“মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করি বাধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মত চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাশব্দের সহিত এই লাইব্রেরীর তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাধা পড়িয়া আছে!” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ল্যাটিন শব্দ Libre থেকেই Library শব্দের উৎপত্তি।এর অর্থ বই। মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হলো বই। সাধারন অর্থে বই এর সংগ্রহশালাই হলো লাইব্রেরি। তাই লাইব্রেরিকে বলা হয় মানব সভ্যতার দর্পন। বলা হয়, যে জাতির লাইব্রেরি যত বেশি উন্নত, সেই জাতি মেধা ও মননশীলতার দিক দিয়ে তত বেশি উন্নত। সারা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য লাইব্রেরি। চলুন জেনে নিই অসাধারণ সুন্দর সেসব লাইব্রেরি সম্পর্কে চমকপ্রদ কিছু তথ্য।

১.  হার্ভার্ড  বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, যুক্তরাষ্ট্র

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো লাইব্রেরি এবং পৃথিবীর প্রাচীন একাডেমিক লাইব্রেরিগুলোর মধ্যে অন্যতম। সংগ্রহের দিক থেকে এটি পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম লাইব্রেরি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের গ্রন্থাগারের প্রবেশমুখে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ন্যায়বিচারের উদাহরণ হিসেবে ইস্পাতের সাইনবোর্ডে খোদাই করে লিপিবদ্ধ হয়েছে সূরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াত। হার্ভার্ড  বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, যুক্তরাষ্ট্র

সুরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতটি হলো-

‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের প্রতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করো, তাতে যদি তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও হয় তবু। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী তোমাদের চাইতে বেশি। অতএব, তোমরা ন্যায়বিচার করতে গিয়ে কামনার অনুগামী হয়ো না।  আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলো কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে জেনে রাখ- তোমরা যা কিছুই কর আল্লাহ তার খবর রাখেন।’


.  এল এটেনিও গ্র্যান্ড, আর্জেন্টিনাএল এটেনিও গ্র্যান্ড, আর্জেন্টিনা

সুদূর আর্জেন্টিনায় অবস্থিত এই লাইব্রেরিকে বলা হয় বই এর স্বর্গ! সুনিপুণ স্থাপত্যশৈলী এই লাইব্রেরীর প্রধান আকর্ষণ। প্রতিবছর লাখো বইপ্রেমী মানুষ দূর দূরান্ত থেকে বই এর টানে ছুটে আসে এই লাইব্রেরীতে। একসময় এটি ছিল অভিনয়ের থিয়েটার। যেখানে আর্টিস্টরা মঞ্চে পারফর্ম করতেন। দর্শকরা তা উপভোগ করতেন। এখন সেখানেই রয়েছে বই পড়ার জায়গা। হাজারো বইয়ের সংগ্রহ। নানান চিত্রকর্ম, বারান্দা আর লাল রংয়ের পর্দা লাইব্রেরিটিকে করেছে অসাধারণ।


৩.  স্ট্রাহোভ অ্যাবে লাইব্রেরি, চেক প্রজাতন্ত্র

ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড.  জেমস ক্যাম্পবেল এবং বিখ্যাত স্থপতি উইল প্রাইস এ লাইব্রেরিটি তৈরি করেন। পছন্দের নকশা দিয়ে এটিকে পরিনত করেছেন বিশ্বের অন্যতম সুন্দর লাইব্রেরিতে।


৪. বিবলিওথেকা জোয়ানিনা, কোইমব্রা, পর্তুগাল

লাইব্রেরিটি সে যুগের নিদর্শন যখন পর্তুগাল ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। মনোরম এ লাইব্রেরিতে আলো প্রবেশের সুযোগ নেই। তবে সোনার পাতের কারুকাজ মুগ্ধতার সৃষ্টি করে এখানে। বই রাখার তাকগুলোতে রয়েছে রংয়ের কাজ। সে সঙ্গে পড়ার কক্ষকে আলাদা রাখতে রয়েছে প্রবেশের গোপন দরজা।


৫. মার্টন কলেজ লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড, যুক্তরাজ্য

এ ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৩৭৩ সালে। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একাডেমিক লাইব্রেরি হিসেবে ষোড়শ শতক থেকে এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

মার্টন কলেজ লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড, যুক্তরাজ্য


৬. ভাসকনস্লোস লাইব্রেরি, মেক্সিকো সিটি

মেক্সিকো সিটিতে ৬,০০০০০ পুস্তক নিয়ে এই গ্রন্থাগারের সংগ্রহ। এর সাধারণ ও রেফারেন্স সংগ্রহগুলো ৪০,০০০ টিরও বেশি স্টিলের ঝুলন্ত বইয়ের তাকে থরে থরে সাজানো রয়েছে। এছাড়াও এখানে মাল্টিমিডিয়া, ব্রেইল এবং সঙ্গীত সামগ্রীর সংগ্রহও রয়েছে।


৭.   কানাজাওয়া উমিমিরাই লাইব্রেরি, জাপান

জাপানের অবস্থিত এই লাইব্রেরির ভবনটি তৈরি করা হয়েছে “পাঞ্চিং ওয়াল” এর মাধ্যমে। এ পদ্ধতিতে ভবনটির দেয়ালজুড়ে প্রায় ৬০০০ ছোট ছোট গর্ত রয়েছে যা জাপানের ভূমিকম্পপ্রবণ মাটিতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও এই গর্তগুলো প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল এবং পাঠের পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করে। এমন ভিন্নধর্মী নকশার জন্য ভবনটি ২০১২ সালে চুবু আর্কিটেকচার পুরষ্কার লাভ করে।

কানাজাওয়া উমিমিরাই লাইব্রেরি, জাপান


৮. তিয়ানজিন বিনহাই লাইব্রেরি, চীন

চীন ২০১৭ সালে সারাবিশ্বকে অবাক করে দিয়ে নান্দনিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে রাজধানী বেইজিং এর অনতিদূরে নির্মাণ করেছে তিয়ানজিন বিনহাই লাইব্রেরি। লাইব্রেরিটির সংক্ষিপ্ত রুপ The eye যার অর্থ চোখ।

লাইব্রেরিটির নাম The Eye এর মতো এর গঠনও চোখ এর মতোই। ৩৩৭০০ বর্গমিটার আয়তনের পাঁচতলা বিশিষ্ট লাইব্রেরিটিতে প্রায় ১.২ বিলিয়ন বই রাখা সম্ভব চীনে এই লাইব্রেরিটি এখন একটি জনপ্রিয় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে এবং এটি ২০১৮ সালে প্রথম দরজা খোলার পর থেকে প্রায় ১.৫ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক এখানে এসেছেন।

তিয়ানজিন বিনহাই লাইব্রেরি, চীন


.এপোস লাইব্রেরি, নরওয়ে

নরওয়েতে একটি ভাসমান লাইব্রেরি রয়েছে যার নাম এপোস। এপোস একটি বুক বোট বা বইয়ের নৌযান, যা ১৯৫৯ সালে কার্যক্রম শুরু করে। নৌযানটি বছরের অর্ধেকটা সময় নরওয়ের পশ্চিম অঞ্চলগুলোতে ঘুরে বেড়ায় এবং লাইব্রেরির সেবা দিয়ে থাকে। ভাসমান লাইব্রেরিটি একজন ক্যাপ্টেন, একজন নাবিক, তিনজন লাইব্রেরিয়ান দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। নৌযানের ভেতরে প্রায় ৬০০০ বই থাকে আরও বাকি ২০০০০ বই সর্বদা পাঠকদের কাছে ধার দেওয়া থাকে।


১০.  ওয়াল্টার সি কোয়ারনার লাইব্রেরি, কানাডা

ইউনিভার্সিটি অব ভ্যাঙ্কুভারের ওয়াল্টার সি কোয়ারনার লাইব্রেরী আকৃতি অনেকটা খোলা বইয়ের মতো। আর্থার এরিকসনের এর ডিজাইন করেন। লাইব্রেরিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ মার্চ ১৯৯৭ সালে চালু হয়।


১১.  নাসাউ লাইব্রেরি, দ্য বাহামাস

শুনতে অবাক লাগলেও বাহামাসে অবস্থিত নাসাউ পাবলিক লাইব্রেরিটি মূলত অপরাধীদের জন্য নির্মিত হয়েছিল। অষ্টভুজ আকৃতির ভবনটি ১৭০০ এর দশকের শেষদিকে কারাগার হিসাবে নির্মিত হয়েছিল এবং ১৮৩৭ সালের দিকে এটি একটি লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়। এই গ্রন্থাগারের সংগ্রহ সংখ্যা প্রায় ২৮০০০।


১২.  স্টকহোম লাইব্রেরি, সুইডেন

এটি সুইডেনের প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি যা উন্মুক্ত বইয়ের তাক ধারণাটিকে বাস্তব রূপদান করে। এর ফলে পাঠকেরা লাইব্রেরিয়ানের সহায়তা বা অনুমতি ছাড়াই প্রয়োজনীয় বই তাক হতে সংগ্রহ করতে পারেন।


সূত্রঃ ইফলা গ্লোবাল ও অন্তর্জালের অন্যান্য সূত্র

লেখক পরিচিতি: আরেফিন আলভী, ১ম বর্ষ, তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়