Blog Post

মুসলিম মনীষীদের বইপ্রীতি

মাওলানা আমিরুল ইসলাম

মুসলিম মনীষীদের বইপ্রীতি

বই মানব সভ্যতার সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান। প্রকৃত মানুষ হওয়ার সেরা মাধ্যম। ভদ্র-সভ্য, মর্যাদাবান ও সম্মানিত হতে জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। মনন গঠনে, প্রতিভা বিকাশে বই অপরিহার্য। বই মানুষকে রুচিশীল করে, আত্মবিশ্বাসী করে। শান্তিপ্রিয় ও সভ্য মানুষেরা বইপ্রিয় হয়ে থাকেন। পড়াশোনা, বই, জ্ঞানার্জন মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট অতি পছন্দনীয়। মানবজাতির উদ্দেশে আল্লাহ তায়ালার প্রথম বাণী হলো ‘পড়। বোঝা যায়, জ্ঞানার্জন ব্যতীত আল্লাহর পরিপূর্ণ প্রিয় বান্দা হওয়া যায় না। ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে বইয়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ। ইসলামী জ্ঞান বিস্তারে মুসলমান মনীষী, ইমাম, ফকিহ, মুহাদ্দিস, মুফাসির ও গবেষকবৃন্দ এত পরিমাণ বই লিখেছেন, যার উদাহরণ অন্য কোনো ধর্মে পাওয়া অসম্ভব। ধর্মীয় পুস্তকের আধিক্য মুসলিম জাতির ‘অলৌকিক কীর্তি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, সব কিছুর বিনিময়ে বইয়ের মালিকানা অর্জনের বৈচিত্র্যময় ঘটনায় ভরপুর ইসলামের ইতিহাস। সুদূর অতীত হয়ে বর্তমান সময়েও মুসলিম মনীষীদের বইপ্রীতি ও বই ক্রয়ের আশ্চর্যজনক ঘটনা আমাদেরকে নাড়া দেয় তুমুলভাবে। কিছু ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হলো:

সম্পত্তি বিক্রি করে বই ক্রয়

ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.)। ইসলামী ইতিহাসের একজন উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তিনি একবার তার সন্তানকে নসিহত করতে গিয়ে নিজের অভাবগ্রস্ত জীবনের চরম দুর্দশা সম্পর্কে বলেন, ‘শোন! আমার পিতা অনেক সম্পদশালী ছিলেন। হাজার হাজার দিনার-দিরহাম ও জমি-জমা রেখে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজন ও মুরুব্বিরা বসে তার রেখে যাওয়া সম্পদ সন্তানদের মধ্যে বন্টন করেন। আমার ভাগে দুটি বাড়ি ও বিম দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) পড়ে। তারা আমাকে এসব অর্পণ করে বললেন, এই উত্তরাধিকার সম্পদ সব তোমার। আমি গ্রহণ করলাম। প্রাপ্ত সব দিনার দিয়ে কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও বিভিন্ন শাস্ত্রের কিতাবাদি ক্রয় করলাম। বাড়ি দুটিও বিক্রি করে কিতাব ক্রয় ও জ্ঞানার্জনের কাজে ব্যয় করলাম! এরপর আমার হাতে কোনো অর্থকড়ি অবশিষ্ট থাকল না। আমি পুরোপুরি রিক্তহস্ত হয়ে গেলাম!’

কাপড় বিক্রি করে কিতাব ক্রয়

ইমাম আবু জুরয়া রাজি (রহ.)। প্রখ্যাত মুসলিম মনীষী। কোরআন-হাদিসসহ অন্যান্য অনেক শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ। জ্ঞানার্জনে বাড়ি ছেড়ে বের হন। মক্কায় হজ করে মিসরে উপস্থিত হন। সেখানে শাফিয়ি মাজহাবের অনেক কিতাব পাঠে ও বড় আলেমদের সাহচর্যে ধন্য হন। একজন আলেম থেকে কিতাব ক্রয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হলে তিনি প্রস্তাব করেন। কিন্তু ওই আলেম কিতাব বিক্রি করতে রাজি হলেন না। তবে কপি করে দিতে রাজি হলেন। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে চুক্তি সম্পাদিত হলো। অথচ তার নিকট তখন কোনো অর্থ ছিল না। তবে মিসরের বাজার থেকে শখ করে কেনা একটি দামি কাপড় ছিল তার নিকট। কাপড়টি ষাট দিরহামে বিক্রি করে দিলেন! দশ দিরহামে একশ পিস কাগজ ক্রয় করে উক্ত ব্যক্তির নিকট সরবরাহ করলেন। এভাবেই তিনি কাপড় বিক্রয়ের বিনিময়ে বিশাল সংখ্যক কিতাবের মালিক হয়ে গেলেন।

ডাকাতের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক

ইমাম গাজালি (রহ.)। জগদ্বিখ্যাত ইসলামী দার্শনিক ও চিন্তবিদ। একবার রাস্তায় ডাকাত দল তাকে আক্রমণ করে সব ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তিনি ডাকাতদের পেছনে পেছনে যেতে লাগলেন। ডাকাত সরদার বলল, দূরে পালাও, আমাদের পিছু ছাড়, নতুবা তোমাকে হত্যা করব! তিনি বললেন, আমার ‘তালিক’ ফেরত দাও। তোমাদের চলাফেরা সহজ হবে। তা ছাড়া ওটাতে তোমাদের কোনো লাভ হবে না! ডাকাত সরদার জিজ্ঞাসা করল, ‘তালিক’কী জিনিস? তিনি বললেন, ব্যাগে ভরা আমার বই পুস্তক! এই বইগুলোর শিক্ষা অর্জনের জন্যই আমি ঘর ছেড়েছি। ডাকাত সরদার হেসে বলল, আমরা ছিনিয়ে নেওয়ার পরও তুমি সেগুলো কীভাবে নিজের দাবি করছ? এরপর ডাকাত সরদার বইগুলো ফেরত দিয়ে দিল!

বই শুকাতে শুকাতে চোখ অন্ধ

ইমাম ইবনে দিহান (রহ.)। আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রের বিদগ্ধ আলেম ও বিশ্বজয়ী সাহিত্যিক। আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রে তার নিজের লেখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব ছিল। মসুলের সম্ভ্রান্ত ও আলেমপ্রিয় মন্ত্রী জামাল উদ্দিনের ডাকে সাড়া দিতে তিনি বাগদাদ ছেড়ে মসুলে চলে আসেন। নিজের সমস্ত বইপত্র বাগদাদে রেখে এসেছিলেন। এমতাবস্থায় প্রবল বন্যায় বাগদাদ শহর ভেসে যায়। তার বাড়ির পেছনে একটি চামড়া শুকানোর উঁচু স্থান ছিল, সেটা টপকে বাড়িতে পানি ঢুকে যায়। বন্যার ফলে তার সমস্ত কিতাব নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এই কিতাবগুলো লেখা ও সংগ্রহের পেছনে তার সারা জীবন ব্যয় হয়েছে! কিছু কিতাব উদ্ধার করে তার নিকট উপস্থাপন করা হলে, লোকেরা আটা জাতীয় এক ধরনের ধূপ জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিতে পরামর্শ দিলেন। যাতে হালকা আগুন ও ধোঁয়ার মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব বইপত্র সংরক্ষণ করা যায়। তিনি একাধারে ৩০ মাসেরও বেশি সময় ধূপ জ্বালিয়ে বইগুলো রক্ষণের চেষ্টা করেছেন। ফলে তার মাথা ও চক্ষু আটার আবরণে আক্রান্ত হয়। তিনি অন্ধ হয়ে যান! বইয়ের নেশায় এতটাই কাতর ছিলেন যে, চক্ষু অন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অথচ সেদিকে মোটেও ভ্রক্ষেপ নেই।

স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বিক্রয়

ইমাম আবদান আল মারওয়াজি (রহ.)। ইতিহাসের বিখ্যাত আলেম ও বুজুর্গ মনীষী। শাফেয়ি মাজহাবের গবেষক ও প্রচারক ছিলেন। এই শহরে আরেকজন আলেমের নিকট অনেক কিতাব ছিল। ইমাম আবদান তার নিকট কিতাব কপি করার আবেদন জানালে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ইমাম আবদান এমনিতেই কিতাবের পাগল ছিলেন। বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তার কিতাবের নেশা আরও বেড়ে গেল। নিজের স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পত্তি বিক্রয় করে তিনি সিরিয়া, ইরাক সফর করে বিপুল পরিমাণ কিতাব ক্রয় করে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন! এলাকায় সাড়া পড়ে যায়! ওই আলেম ইমাম আবদানকে শুভেচ্ছা জানাতে এসে নিজের পূর্ব সিদ্ধান্তের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলে, তিনি শুকরিয়া জ্ঞাপন করে বলেন, আপনার জন্যই আমার এত কিছু সম্ভব হয়েছে। শুকরিয়া আমারই আদায় করা উচিত।

সূত্র : আরব বিশ্বের বিখ্যাত গবেষক আলেম শাইখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) লিখিত সাফহাতুম মিন সবরিল উলামা’


লেখক: মাওলানা আমিরুল ইসলাম

প্রথম প্রকাশ: সময়ের আলো,ফেব্রুয়ারি, ২০২০ l

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close