Blog Post

বুক রিভিউ : উইংস অফ ফায়ার

সমীর কুমার মণ্ডল:

সমীর কুমার মণ্ডল‘উইংস অফ ফায়ার’ এপিজে আবদুল কালামের প্রাথমিক জীবন এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে তাঁর অবদানকে আচ্ছাদন করে একটি অটোবায়োগ্রাফি।

একটি নম্র পটভূমির একটি ছেলের গল্প, যিনি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা তথা ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মূল কারিগর হয়েছিলেন এবং পরে ভারতের রাষ্ট্রপতি হন। বইটি ভারতে খুব জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি উপমহাদেশেও জনপ্রিয় হয় এবং একাধিক ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, প্রথমে বইটি ইংলিশ ভার্সনে পড়ে হালকা বোঝা ছিল পরে বাংলা অনুবাদ হওয়ায় বইটি আরো গভীরভাবে অনুধাবন করে পড়তে পারি।

উইংস অফ ফায়ারের প্রাথমিক অধ্যায়গুলি বেশি প্রাণবন্ত আর তার অসাধারণ উপস্থাপনার মাধ্যমে এটি ১৯৩০-১৯৫০ এর দশকগুলির ভারতবর্ষের সামাজিক, তৎকালীন ভারতীয় ধ্যনধারণা ও  বিজ্ঞান যাত্রার চিত্র তুলে ধরে।

আবদুল কালাম তামিলনাড়ুর দক্ষিণের ধর্মীয় শহর রামেশ্বরমে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে আবদুল কালামের একান্ত গুরু ধর্মপ্রাণ মমতাময়ী মা আর স্বচ্ছ জ্ঞানসম্পন্ন পিতাকে ; ভারত বিভাগের পূর্বে বিদ্যমান ধর্মীয় সম্প্রীতির এক আকর্ষণীয় ঝলক পাওয়া যায় প্রথমে –

“বিখ্যাত শিব মন্দির, যা রামেশ্বরমকে তীর্থযাত্রীদের কাছে এত পবিত্র করে তুলেছিল, আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দশ মিনিটের পথ ধরে। আমরা মুসলমান  ছিলাম, তবে বেশ কয়েকটি হিন্দু পরিবারও ছিল, তারাও মুসলিম প্রতিবেশীদের সাথে মিলেমিশে সুখ-দুঃখে একইসাথে জীবনযাপন করত।”

উইংস অফ ফায়ারএপিজে কালামের প্রকৃত নাম ছিল আভুল পাকির জয়নুল আবেদিন আবদুল কালাম। রামেশ্বরম মন্দিরের মহাযাজক পাকশী লক্ষ্মণ স্যাস্ত্রি কালামের বাবার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তার শৈশবকালীন সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতিগুলির মধ্যে ধর্মীয় আবেশে আধ্যাত্মিক বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করা।

আবদুল কালাম যখন  রামেশ্বরম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন  তখন একজন নতুন শিক্ষক তাঁর ক্লাসে আসেন। তার ভাষায়- ‘আমি একটি ক্যাপ পরিধান করতাম যা আমাকে মুসলমান হিসাবে চিহ্নিত করেছিল এবং আমি সর্বদা রমনাদ সাস্ট্রির পাশের সামনের সারিতে বসে থাকতাম, নতুন শিক্ষক কোনও মুসলিম ছেলের সাথে বসে কোনও হিন্দু পুরোহিতের ছেলেকে শিক্ষা দেননি আগে। নতুন শিক্ষক যেমনটি দেখেছিলেন তেমনি আমাদের সামাজিক র‌্যাঙ্কিং অনুসারে আমাকে পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বসতে বলা হয়েছিল। আমি খুব দু: খিত অনুভব করেছি। আমি শেষ সারিতে আমার সিটে সরে যাওয়ার সাথে সাথে নিজেকে একেবারে নিচু লাগছিল। স্কুলের পরে, আমরা বাড়িতে গিয়ে ঘটনাটি আমাদের স্ব-স্ব অভিভাবকদের জানিয়েছিলাম।

লক্ষ্মণ সাস্ত্রি পরবর্তীতে ওই শিক্ষককে ডেকে পাঠিয় সবার উপস্থিতিতে  বলেছিলেন যে নিরীহ শিশুদের মনে সামাজিক অসমতা এবং সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার বিষ ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। সেই যে শিক্ষা তার মনে গেথেছিল পরবর্তী সারাটাজীবন তিনি ভারতবর্ষের জন্য নিবেদন করে গিয়েছেন। এই চিত্র থেকে তৎকালীন ভারতবর্ষের সামাজিক চিত্র অনেকটা অনুধাবন করা যায়।

কালাম বিমান বাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন তবে তিনি সেটা পারেননি। এই ব্যর্থতার পরে তিনি স্বামী শিবানন্দের সাথে দেখা করেছিলেন এবং একটি উপদেশ পান-

“আপনার নিয়তি গ্রহণ করুন এবং আপনার জীবন নিয়ে এগিয়ে যান। আপনার বিমান বাহিনীর পাইলট হওয়ার নিয়তি নেই। আপনি যা হওয়ার জন্য নির্ধারিত তা এখন প্রকাশ করা হয়নি তবে এটি পূর্বনির্ধারিত। এই ব্যর্থতাটিকে ভুলে যান, কারণ আপনাকে আপনার নির্ধারিত পথে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য ছিল। পরিবর্তে, আপনার অস্তিত্বের সত্যিকার উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান করুন। নিজের সাথে এক হয়ে যান, নিজেকে ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করুন।”

পরে তিনি ঠিকই ভারতীয় মহাকাশ গবেষণায় চলে আসেন। রকেট উৎক্ষেপণের কৌশল শোনার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ হিসাবে ১৯৬৩ সালে, কালাম  নাসায়  যান। সেখানে তিনি ভারতবর্ষকে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য একটি প্রতিকৃতি দেখান  যা টিপু সুলতানের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রকেট যুদ্ধকে চিত্রিত করেছিল।

অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনিই সৃষ্টি করেছিলেন ভারতের প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পটভূমি।দেশীয় মেধাদের কাজে লাগিয়ে ১৯৮০ সালে সংগঠিত শক্তির সুন্দর প্রয়োগের মাধ্যমে ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ পরীক্ষা সফল ভাবে সম্পন্ন হয়।৷৷বইটিতে ভারতের উপগ্রহ এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি (এসএলভি -৩, পৃথ্বী, অগ্নি, থ্রিসুল, আকাশ এবং নাগ) সম্পর্কিত প্রচুর তথ্য এবং প্রযুক্তিগত বিবরণ রয়েছে “দৃশ্যের পিছনে”। মানুষের জীবনের বিশেষ বিশেষ কাজ- যেগুলো মানুষকে বছরের পর বছর ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় বরণীয় করে রাখে, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক বছরের সীমা অতিক্রান্ত স্বপ্ন দেখা, অনেক রাত জাগা গল্প, অনেক ব্যর্থতার বেদনা আর কিছু শক্তিশালী উদ্যোগ। জীবনের অনেক সময় মনে হতে পারে হয়তো বা সকল আশার আলো, আধারে পরিণত হয়ে গিয়েছে। সমস্ত অর্জন মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু যারা সত্যিকারেই কোন কিছু চেয়েছে- তারা সেইসব ধ্বংসস্তূপ থেকে খুঁজে নেয় সফলতার পরবর্তী  সোপান। সফলতাকে বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। আমার মতে সফলতা হলো পরিপূর্ণ আত্মতৃপ্তি। উইংস অফ ফায়ারের মাধ্যমে আমরা এমন কিছু উজ্জ্বল মানুষকে দেখি যারা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার পিছনে কাজ করেছিলেন যেমন বিক্রম সারাভাই এবং ডঃ ব্রহ্ম প্রকাশ!

আবদুল কালাম ও তার সহকর্মীদের একাত্মবোধ এবং দেশ প্রেম তাদেরকে নিজ স্বপ্নের পূর্ণতা দেখিয়েছিল। ভারতের রকেট বিজ্ঞানে ভবিষ্যতের দ্বার বিশালভাবে উন্মুক্ত হয়েছিল। আবদুল কালামের জীবনের মধ্যে দিয়ে আমরা খুঁজে পাই একজন পুত্র, একজন ভাই, একজন বন্ধু, একজন ছাত্র, একজন কর্মী, একজন নেতা ও একজন দেশপ্রেমিকের আদর্শ। তার জীবন যে কারো কাছে হতে পারে অনুপ্রেরণার এক বিশাল সমুদ্র। ত্যাগ, ধৈর্য্য, বিশ্বাস ও সাহসের সমন্বয় যেকোনো অসাধ্যকে সাধন করতে পারে- যেকোনো স্বপ্নকে করতে পারে বাস্তব – আবদুল কালামের জীবনী আমাদের সেই শিক্ষাটাই দেয়।

তবে প্রযুক্তিগতভাবে পাঠকদের আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে কিন্তু আবদুল  কালামকে জানতে বা তার নীতিগুলি বা ধারনাগুলো জানতে বইটি  পাঠকদের পুরোপুরি সাহায্যকরে না। মহাকাশ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রামগুলি বিশাল জটিল প্রকল্প এবং সেগুলি পরিচালনা করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের। বইটি কালাম কর্তৃক গৃহীত অংশগ্রহণমূলক পরিচালনার কৌশল সম্পর্কে একটি ঝলক দেয়, তবে একই সাথে এটি বিশদে যায় না। ‘উইংস অব ফায়ার’  কালামের ব্যক্তিগত জীবনকে কেবল সংক্ষেপে তুলে ধরে যা একটি আত্মজীবনীর পক্ষে অতটা উপযুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা কেন জানি না যে তিনি কেন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বা মহাকাশ গবেষণার বাইরে তাঁর ক্রিয়াকলাপগুলি।

এপিজে আবদুল কালাম ছিলেন একজন কবি এবং কবিতার বিশাল অনুরাগী। বইটিতে তাঁর নিজস্ব কবিতা এবং তাঁর প্রিয় কবিতা রয়েছে। এখানে একটি অসাধারণ লাইন- ‘অশুভকে প্রতিরোধ করতে বা আপনার শক্তি প্রদর্শনের জন্য র্ধ্বমুখী নির্দেশিত সত্তা হিসাবে অগ্নিকে দেখবেন না’।

বই জুড়ে যে বিষয়গুলি দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে একটি হল কালামের ইতিবাচক চিন্তাভাবনা। তিনি বিভিন্ন সংস্থায় অনেক উচ্চ পদে পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তবুও বইটিতে তিনি আমলাতন্ত্র বা রাজনীতিবিদদের অনিয়ম সম্পর্কে খুব কমই উল্লেখ করেছেন। তার সাফল্যের রহস্যটি তার চারপাশে নেতিবাচক বিষয়গুলি উপেক্ষা করার ক্ষমতা বলে মনে হয়। এপিজে আবদুল কালাম সর্বোপরি একজন সাধারণ, ধর্মনিরপেক্ষ, অনুপ্রেরণামূলক মানবতাবাদী মানুষ ছিলেন।৷ একটি জাতির কিংবা একটি দেশের ভাগ্য বদলে দেওয়া এই সকল মানুষদের জীবনী অসাধারণমহিমায় ভাস্বর হয়। আবদুল কালামের এই বইটি একটি প্রেরণার।  জীবনের যেকোন জায়গা থেকেই ঘুরে দাড়ানো সম্ভব। শুধু আমাদের জানতে হবে ঠিক কোন দিকে ঘুরে দাড়ালে জীবনটা আসলেই চমৎকার হয়ে যাবে। আবদুল কালাম রকেট বিজ্ঞানে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তিনি রেখে যান নি কোন বংশধর। আর তাই এই মহান ত্যাগ ও অর্জনই তাকে দিয়েছে মিসাইল ম্যানের উপাধি – যা অসম্ভব রকম যথার্থ।


লেখক পরিচিতি: সমীর কুমার মণ্ডল

  • সেশনঃ ২০১৬-১৭, তৃতীয় বর্ষ,
  • ইনফরমেশন সায়েন্স এন্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close