পান্ডুলিপি থেকেই সহজ পাঠ রচনার দীর্ঘ সময় সহজেই বোঝা যায়। সহজ পাঠের প্রথম ও দ্বিতীয় খসড়া ও ১৯৩০ সালে প্রকাশিত সহজ পাঠের তুলনা করলে শব্দ, বাক্য ও প্রবন্ধের বহুল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ১০টি শিশুপাঠ্য পুস্তক রচনা করেন। সহজ পাঠের অনেক কবিতা শিশু কাব্যগ্রন্থ ‘শিশু ভোলানাথ’ থেকে নেওয়া । আবার অন্যদিকে সহজ পাঠের জন্য লেখা কবিতা ‘চিত্র-বিচিত্র’ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

সহজ পাঠ পান্ডুলিপি কবি একসঙ্গে রচনা করেছেন। প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগের খসড়া আলাদা নয়। পরে প্রকাশনার সময় দুটি ভাগে প্রকাশিত হয়।  সহজ পাঠের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থে প্রকাশন বর্ষের উল্লেখ নেই। পরবর্তী ১৩৩৭ সালের প্রকাশনায় প্রকাশন বর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়। দীর্ঘ চার দশকের অধিক কাল ধরে সহজ পাঠ পান্ডুলিপি রচনার পর কবি এটি প্রকাশনার বিষয়ে খুব উৎসুক ছিলেন। বিশ্বভারতীর প্রকাশন সংস্থা গ্রন্থনবিভাগের প্রথম নির্দেশক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে রবীন্দ্রনাথ ১৪ ভাদ্র ১৩৩৫ চিঠিতে লিখেছেন, “ সহজ পাঠ ছাপা হতে আর কত দিন দেরি ?”

রবীন্দ্রনাথ সহজ পাঠকে প্রকৃত অর্থে ‘সহজ’ রাখার জন্য বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন।  গদ্য বা পদ্যের বিষয় নির্বাচন, বাক্য গঠন, বনান সব বিষয়েই কবি যত্নবান ছিলেন। পান্ডুলিপির নানা অংশে পাঠ প্রণালী, উচ্চারণ রীতি, শব্দ বা পাঠ ভিত্তিক ছবি আঁকার নির্দেশ, পাঠ-পরিকল্পনার বিবরণ পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯ সংখ্যক পান্ডুলিপির ৪৬ পৃষ্ঠার অলংকরণ প্রসঙ্গে কবির নির্দেশ “ ছবি ও তার সংলগ্ন শব্দ।  যথা- বন, হরিণ, বন্দুক হাতে শিকারী।”

সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হয় ১৩৩৭ সালে। ১৮X১২ সেমি আকারের এই গ্রন্থে ১৩টি পাঠ ও ২৭টি চিত্রালংকার ছিল। ১৩৪৭ সাল অবধি দ্বিতীয় ভাগ চার বার পুনর্মুদ্রণ হয়, শুধুমাত্র মুদ্রক ও প্রকাশকের নাম পরিবর্তন এবং রবীন্দ্রনাথের নামের আগে শ্রী অবলুপ্ত হয়।দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৪৮ সনে কবির তিরোধানের পর। এই সংস্করণে নতুন চিত্রালংকার যুক্ত হয়।  মলাট, প্রকাশকের নাম ও ঠিকানার পরিবর্তন এবং প্রথম বিশ্বভারতী প্রতীকের সংযোজন লক্ষ্য করা যায়।দাম সাড়ে তিন আনা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ছয় আনা হয়। গ্রন্থের আকার ২১X১৬.৫ সেমি এবং চিত্রালংকরণ বেড়ে হয় ৩৪টি। এই গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে “…সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগের বর্তমান সংস্করণে বই এর আকার ও অক্ষর (সহজ পাঠের প্রথম ভাগের সমান) বড়ো করা হল। দু-তিন খানি ছবি বাদে এর সমস্তই নতুন, এগুলির প্রায় সবই শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু মহাশয়ের আঁকা। ”

সহজ পাঠের চিত্রালংকার করেছেন নন্দলাল বসু। চিত্রালংকার সাদা কালো চিত্র এবং চিত্রায়নের কৌশলটি লিনোকাট হিসাবে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে চিত্র সমালোচক শোভন সোম লিখেছেন “ আমরা পরম্পরাগতভাবে ইলাসট্রেশান বলতে বুঝি এই যে- যা লেখা হচ্ছে সেটাই আঁকা হচ্ছে।… নন্দলাল সেটা অনুসরণ করেননি। নন্দলালের এই ছবিগুলিকে যদি ‘সহজ পাঠ’ থেকে আলাদা করেও দেওয়া যায়, তবু তার চরিত্রগুণ হারায় না।…রবীন্দ্রনাথ যেমন একটি মৌলিক লেখা লিখেছেন, নন্দলালও সেইমত রবীন্দ্রনাথের রচনায় অনুপ্রানিত হয়ে মৌলিক ছবি এঁকেছেন।”প্রথম সংস্করণে গ্রন্থমধ্যে চিত্র সম্পর্কে কোনো তথ্য পওয়া যায় না ।কিন্তু দ্বিতীয় সংস্করণে উল্লেখিত হয়েছে “ সমস্ত ছবিই শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু মহাশয়ের আঁকা। শিশুরা নিজে ছবিগুলি রঙ করে নিতে পারবে বলে সেগুলি রেখায় আঁকা হয়েছে। এতে বই পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা ছবি আঁকার আনন্দও পাবে।” এইভাবে আনন্দের সঙ্গে শেখার সুযোগ পাওয়া যায় । এ প্রসঙ্গে রানী চন্দ স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন “ সহজ পাঠের ছবিগুলি এক একখানি ছবি, ইলাসট্রেশন বলতে যা’ এগুলো তা’ নয়। কলাভবনে তখন আমরা উডকাট করি, লিনোকাট করি।  নন্দদা সে টেকনিকেই আঁকলেন সহজ পাঠের ছবিগুলি। এক একখানা আঁকেন আর আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি। ”

গ্রন্থস্বত্ব-উত্তর কালের প্রকাশনা

রবীন্দ্র সৃষ্টির গ্রন্থস্বত্ব ডিসেম্বর ২০০১ সালে অতিক্রান্ত হয়। ফলে রবীন্দ্র রচনা প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশ্বভারতীর একাধিপত্যের অবসান হয়।তারপর থেকে বেসরকারি প্রকাশকরা রবীন্দ্র রচনা প্রকাশ করে চলেছেন। কিন্তু বেসরকারি প্রকাশকদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক প্রকাশক রবীন্দ্র রচনা প্রকাশ করেছে। ১০ পুস্তক বিপণনের জন্য বিক্রয় মাধ্যম ছাড়াও, কমিশনের হার, বিজ্ঞাপন, গ্রন্থের দাম ইত্যাদির বিশেষ ভূমিকা আছে।  এগুলি রবীন্দ্র গ্রন্থের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য, বিশেষ করে গ্রন্থস্বত্ব-উত্তর কালে যখন বিশ্বভারতীর হাতে রবীন্দ্র গ্রন্থ প্রকাশের একচেটিয়া অধিকার নেই। গ্রন্থের দাম নির্ভর করে পৃষ্ঠা সংখ্যা, গ্রন্থের আকার, ছাপাই ও কাগজের মান ইত্যাদি বিষয়ের উপর। সেই কারণে বিশ্বভারতী ও বেসরকারি  প্রকাশন সংস্থাগুলির দ্বারা প্রকাশিত সহজ পাঠের মূল্য, পৃষ্ঠা ও আকারের তুলনামূলক আলোচনা তালিকা-১ করা হয়েছে ।

তালিকা-১: মূল্য, পৃষ্ঠা সংখ্যা ও আকার : বিশ্বভারতী ও বেসরকারি প্রকাশনার তুলনা

সহজ পাঠ প্রথম ভাগ

Table 1

বিশ্বভারতী প্রকাশিত সহজ পাঠে গ্রন্থস্বত্ব ও আন্তর্জাতিক গ্রন্থ ক্রমাঙ্ক সংখ্যা উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু এগারোটি বেসরকারি সংস্থার মধ্যে কেবলমাত্র নির্মল বুক এজেন্সী ও বি.এম.পাবলিকেশন গ্রন্থস্বত্ব বিবৃতি এবং সাহিত্য ভারতী আন্তর্জাতিক গ্রন্থ ক্রমাঙ্ক সংখ্যা উল্লেখ করেছে। সুতরাং শতকরা ৯১ শতাংশ বেসরকারি প্রকাশক গ্রন্থপঞ্জীগত তথ্য আন্তর্জাতিক গ্রন্থ ক্রমাঙ্ক সংখ্যা ব্যবহার করেনি ।

তালিকা-২: মূল্য, পৃষ্ঠা সংখ্যা ও আকার : বিশ্বভারতী ও বেসরকারি প্রকাশনার তুলনা

সহজ পাঠ  দ্বিতীয়  ভাগ

Table 2

বিশ্বভারতী প্রকাশিত সহজ পাঠ প্রথম ভাগের মূল্য অন্যান্য বেসরকারি প্রকাশন সংস্থা থেকে বেশি এবং দ্বিতীয় ভাগের মূল্য প্রায় সমান। একমাত্র ব্যতিক্রম ছায়া প্রকাশনী। বিশ্বভারতী প্রকাশিত গ্রন্থের চিত্রালংকার সাদা কালো কিন্তু বেসরকারি প্রকাশকরা রঙিন চিত্রালংকার করেছেন। অন্য একটি গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যায় বিশ্বভারতী প্রকাশিত অধিকাংশ বই কাগজের মলাট এবং বেসরকারি প্রকাশকদের প্রকাশিত শক্ত মলাটের গ্রন্থের থেকে দাম বেশি। কিন্তু বিশ্বভারতী প্রকাশিত গ্রন্থের কাগজের মান , দুই পংক্তির মধ্যের ব্যবধান, অক্ষরের আকার ও ছাপার মান উন্নত।বেসরকারি প্রকাশকরদের প্রকাশিত রবীন্দ্র গ্রন্থে নানা ভ্রান্তি আছে । ১১

বিশ্বভারতী ও বেসরকারি প্রকাশনার পাঠভেদের তুলনা

২০০১ সালে ভারতীয় সংসদ রবীন্দ্রনাথের রচনার গ্রন্থস্বত্ব ও বিশ্বভারতীর কথা বিবেচনা করে গ্রন্থস্বত্বের সময়কাল ৫০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬০ বছর করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনা সহজলভ্য, সুলভমূল্য এবং বিশুদ্ধভাবে প্রকাশ করা। সুতরাং সহজ পাঠ প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিশ্বভারতী ও বেসরকারি প্রকাশকদের প্রকাশিত গ্রন্থের বিরাম চিহ্ন, বানানের ভ্রান্তি, শব্দ বা বাক্যের সংযুক্তকরণ ইত্যাদির তুলনা করলে বিশুদ্ধ রবীন্দ্ররচনা প্রকাশিত হচ্ছে কিনা জানা যাবে।

বিশ্বভারতী ও বেসরকারি প্রকাশকদের প্রকাশিত গ্রন্থে সহজ পাঠ প্রথম ভাগের মধ্যে ব্যবহৃত বিরাম চিহ্ন ও অন্যান্য নানা ধরনের ভ্রান্তির তুলনা করা হয়েছে তালিকা-৩ এবং তালিকা-৩ক এবং ৩খ মাধ্যমে। অনুরূপভাবে সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগের বিচ্যুতি গুলি জানা যায় তালিকা-৪ এবং তালিকা-৪ক , ৪খ থেকে ।

তালিকা-৩: বিরাম চিহ্ন: অন্য বিরাম চিহ্নের ব্যবহার বা বাদ দেওয়া

সহজ পাঠ প্রথম ভাগ

প্রকাশক তুলনা করা পৃষ্ঠা সংখ্যা . , : ; ? ! “  ”

‘   ’

, __ মোট
সাহিত্য কুঠি পাবলিকেশন 16 2 3 1
শিশুবিকাশ 17 1
ছায়া প্রকাশনী 20
নির্মল বুক এজেন্সী 12 1
এডুকেশন্যাল পাবলিসার্স 8 3 6 1 1
অ্যালফাবেট 16 1 2 3
সাহিত্য ভারতী 16 1 1 1
স্নেহা প্রকাশনী 15 2 1
শিশু সাহিত্য ভারতী 16 2
বি.এম.পাবলিকেশন 20 2
জয়দুর্গা লাইব্রেরি 14 1 1

তালিকা-৩ক

অতিরিক্ত বিরাম- চিহ্নের ব্যবহার

প্রকাশক তুলনা করা পৃষ্ঠা সংখ্যা . , : ; ? ! “  ”

‘   ’

, __ মোট
সাহিত্য কুঠি পাবলিকেশন 16 13 1
শিশুবিকাশ 17
ছায়া প্রকাশনী 20 1
নির্মল বুক এজেন্সী 12 2
এডুকেশন্যাল পাবলিসার্স 8 15 2
অ্যালফাবেট 16 1
সাহিত্য ভারতী 16
স্নেহা প্রকাশনী 15 1 1
শিশু সাহিত্য ভারতী 16 1 1 4
বি.এম.পাবলিকেশন 20 3
জয়দুর্গা লাইব্রেরি 14 1 1

তালিকা-৩খ: অন্যান্য ভুল

প্রকাশক তুলনা করা পৃষ্ঠা সংখ্যা বানান ভুল বাদ দেওয়া বাক্য   বাদ দেওয়া শব্দ বাক্য সংযোজন শব্দ সংযোজন শব্দ/ছত্র সংযোজন শব্দ/ছত্র পৃথকীকরণ
সাহিত্য কুঠি পাবলিকেশন 16 3 1 1
শিশুবিকাশ 17 1 1 1
ছায়া প্রকাশনী 20 20 2 1
নির্মল বুক এজেন্সী 12
এডুকেশন্যাল পাবলিসার্স 8 11 4
অ্যালফাবেট 16 13
সাহিত্য ভারতী 16 2
স্নেহা প্রকাশনী 15 3
শিশু সাহিত্য ভারতী 16 2 1 3
বি.এম.পাবলিকেশন 20 16 6 3
জয়দুর্গা লাইব্রেরি 14 2

এই অধ্যয়নের জন্য তুলনা করা এগারোটি গ্রন্থের মধ্যে পাঁচটি প্রকাশন সংস্থা (নির্মল বুক এজেন্সী,স্নেহা প্রকাশনী,শিশু সাহিত্য ভারতী,বি.এম.পাবলিকেশন ও জয়দুর্গা লাইব্রেরি) তাদের প্রকাশিত গ্রন্থে ভূমিকা দেয়নি। চারটি প্রকাশন সংস্থা যথা শিশুবিকাশ,অ্যালফাবেট,সাহিত্য ভারতী ও জয়দুর্গা লাইব্রেরির গ্রন্থে প্রকাশন বর্ষের উল্লেখ নেই। এমনকি ছায়া প্রকাশনী,সাহিত্য ভারতী,শিশু সাহিত্য ভারতী ও বি.এম.পাবলিকেশন দ্বারা প্রকাশিত গ্রন্থে মুদ্রকের নামের উল্লেখ নেই।

তালিকা-৪: বিরাম- চিহ্ন: অন্য বিরাম- চিহ্নের ব্যবহার বা বাদ দেওয়া

সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগ

প্রকাশক তুলনা করা পৃষ্ঠা সংখ্যা

 

. , : ; ? ! “  ”

‘   ’

, __ মোট
সাহিত্য কুঠি পাবলিকেশন 16 2 2 1
শিশুবিকাশ 16
ছায়া প্রকাশনী 22 1 1
নির্মল বুক এজেন্সী 10 0
এডুকেশন্যাল পাবলিসার্স 22 2 13
অ্যালফাবেট 18 1
সাহিত্য ভারতী 18 1
স্নেহা প্রকাশনী 15
শিশু সাহিত্য ভারতী 16 3 24 4
বি.এম.পাবলিকেশন 16 1 2
জয়দুর্গা লাইব্রেরি 14 2

তালিকা-৪ক

অতিরিক্ত বিরাম- চিহ্নের ব্যবহার

প্রকাশক তুলনা করা পৃষ্ঠাসংখ্যা   . , : ; ? ! “  ”

‘   ’

,  __   – মোট
সাহিত্য কুঠি পাবলিকেশন 16 1 3
শিশুবিকাশ 16
ছায়া প্রকাশনী 35 2 2 1
নির্মল বুক এজেন্সী 10 0
এডুকেশন্যাল পাবলিসার্স 22 1 3
অ্যালফাবেট 18 1 1 1
সাহিত্য ভারতী 18 1
স্নেহা প্রকাশনী 15
শিশু সাহিত্য ভারতী 16 2 2 2 1 1
বি.এম.পাবলিকেশন 16 1 1
জয়দুর্গা লাইব্রেরি 14 1 2 1

তালিকা-৪খ

অন্যান্য ভুল

প্রকাশক তুলনা করা পৃষ্ঠা সংখ্যা বানান ভুল বাদ দেওয়া বাক্য বাদ দেওয়া শব্দ বাক্য সংযোজন শব্দ সংযোজন শব্দ/ছত্র সংযোজন শব্দ/ছত্র পৃথকীকরণ
সাহিত্য কুঠি পাবলিকেশন 16 4
শিশুবিকাশ 16 2
ছায়া প্রকাশনী 22 19 4 2
নির্মল বুক এজেন্সী 10 0
এডুকেশন্যাল পাবলিসার্স 22 19 3
অ্যালফাবেট 18 24 1
সাহিত্য ভারতী 18 2
স্নেহা প্রকাশনী 15
শিশু সাহিত্য ভারতী 16 11 1 2
বি.এম.পাবলিকেশন 16 1
জয়দুর্গা লাইব্রেরি 14

বিশ্বভারতী প্রকাশিত সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগে অক্ষর ও শব্দগুলি স্পষ্ট রাখার কথা ‘প্রকাশকের নিবেদন’ অংশে উল্লেখিত হয়েছে  “…সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগের বর্তমান সংস্করণে বইয়ের আকার ও অক্ষর বড়ো করা হল ।” দ্বিতীয় ভাগের সমস্ত ছবিই নন্দলাল বসু মহাশয়ের আঁকা। শিশুরা নিজে রঙ করবে বলে সেগুলি রেখ চিত্র। কিন্তু পাঁচটি বেসরকরি প্রকাশন সংস্থার গ্রন্থে যথা নির্মল বুক এজেন্সী, স্নেহা প্রকাশনী, শিশু সাহিত্য ভারতী, বি.এম.পাবলিকেশন ও জয়দুর্গা লাইব্রেরির গ্রন্থে ‘প্রকাশকের নিবেদন’ বা ভূমিকা নেই। এমনকি মুদ্রকের নাম উল্লেখ নেই ছায়া প্রকাশনী,সাহিত্য ভারতী ও শিশু সাহিত্য ভারতী প্রকাশিত গ্রন্থে। অনুরূপভাবে প্রকাশন বর্ষের উল্লেখ নেই শিশুবিকাশ, অ্যালফাবেট, সাহিত্য ভারতী ও জয়দুর্গা লাইব্রেরি প্রকাশিত গ্রন্থে । কয়েকটি প্রকাশন সংস্থা যেমন, সাহিত্য কুঠি পাবলিকেশন, ছায়া প্রকাশনী, অ্যালফাবেটের ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছে “…আকাদেমি বানানবিধি বজায় রাখা হল। এজন্য অনেক ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথ লিখিত মূল বানানের পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছে ।”১২ নির্মল বুক এজেন্সী ছাড়া অন্যান্য সমস্ত প্রকাশকরা সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগের প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে অনুশীলনী যুক্ত করেছেন এবং অনেক প্রকাশক গ্রন্থনামের দিয়েছেন “সহজ পাঠ (অনুশীলনী সহ)”। সমস্ত বেসরকারি প্রকাশকরা অলংকরণ রঙিন করেছেন। এই ধরনের অলংকরণের সংখ্যা নির্মল বুক এজেন্সী ছাড়া অন্যান্য সব প্রকাশনায় বিশ্বভারতী প্রকাশনার থেকে বেশি।

আলোচনা:

সহজ পাঠ প্রকাশিত হবার আগে বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য প্রধান বই ছিল ১৮৫৫ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’ । তার আগে শিশুশিক্ষার সমাদৃত গ্রন্থ দুটি হল মদনমোহন তর্কালংকারের ‘শিশুশিক্ষা’ (প্রকাশকাল ১৮৪৯) এবং ‘শিশুবোধক’ ( প্রকাশকাল ১৮৫৪)। ১৩ রবীন্দ্রনাথ এই বই গুলি পড়েছিলেন । বিশেষ করে ‘বর্ণপরিচয়’ পাঠের কথা কবি ‘জীবনস্মৃতি’তে উল্লেখ করেছেন। ১৪ এই গ্রন্থগুলিতে ভাষা শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রগঠনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। ‘বর্ণপরিচয়’ প্রকাশনার ৭৫ বছর পর সহজ পাঠ প্রকাশিত হয়। রবীন্দনাথ অক্ষর, শব্দ, বাক্য ইত্যাদি শেখার সঙ্গে চরিত্র গঠন অর্থাৎ জ্ঞান দানের সঙ্গে চরিত্র গঠনের প্রয়াস করেননি। তিনি জীবন, প্রকৃতি থেকে উপাদান নিয়ে আনন্দের সঙ্গে পঠন-পাঠনের সূচনা করেন। এই কারণে সহজ পাঠ আনন্দের সঙ্গে বানান, উচ্চারণ শেখার ও প্রকৃতি পাঠেরও শিশুশিক্ষার বই। এমন কি সহজ পাঠে মানব জীবনের বিবর্তনের চিত্রও পাওয়া যায়। উনিশটি ছড়ার মধ্যেই ‘কথা কওয়া’ থেকে শুরু করে জীবনের শেষ পর্যায় ‘শাল মুড়ি দিয়ে’ ‘কোণে বসে’ কাশির উল্লেখ আছে। সহজ পাঠে জীবন সহজ সরলভাবে বর্ণনা করা হয়েছে । কিন্তু সেই বর্ণনা গভীরভাবে সমাজে গ্রথিত।  “ ধনী ও দরিদ্রের উল্লেখ থাকলেও তাদের সম্পর্ক সর্বদাই যে শোষক এবং শোষিতের –সে কথা বলা হয়নি। শিশুর মধ্যে শ্রেণীবিদ্বেষ জাগাবার বিন্দু মাত্র  চেষ্টা নেই সহজ পাঠে।”১৫

সহজ পাঠ প্রথম ভাগ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “এই বই বর্ণপরিচয়ের পর পঠনীয়”১৬
 রবীন্দ্রনাথ সহজ পাঠের প্রথম অংশে এগারোটি স্বরবর্ণের উল্লেখ করেছেন। ব্যজ্ঞনবর্ণের ক্ষেত্রে চৌত্রিশটি বর্ণের উল্লেখ করেছেন।  ড়, ঢ় , য়, ৎ , ঃ ,ঁ সম্পর্কে উল্লেখ করেননি, কিন্তু বর্ণযোজনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সম্ভবত বুঝেছিলেন ‘বর্ণরিচয়’ থেকে শিশুরা বনান শেখে ,উচ্চরণ শেখে , কিন্তু আনন্দ পায় না । সেই কারণে রবীন্দ্রনাথ লেখবার জন্য শিক্ষণের মনস্তত্ব পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। সহজ পাঠের রচনাগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি পাঠে একটি করে ঘটনার সহজ বর্ণনা দেওয়া আছে, শব্দ ও বাক্য থেকে পৃথক করা হয়নি, বাক্য একটি সম্পূর্ণ বর্ণনার অংশ। পাঠের বর্ণনা শিশুর পরিবেশ ও শিশুর অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। প্রতিটি পাঠ রচনায় ‘বিশ্লেষণ পদ্ধতি’ অনুসৃত হয়েছে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে বিষয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর পরিচয় করান হয় , পরে বিষয়টির অংশগুলির প্রতি শিক্ষার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এই পাঠে শিশুরা আনন্দ পায়, কারণ এতে তাদের কল্পনার জগৎ বৃদ্ধি পায় । ১৭

গ্রন্থস্বত্ব উত্তরকালে প্রকাশিত সহজ পাঠে বানান রীতির পরিবর্তন ও পাঠের শেষে অনুশীলনীর সংযোজন করা হয়েছে। বাংলা আকাদেমির বানানবিধি অনুসরণ করা হয়েছে। সমস্ত প্রকাশিত গ্রন্থে নন্দলাল বসুর করা সাদা কালো লিনোকাট অলংকরণের পরিবর্তে রঙিন চিত্র সংযোজিত হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, সাহিত্য ভারতী প্রকাশিত সহজ পাঠের ভূমিকায় অমিতাভ চৌধুরী লিখেছেন, “ এই বইয়ের সঙ্গেই সংযুক্ত হয়েছে পাঠ ও অনুশীলনী। নাম হয়েছে ‘সহজ পাঠ-পাঠ ও অনুশীলনী ’। ‘সহজ পাঠ’-এর ক্ষুদে পড়ুয়ারা এ বই পড়ে কতখানি শিখল তারই জরিপ করার চেষ্টা ।”১৮ বইটির অলংকরণ করেছেন কৃষ্ণেন্দু গুপ্ত যা অনেক ক্ষেত্রে পাঠের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় না ।

উপসংহার:

সহজ পাঠ রবীন্দ্রনাথের জীবনব্যাপী অভিজ্ঞতা এবং সমাজ ও প্রকৃতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। সহজ পাঠ শিশুদের শুধুমাত্র বর্ণ, শব্দ বা বাক্যের গঠন সম্পর্কে পরিচয় ঘটানোর পাঠ্যপুস্তক নয় , এটি শিশুদের সাহিত্য প্রবেশিকা। সহজ পাঠে রবীন্দ্রনাথ শিশুদের ভাষা শেখাবার জন্য ছন্দের ব্যবহার করেছেন। ছন্দ কবিতার মূল , এর মাধ্যমেই কবি শিশুদের প্রকৃতি , জীবন ও সমাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন।

সাদা কালো লিনোকাট অলংকরণ সহজ পাঠের অবিচ্ছেদ্য অংশ । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই কথা বিবেচনা করে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশকে লিখেছেন, “সহজ পাঠের ছবির সাইজ ব্যয় সংক্ষেপের খাতিরে খর্ব করতে চাও এ প্রস্তাবে নন্দলাল দুঃখিত। ঠিক সেই কারণেই তোমরা আমার লেখাকে ছেঁটে বইয়ের আয়তন ও মূল্য কমাতে পারতে। কিন্তু সেটা আমার কককাছে প্রীতিকর হত না ।”১৯ বেসরকারি প্রকাশকদের প্রকাশনায় এই দিকটি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত।

গ্রন্থস্বত্ব উত্তরকালে বেসরকারি প্রকাশকদের প্রকাশিত সহজ পাঠে নানা ধরনের ভ্রান্তি যথা- বিরাম চিহ্ন, বানান, শব্দ/বাক্যের সংযোজন বা বিয়োজন, দুটি স্তবকের সংযোজন বা পৃথক করা উল্লেখযোগ্য। এটা কবির প্রতি অবিচার, কারণ এর ফলে রচনার ছন্দ নষ্ট হয়, এমনকি অর্থের পরিবর্তন ঘটে। এটি বিশেষভাবে সত্য যখন কবি নিজের পান্ডুলিপির সংশোধন করতেন এবং বই বা পত্রিকায় প্রকাশের বিষয়ে সচেতন ছিলেন। ২০ অলংকরণ অনেক ক্ষেত্রেই পাঠ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়নি। গ্রন্থস্বত্ব উত্তরকালের সহজ পাঠ অনুশীলনীসহ পাঠ্যপুস্তক হয়ে উঠেছে। কিন্তু সহজ কি পাঠ শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তক ? কারণ যে বয়সে ক-খ চিনলেই যথেষ্ট , সেই বয়সেই সাহিত্য রসে দীক্ষা দেয় সহজ পাঠ। শিশুদের কল্পনার জগৎ এবং শিশু মনস্তত্ব বিবেচনা করে নন্দলালের করা অলংকরণের সঙ্গে বেসরকারি প্রকাশনার অলংকরণের তুলনা গবেষণালব্ধ আলোচনার বিষয় হতে পারে।


তথ্যসূত্র :

  • ১। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিচিত্র প্রবন্ধ । কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ , ১৯০৭ ।
  • ২। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সহজ পাঠ, দ্বিতীয় ভাগ । কলকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ , ১৩৬২ ব . ।
  • ৩। আবীর কর । সহজ পাঠ : বই চিত্র । কলকাতা : দিশা সাহিত্য , ২০১২ । পৃ. ২৬ ।
  • ৪। অতনু শাশমল । রবীন্দ্রনাথের সহজ পাঠ নিয়ে ।মধ্যবর্তী, ২৩(২৩-২৪)( ২০১২), পৃ . ৭-৯ ।
  • ৫।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সহজ পাঠের পান্ডুলিপি (পান্ডুলিপি সংখ্যা ১৯) । রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত।
  • ৬। সুমন দাস । প্রসঙ্গ সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগের ছবি । একুশের ঢেউ, ২(২) (২০১৬), পৃ . ১২৬-১৩২।
  • ৭। আবীর কর । সহজ পাঠ : বই চিত্র । কলকাতা : দিশা সাহিত্য , ২০১২ । পৃ. ৩৭ ।
  • ৮। তদেব । পৃ . ৩৮ ।
  • ৯। রানী চন্দ। সহজ পাঠে ছবি । সপ্তপর্ণী সহজ পাঠ বিশেষ সংখ্যা, বিশ্বভারতী ছাত্রসম্মিলনী, ( ১৯৮০-৮১) পৃ  ১১।
  • ১০।Ray, P. P. and Sen, B.K. Knolwedge diddeminatin and publication: Tagore in the perspective of information science. New Delhi: Concet Publishing, 2014,p.114.
  • ১১। Ray, P.P. Quality assessment of copyright free Tagoreana: a study. Annals of Library and Information Science, 58(3) Sept. 2011.p.257-269.
  • ১২। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহজ পাঠ অবলম্বনে, দ্বিতীয় ভাগ ।কলকাতা : ছায়া প্রকশনী , ২০১৩।
  • ১৩। বিষ্ণু বসু । সহজ পাঠ ।মধ্যে বিষ্ণু বসু ও বিনয় বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা । কলকাতা : প্রতিভাস , ১৯৮৯ । পৃ . ১১।
  • ১৪। Tagore, Rabindranath. Reminisciences. London: Macmillan, 1017. p.29.
  • ১৫।আরতি সেন । শিশু শিক্ষা প্রসঙ্গে সহজপাঠ ।সমতট, ( অক্টোবর- ডিসেম্বর ১৯৮০) পৃ . ২১৯।
  • ১৬। অতনু শাশমল । রবীন্দ্রনাথের সহজ পাঠ নিয়ে ।মধ্যবর্তী, ২৩( ২৩-২৪)( ২০১২), পৃ . ৭-৯ ।
  • ১৭। ভূজঙ্গভূষণ ভট্টাচার্য । রবীন্দ্র শিক্ষা দর্শণ । কলকাতা : বিদ্যালয় লাইব্রেরি, ১৩৭০। পৃ . ১৮০
  • ১৮। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সহজ পাঠ, প্রথম ভাগ । কলকাতা : সাহিত্য ভারতী, ২০০৫।
  • ১৯।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চিঠিপত্র ( ১৪ ভাদ্র ১৪৩৫) ।
  • ২০। সনৎকুমার বাগচী । রবীন্দনাথের পান্ডুলিপি , সমীক্ষা ও বিশ্লেষণ । কলকাতা : পুঁথি পুস্তক , ১৯৮৯ । পৃ . ৩৩৫।

 

 

 

 

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close