Book Review

বইয়ের নামঃ একজন কমলালেবু

সুলতানা সুমি

বইয়ের নামঃ একজন কমলালেবু

লেখকঃ শাহাদুজ্জামান

প্রকাশক প্রতিষ্ঠানঃ প্রথমা প্রকাশন


একজন কমলালেবুসুলতানা সুমি: 

‘একজন কমলালেবু’ বইয়ের নামটিই ভিতরটা খুলে দেখার ইচ্ছে জাগায়। আর একবার পৃষ্টা উল্টে দেখলে মনে হবে এক রহস্যের আবিষ্কার করতে চলেছি। হ্যাঁ, একটি রহস্যই বটে। একজন খাঁটি বাঙালী প্রতিভাবান কবির জীবন রহস্য! লেখক এই বইটির শুরুতেই বলেছেন ‘এই উপন্যাসে কবি জীবনানন্দের সঙ্গে বোঝাপাড়ায় লিপ্ত হয়েছেন’। এই উপন্যাস রূপের জীবনকাহিনীতে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান শুনাবেন জীবনানন্দ নামের এক জীবনের গল্প। এতক্ষণে বোঝা যাচ্ছে উপন্যাসটির নায়ক আমাদের রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। যার ডাক নাম ছিল মিলু। স্বভাবকবি কুসুমকুমারী দাশের ছেলে মিলু, শোভনা দেবীর মিলুদা, লাবণ্যের স্বামী মিলু কিভাবে নানান চড়াইউতরাই পেরিয়ে বাংলা সাহিত্যে কবিতার ইতিহাসে একদম জীবন্ত হয়ে রইলেন সে এক রহস্য, এক ইতিহাস। কথাসাহিত্যিক জীবনানন্দ দাশের জীবনের শুরু এবং রহস্যময় শেষ সবটুকু তুলে ধরেছেন গল্পের ভঙ্গিমায়।  মায়ের আদরের ছেলে মিলু, যে মায়ের অনুপ্রেরণাকে সম্বল করে কবিতা লেখা শুরু করে। তার প্রথম কবিতাটি ‘বর্ষাআবাহন’ প্রকাশ করেন মায়ের পছন্দের পত্রিকা ‘ব্রহ্মবাদীতে’। তারপর দীর্ঘ ছয় বছর পরে হাজির হলেন চিত্তরঞ্জন দাশকে নিয়ে লেখা আরেকটি কবিতা নিয়ে। এবং এরই ধারাবাহিকতায় লিখে ফেললেন ‘নীলিমা’। নীলিমা পাঠকের মন জাগাতে সক্ষম হয়। পাঠকের চেয়েও সমালোচকেরা মুখর হয়ে উঠলেন নীলিমাকে নিয়ে। কারণ তখন কাব্যের ইতিহাসে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিল একচেটিয়া প্রভাব। সেই রবীন্দ্র-বলয়ের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙিমায় জীবনানন্দ দাশ সাজালেন নীলিমাকে। কিন্তু কলকাতার রক্ষণশীল কবিরা এই উত্থানকে সহজ ভঙিতে নিতে পারেননি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও জীবনানন্দ দাশের কাব্যের সুরকে অবহেলা করলেন। এই অবহেলা নিয়েই কাব্যের সমুদ্রে যাত্রা জীবনানন্দের। বাকী পুরো পথটাই একজন খাঁটি প্রতিভাবান কবি হয়েও তাকে অবহেলায় পাড়ি দিতে হয়েছে। সমালোচকেরা তার প্রতিটা কবিতাকে সমালোচনার আগুনে বিদগ্ধ করেছেন। কিন্তু হায় তাঁরা কি জানতেন বাংলার পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে ‘সে কেন জলের মত ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়’ এই লাইনটির মত তিনিও পাঠকদের হৃদয়ে ঘুরবেন!

জীবনানন্দ নিজের সব কাব্যে তাঁর পরিণতিহীন প্রেম শোভনা দেবীকে এনেছেন। শোভনা দেবী সম্পর্কে তাঁর কাকার মেয়ে। জীবনানন্দ যৌবনের শুরুতেই প্রেম খুঁজেন শোভনা দেবীর হৃদয়ে। স্বভাবতই এই প্রেম পরিণতি পায়নি। কথাসাহিত্যিক খুব সুন্দর করে এই বেদনাকে ভাষা দিয়েছেন ‘মানুষ স্বপ্ন দেখে আর কোথায় কেউ একজন হাসে’ এই প্রবাদে। মিলুদার স্বপ্ন দেখে আড়ালে কেউ একজন হয়তো হেসেছিল। সে হাসির অভিশাপে মিলুদা না পারলেন শোভনাকে ভুলতে, না পারলেন নিজের সুন্দরী স্ত্রী লাবণ্যের সাথে একটি সুখী দাম্পত্যজীবন কাটাতে। আজন্ম দুখী এই মানুষটি কাব্যে যেমন সবার অবহেলা পেয়েছেন, ভাগ্যের দিক থেকেও নির্মমতার স্বীকারে পরিণত হন। বারবার চাকরি হারানো, বেকারত্ব, অভাব, হতাশা, বঞ্চনা, অপমান ছিল তার সঙ্গী।

সেই রবীন্দ্র-বলয়ের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙিমায় জীবনানন্দ দাশ সাজালেন নীলিমাকে। কিন্তু কলকাতার রক্ষণশীল কবিরা এই উত্থানকে সহজ ভঙিতে নিতে পারেননি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও জীবনানন্দ দাশের কাব্যের সুরকে অবহেলা করলেন। এই অবহেলা নিয়েই কাব্যের সমুদ্রে যাত্রা জীবনানন্দের।

কাব্যের বাইরে জীবনানন্দ বেশ কিছু উপন্যাসও লিখেছেন। কিন্তু সেগুলো কখনো প্রকাশ করেননি। এমনকি নামও দিয়ে যাননি। তাঁর সবগুলো গল্প উপন্যাস জুড়ে বর্তমান ছিল হারিয়ে যাওয়া প্রেম আর অসুখী দাম্পত্যের ক্রন্দন।

জীবনানন্দ জীবন পুরোটা কেটেছে আনন্দহীন এক উষর মরুভূমিতে। সেই নিরানন্দ জীবনকে তিনি প্রায়ই আত্মহত্যা করে মুক্তি দিতে চাইতেন। ১৯৫৪ সালে এসে যেন নিজের ভিতরে বাস করা সেই আত্মঘাতী চিন্তাকেই সত্যি করে তুললেন। খুব রহস্যময় মৃত্যু হয় জীবনানন্দের। ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা চলাকালীন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু সেখানেও থেকে যায় প্রশ্ন! এটা কি আত্নহত্যা নাকি হত্যা!

বইটি এমন সাবলীল ভঙ্গিমায় লেখা হয়েছে পড়তে কিঞ্চিত বিরক্তি আসবেনা। বাংলা কাব্যের মোড় ঘোরানো এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে জানার জন্যে, বোঝার জন্যে বইটির বিকল্প নেই। কিন্তু লেখক কেন এই জীবনকাহিনীর নাম দিলেন ‘একজন কমলালেবু’! সেটাও এক রহস্য। আর সে রহস্য জানার জন্যে বইটি পড়তে হবে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার – লেখক গ্রুপ

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close