Blog Post

লাল ইটের রূপকথা

মাহাবুবা আক্তার

১৯৭৭  খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে Documentary Film Competition সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। Documentary Film Competition এ যে চিত্রটি শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়ে পুরস্কৃত হয় কান্তজিউ মন্দিরের ছবি ও টেরাকোটার কথা অন্যতম।চিত্রের এ ম্ক্রিপ্ট টির শিরোনাম ছিল-“ Sermon in Bricks” অর্থাৎ ইটের মাধ্যমে রুপকথা।বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ও গবেষক অধ্যাপক  রোকাইয়া কবির চৌধুরীর এ প্রামাণ্য চিত্রটি শৈল্পিক নাম, মন্দিরের টেরাকোটার সৌন্দর্য ,পৌরাণিক কাহিনীর নিখুত উপস্থাপন ,সমগ্র সৌধটির  স্থাপত্যের নান্দনিক নৈপুন্য বিশ্বমহলে সমাদৃত হয়।

লাল ইটের রূপকথাদিনাজপুর শহর থেকে ১৩ মাইল নামক স্থানে ঢেপা নদীর তীরে কান্তমন্দিরের অবস্থান।মন্দিরের নির্মাতা- ১৮ শতকের তৎকালীন মহারাজা প্রাণনাথ রায় ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তার পৌষ্যপুত্র রাজা  রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ কাজ  শেষ করেন। ধারণা করা হয়, সম্রাট আওরঙ্গজেব এর রাজত্বকালে রাজা প্রাণনাথকে ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ এর প্রেক্ষিতে সম্রাট আওরঙ্গজেব রাজা প্রাণনাথকে দিল্লীর দরবারে তলব করেন। রাজা প্রাণনাথ অমায়িক ও দুরদর্শী ছিলেন। তিনি বাংলা থেকে তৎকালীন সুগন্ধিযুক্ত কাটারিভোগ চাল, ঢাকার মসলিন, হীরা ও পান্না নিয়ে দিল্লীর অভিমুখে রওনা হন। দিল্লীর দরবারে রাজা প্রাণনাথ নির্দোষ সাভ্যস্ত হন, রাজার বিচক্ষণতা ও বিনম্রতায় মুগ্ধ হয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে রাজা উপাধি দেন। রাজা প্রাণনাথ মনস্থির করেন ,রাজ্যে ফিরে তিনি ধর্মচর্চার জন্য মন্দির স্থাপন করবেন। নিজ রাজ্যে ফিরে তিনি মন্দির এর কাজে হাত দেন।

কান্তজিউ মন্দিরের শৈল্পিক ইটের পরতে পরতে ইতিহাস। মন্দিরটির আকারে ’৫২x৫২’ বর্গফুট, উচ্চতা ৭০ ফুট।২৮৮০০’ বর্গফুট চত্বরের মধ্যখানে মন্দিরের আয়তন ২৭০৪ বর্গফুট মাত্র। মন্দিরটি চাতুষ্কোণিক এবং তিন ধাপে নির্মিত। প্রথম ওদ্বিতীয় ধাপে চারকোণে আটটি ক্ষুদ্রকায় কক্ষ ও মধ্যখানে অবস্থিত গর্ভগৃহ – যেখানে সংস্থাপিত ছিল সর্বাপেক্ষা উচু রত্নচূড়া। নয়টি চূড়াকে বলে নবরত্ণাক্ষ, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে নয়টি চূড়াই ধ্বংস হয়ে যায়।

মন্দিরটি এমন একটি স্থাপত্য যার সর্বাঙ্গ মূর্তি দ্বারা বেষ্টিত। দেয়ালের উভয়পৃষ্ঠের ইটগুলি রক্তবর্ণ পোড়ামাটির  কারুকার্যের ফলক দিয়ে তৈরি। মন্দিরটিতে ১২ টি দরজা রয়েছে। মন্দিরের উত্তর দেয়ালে রামরাবণের ঘটনা ,দক্ষিণে চণ্ডী বা কালীদেবীর যুদ্ধকাণ্ডের ঘটনা ফুটে তোলা হয়েছে। মন্দিরের চার দেয়ালে চিত্রিত হয়েছে রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনি। দক্ষিণ দেয়ালের নিচ থেকে প্রথম সারির টেরাকোটাগুলো পৌরাণিক চিত্র কিন্তু দ্বিতীয় সারির চিত্রগুলো মোঘল রাজত্বের বিভিন্ন ঘটনা। তৃতীয় সারিতে বৈদিক ও পৌরাণিক কাহিনী অলংকৃত। মন্দিরটির চার দেয়ালে ভাস্কর্যের চিত্র যেন চার খন্ডের মহাকাব্য।

টেরাকোটায় অংকিত চিত্রগুলো – মোঘল সম্রাটের নৌবিহার, রাজ্যভিজান, আলবোলা পানরত মোঘল সম্রাট, কুর্নিশ গ্রহণরত শাহানশাহ, ময়ুরপঙ্খি রাজকীয় নৌযান, সজ্জিত হস্তি, অস্তযুথ। বৈদিক ধর্মের দেবদেবী-ব্রহ্মা, শিব, বিষ্ণু, গণেশ, সূর্য, চণ্ডী, মেনকা, পার্বতী ছাড়াও রথ, শিকল, শঙ্খ, ঘন্টা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

পৌরাণিক চিত্রগুলো ছাড়াও নারী ওপুরুষ, দেবতা ও কিন্নর, যোদ্ধা ও শিকারী, গায়ক ও বাদক, ডাব আহরণরত কৃষক, ভাডসহ গোয়ালা, বিশ্রামরত গৃহিণী, নৌকার মাঝি, গাছপালা, ফলমূল, লতাপাতা, কোরক ও হীরাপান্না ইত্যাদি।

চিত্রফলকগুলোর আয়তর ওআকার বিভিন্ন সাইজের হলেও দেখে মনে হয় চিত্রফলকগুলো যেন অখন্ড।সর্বনিম্ন ৬ ইন্চি হতে সর্বোচ্চ ২০ ইন্চি ফলক বিদ্যমান।

মন্দিরের সমগ্র অংশের অসাধারণ শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে-ইউরোপীয় বণিক মূর্তি,ফিরিঙ্গিদের ব্যবসা বাণিজ্যের চিত্র,১৫ টি দস্যুপ্রকৃতির ইউরোপীয় বণিক মূর্তি।উত্তর দেয়ালে বম্বেটে দস্যূসম্বলিত জাহাজ রয়েছে।দক্ষিণ দেয়ালের পূর্বাংশের কার্নিশের নিচ থেকে বারান্দার উচ্চতা পর্যন্ত কিছু সৈনিক দ্বারা বিভিন্ন ভংগিতে নারীদের ধর্ষণের চিত্র অংকিত যা মন্দিরের পবিত্রতার অসংগতি।ধারণা করা হয়,এটি লংকা যুদ্ধের নারীদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা চিত্রিত হয়েছে।

মন্দিরের স্থাপিত পাথর গুলি রাজবংশের ইতিহাস মতে ,বানগড় স্তুপ থেকে আনা তবে কারো কারো মতে পাথরগুলি ভারতের রাজমহল থেকে আমদানিকৃত।

১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ইংরেজ সিভিলিয়ান বুকানন কান্তমন্দির পরিদর্শনে বলেছিলেন, The Temple is by far the finest that I have seen in Bengal.

সামগ্রিক দৃষ্টিতে মন্দিরটির দৃশ্য যেন উর্ধতল বিশিষ্ট রক্তবর্ণ পদ্মফুল। এ যেন ইটের নির্মাণশৈলীতে রুপকথার গল্প। মন্দিরের উত্তর দেয়ালে ভিত্তিপ্রস্তর কৃষ্ণপাথরের উপরে ৪ টি শ্লোক রয়েছে।শ্লোক গুলো নিম্নরূপ-

শ্রী শ্রী কান্তঃ

”শাকে বেদাদ্ধি কাল-ক্ষিতি পরিগণিতে ভূমিপঃপ্রাণনাথঃ

প্রাসাদাঞ্চাতিরম্য সুরচিত নবরত্নাখ্য মস্মিন্যকার্ষীৎ

রুক্সিন্যাঃ কান্ত তুষ্ঠৌ সমুদিত মনসা রামনাথেন রাজ্ঞা

দত্ত কান্তায় কান্তস্য তু-নিজ নগরে তাত সংকল্প ‍সিদ্ধৌঃ”


লেখকঃ মাহাবুবা আক্তার ,সহকারি লাইব্রেরিয়ান,জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার,  দিনাজপুর

ছবিসূত্র- ট্রাভেলার নিউজ

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close