Blog Post

স্মৃতিতে বার্মিংহাম

আসিফ মাহতাব পাভেল

আসিফ মাহতাব পাভেল


পর্ব-১:হোটেল প্রিমিয়ার ইন

ইংল্যান্ডের একটি ছিমছাম শহর বার্মিংহাম। এমিরেটসেরভ্রমণ ডায়েরি এয়ারবাসের স্ক্রিনে তিনটি এ্যাঙ্গেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফ্লাইটের লাইভ স্ট্রিমিং দেখছিলাম। প্রায় ১৪ ঘণ্টার ভ্রমণের ক্লান্তি থাকলেও প্রথমবারের মতো বিদেশ গমনের এক অদ্ভুত উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম নিজের মধ্যে। প্লেনের চাকা মাটি স্পর্শ করলো এবং আমরা টার্মিনাল ধরে এগোতে থাকলাম। দুবাইয়ে ট্রানজিট থাকায় দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের তুলনায় এ বিমানবন্দরটি খুবই সাধারণ মানের মনে হলো। অনেকটা আমাদের দেশের ডমেস্টিক বিমানবন্দরগুলোর মতো তবে পরিসরে অনেক বড়, পরিচ্ছন্ন এবং প্রযুক্তির সকল সুবিধা সম্বলিত। যেহেতু বিভুঁইয়ে প্রথম ভ্রমণ এবং ইমিগ্রেশন সম্পর্কেও কিছুটা অনভিজ্ঞ (যদিও ইতোমধ্যে দুবাই ইন্টারন্যাশনালের ইমিগ্রেশন সম্পর্কে সামান্য অভিজ্ঞতা হয়েছে) তাই আমাদের সফরসঙ্গীদের সাথে সাথে থাকার চেষ্টা করছিলাম কে জানে কখন কী বিপত্তি ঘটে এই ভয়ে। অন্যান্য সহযাত্রীদের সাথে লম্বা করিডোর ধরে যাচ্ছি তো যাচ্ছি, এমন সময় বাথরুম পেয়ে গেল এবং হাতের কাছের একটা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলাম। বের হয়ে আসতেই বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম সমস্ত করিডোর শূন্য। নিজের সফরসঙ্গীরাতো নেই, অন্য কোন মানুষকেও লক্ষ্য করলাম না। কিভাবে এটা সম্ভব! এতবড় বিমান বন্দর মানুষ থাকবে না?

বার্মিংহাম শহর ছবি- লেখক
 বার্মিংহাম শহর ছবি- লেখক

একটু পরে লক্ষ্য করলাম করিডোরটা এমনভাবে বাঁক নিয়ে ইমিগ্রেশন এলাকায় গিয়েছে তা নতুন কারো জন্যে বুঝতে পারা একটু কঠিন অথবা আমার অন্যমনস্কতার কারণে বুঝতে পারিনি। আর আমাদের ফ্লাইট ছাড়া সে সময় অন্য কোন আন্তর্জাতিক ফ্লাইট হয়তো ছিল না, যে কারণে মানুষ কম ছিল। যা হোক আমার সফরসঙ্গীদের খুব বেশি পেছনে দাঁড়াতে হয়নি। বৃটিশ নাগরিকরা তাদের নির্ধারিত বহির্গমন দিয়ে চলে গেল। কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছিল কারণ আমাদের সফরসঙ্গীদের অনেকের কাছে অফিসিয়াল পাসপোর্ট থাকলেও আমার তখন সাধারণ পাসপোর্ট ছিল। এছাড়া এখানে আসার আগে শুনেছিলাম ইমিগ্রেশনে অনেক জটিল ধরণের প্রশ্ন করে, চেকিং করে তাছাড়া বিদেশ ভ্রমণের অফিসাদেশে আমার নামের বানানে ভুল ছিল। আমার সামনে থাকা দুই/চারজন বিদেশীকে খুব করুণ মুখ করে অনুরোধ করতেই তারা আন্তরিকতার সাথেই আমাকে আমার সহকর্মীদের কাছে যেতে দিল। আমি কিছুটা স্বস্তিবোধ করলাম এই ভেবে যে, কোন ঝামেলা হলে অন্ততঃ পাশে পরিচিত মুখগুলো থাকেবে। তবে কোন ঝামেলাতো হলোই না, বরং বৃটিশ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মহিলাটির হাস্যমুখী আচরণে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।


আমাদের অভ্যার্থনার জন্য যুক্তরাজ্যের গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞ জন ডোলান হাসি মুখে অপেক্ষায় করছিলেন। বুড়ো এই ভদ্রলোকটির সাথে এর আগে একবার স্কাইপে কনফারেন্স করেছি। জন ডোলান দেখতে অনেকটা হ্যারি পোর্টারের হ্যাগ্রিডের মতো লম্বা চুল আর দাড়িতে ঢাকা।


এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই আমাদের সহকর্মীরা সেলফি আর ফটোশেসনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, আমাকেও অনেকের সাথে ফটোফ্রেমে অংশ নিতে হলো। আমাদের অভ্যার্থনার জন্য যুক্তরাজ্যের গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞ জন ডোলান হাসি মুখে অপেক্ষায় করছিলেন। বুড়ো এই ভদ্রলোকটির সাথে এর আগে একবার স্কাইপে কনফারেন্স করেছি। জন ডোলান দেখতে অনেকটা হ্যারি পোর্টারের হ্যাগ্রিডের মতো লম্বা চুল আর দাড়িতে ঢাকা। তিনি আমাদের নিকটস্থ রেল স্টেশনে নিয়ে যাবার জন্য দাড়িয়ে ছিলেন। প্রথমেই ইংল্যান্ডে আমাদের ছয় দিন কখন, কোথায়, কিভাবে যাব তার একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা দিলেন। এরপরে আমরা মোবাইলের জন্য সিম কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। লাগোয়া একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে উপমহাদেশীয়দের জন্য মোবাইলের সিম কেনা-বেচা হচ্ছিল। সেখানে এক মহিলার কাছ থেকে সিম কিনে দশ পাউন্ডের নোট দিতেই মেয়েটি বলল,

– স্যার, এই নোট এখানে চলবে না।

-কেন আমিতো আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে কিনে এনেছি।

– এই নোট পুরোনো এখানে চলবে না, স্যার।

– এটা চলেতো? একটা কুড়ি পাউন্ডের নোট দেখিয়ে বললাম।

– হ্যাঁ, চলবে। একগাদা কয়েন ফেরত দিতে দিতে বলল মেয়েটি।

 

মেয়েটি মোবাইল সিমের প্যাকেজটি কিভাবে এ্যাক্টিভেট করতে হবে বুঝিয়ে দিতে লাগলো। আমি অবশ্য মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারিনি কারণ ডোলান বারবার সবাইকে তাড়া দিচ্ছিলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে এয়ারপোর্ট থেকে সাটল মেট্রোতে করে এয়ারপোর্ট স্টেশনে পৌঁছালাম। ডোলান সবার হাতে টিকিট বুঝিয়ে দিয়ে বললেন,

– এই টিকিট দিয়ে তোমরা ট্রেন, বাস সব জায়গায় ব্যবহার করতে পারবে।

– আজকে কি ট্রেন এবং বাস দুটোতেই চড়তে হবে।

– না, এখানে শুধু আমরা ট্রেনেই টিকিটটা ব্যবহার করবো।

– আমার মতো বুড়োদের জন্য এই কার্ড। এই কার্ড দেখিয়ে অনেক সুবিধা আমরা পাই। ট্রেনের জন্য আলাদা ভাড়া গুণতে হয় না। জন তার নিজের একটা কার্ড দেখিয়ে বললেন।

একটু পরে লিফট চেপে নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালাম। ট্রেনটি দেখে কিছুটা হতাশ হলাম খুবই ছোট পরিসরের কোচ। আমাদের একগাদা লাগেজ নিয়ে ঠাসাঠাসি করে ট্রেনে উঠলাম এবং একটু পরেই গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছালাম। বার্মিংহাম স্টেশনের পাশেই আমাদের জন্য হোটেল বুক দিয়ে রেখেছিলেন বৃটিশ কাউন্সিলের শাকিল ভাই। হোটেলের নাম ‘প্রিমিয়ার ইন’।

চেক-ইন করে লিফটে ঢুকলাম কিন্তু বাটন কাজ করে না। তখনও হোটেলের স্মার্ট কার্ড সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ছিল না। আমরা তিন চারজন লিফটের ভেতরে কেবলই উঠা-নামা করতে লাগলাম। পরে দুই বিদেশীকে দেখে কার্ডের ব্যবহার শিখলাম। হোটেল রুমে প্রবেশ করেই জানালা দিয়ে শহরের দৃশ্য দেখলাম কিছুক্ষণ। অপূর্ব একটা শহর সবুজে ভরপুর মাঝে মাঝে চার্চ আর কিছু পুরানো ভবন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

হোটেল প্রিমিয়ার ইনের লবিতে লেখক
হোটেল প্রিমিয়ার ইনের লবিতে লেখক

বাথরুমে ঢুকে হট শাওয়ার নিয়ে মোবাইলে চার্জ দেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমাদের দেশের মতো ওখানকার পাওয়ার সকেটগুলো দুই পিনের না হয়ে তিন পিনের ফলে কোন সুইচবোর্ডেই চার্জ দেয়া সম্ভব হলো না। বাধ্য হয়েই দেয়ালে ঝুলানো টেলিভিশনের ইউএসবি পোর্ট থেকেই চার্জ দেয়ার ব্যবস্থা করলাম। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় যেতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না।

বাইরে তখনও সন্ধ্যা নামেনি। চট করে গরম পোশাক পরে রুমের বাইরে আসলাম। হোটেল করিডরে শুনশান নিরবতা। সহকর্মীদের রুমগুলো অন্য ফ্লোরে থাকায় সরাসরি লবিতে চলে গেলাম। আমাদের ১২ জনের দলের কাউকে দেখলাম না, তাই একাই শহর দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। প্রায় আধাঘণ্টা এদিক-সেদিক হাঁটাহাটি করলাম, চমৎকার কিছু চোখে পড়লে সেলফি তুলতাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, যদি হারিয়ে যাই এই ভয়ে আবারও ফিরে এলাম হোটেল প্রিমিয়ার ইনে। এসে দেখি আমার সঙ্গীদের সবাই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ইতোমধ্যেই প্রাথমিক বেড়ানো এবং কেনাকাটা করে ফেলেছে। আমার মতো না ঘুমিয়ে সবাই সময়টা কাজে লাগিয়েছে এবং আমি ক্লান্ত ছিলাম বলে কেউ আমাকে ডাকেনি। যাহোক তাদেরকে জানালাম যে, এরপরে যত ক্লান্তই থাকি আমাকে অবশ্যই যেন কষ্ট করে ডেকে নেন। দশ মিনিট বিরতির জন্য সবাই যে যার রুমে চলে গেল, ফিরে এসে সবাই শপিং-এ যাবে। রাতে আমাদের অপর একজন উপদেষ্টা আইয়ুব খানের নিমন্ত্রণে ডিনারে যাওয়ার কথা। এই ফাঁকে ভাবলাম হোটেলের বাইরে গিয়ে দাঁড়াই। ততক্ষণে বেশ ঠাণ্ডা পরেছে।

হোটেলের মেইনগেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় প্রায় সাড়ে ছয় ফুট লম্বা রুক্ষ চেহারার এক ভিনদেশী যুবক আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

– হাই, কেমন আছো?

লোকটির পরনের পোশাক বেশ নোংরা এবং বেশ জীর্ণ।

– হাই, ভালো আছি! কৌতুহলী হয়ে বললাম।

– তুমি নিশ্চয়ই বাইরের দেশ থেকে এসেছো?

– আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি! কথা বলছিলাম কিন্তু ভেতরে একটু অবাক হচ্ছিলাম এই ভেবে যে এরা নিজে থেকে অপরিচিত কারো সাথে এত কথা বলে না বলে শুনেছি। এই ব্যাটার মতলবটা কী?

– কেমন লাগছে এখানে।

– সবেতো এলাম, তবে মন্দ নয়। তুমি কী এদেশের?

– না, আমি পূর্ব ইউরোপ থেকে এসেছি।

– পূর্ব ইউরোপ নামে কোন দেশ আছে বলেতো শুনিনি। নাকি এটা আমাদের সাব-কন্টিনেন্টের মতো কোন অঞ্চল?

– তোমাকে সব বলতে পারি তবে এক কাজ করো আমাকে একটু ড্রিঙ্কস করাও। তোমার এই হোটেলে ভালো মদ পাওয়া যায়। এতক্ষণে ব্যাটার উদ্দেশ্য টের পেলাম।

– দেখো আমি মুসলমান। আমরা মদ খাই না এবং খাওয়াই না। তাছাড়া আমার সঙ্গীরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। শুভরাত্রি!

প্রিমিয়ার ইন হোটেলের সম্মুখে লেখক
প্রিমিয়ার ইন হোটেলের সম্মুখে লেখক

দ্বিতীয় কোন কথার সুযোগ না দিয়ে হোটেলের দরজার ভেতরে প্রায় দৌড়ে ঢুকে পড়লাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি লোকটা অন্য এক আগন্তুকের সাথে কথা শুরু করেছে। আমি হোটেলের সিকিউরিটিকে লোকটার বিষয়টি জানালাম। সে বলল,

– এরা ভবঘুরে পূর্ব ইউরোপের দেশ থেকে এসেছে। এদের চাল চুলোর ঠিক নেই। পাত্তা দিও না।

অবাক হয়ে ভাবলাম পশ্চিমের দেশ মানেই স্বর্গ ভাবতাম। এখানেও স্বর্গের উল্টো পিঠ আছে প্রথমবারের মতো প্রমাণ পেলাম।

বার্মিংহাম বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সফরকারী দলের সদস্যবৃন্দের গ্রুপ ছবি
বার্মিংহাম বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সফরকারী দলের সদস্যবৃন্দের গ্রুপ ছবি
[ঘটনাকাল নভেম্বর, ২০১৭]

(চলবে)


লেখক,

  • সহকারী পরিচালক (উন্নয়ন ও আইসিটি),
  • গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর,
  • ঢাকা।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close