Blog Post

বার্মিংহামের স্মৃতিকথা: শেষ পর্ব (সাউথহ্যামের পথে)

আসিফ মাহতাব পাভেল

ইংল্যান্ডের আকাশ বেশিরভাগ সময় মেঘাচ্ছন্ন থাকে এমনটাই জানতাম। এখানে এসে মনে হলো কথাটা হয় আংশিক সত্যি। আকাশ কখনও মেঘলা ঠিকই, তবে ঝকঝকে নীল আকাশও দৃষ্টিকে মুগ্ধ করে চলেছে। ধুলোমুক্ত বিশুদ্ধ প্রকৃতি অক্সিজেনের প্রাচুর্যতায় পরিপূর্ণ।

বড় হাইওয়ে থেকে বের হয়ে কখনও ছোট রাস্তা, কখনও গলির রাস্তা ধরে আমাদের বাস চলছিল হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরির উদ্দেশ্যে। বাসের জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে মফস্বলের (স্থানীয়দের ভাষায় গ্রাম) দোকানগুলো চোখে পড়ছিল। কাঁচ দিয়ে ঘেরা দোকানগুলো দেখলে মনে হবে উপমহাদেশের ছোট কোন শহরে মধ্যে দিয়ে বাস চলছে। উপমহাদেশীয় শাড়ি-কাপড়ের দোকানই বেশি চোখে পড়লো। সাথে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আর খাবারের দোকান। খাবারের দোকানগুলোর বেশিরভাগই ইন্ডিয়ান। হিন্দি আর ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড দেখা গেল বেশ কয়েকটি। রাস্তার পাশে যে মানুষগুলো দেখা যাচ্ছে, তারা হয় শিখ অথবা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। দেখতে দেখতে হঠাৎ এক জায়গায় বাস থামলো। মেইন সড়কের পাশেই আমরা এক এক করে নামলাম।

এখানকার লাইব্রেরিয়ান মহিলাটি সুন্দরী এবং হাসিখুশি টাইপের। তিনি আমাদের কাঁচে আবদ্ধ একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরটা ক্লাশরুমের মতো। পরে জেনেছি, স্থানীয় কমিউনিটির যাবতীয় সভা-আলোচনা এখানেই হয়। বিভিন্ন ধরণের ট্রেইনিং কোর্সের ক্লাশও এখানে অনুষ্ঠিত হয়। লাইব্রেরিয়ান আমদেরকে তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দিলেন। আমরা লাইব্রেরির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখলাম। ছোট্ট লাইব্রেরি কিন্তু কালেকশন ভালো। বিভিন্ন ভাষা ও সংষ্কৃতির বই আছে এখানে। সবচেয়ে ভালো লাগলো বাংলা ভাষার বইয়ের কর্নার দেখে। লেখা আছে ‘বাংলায় বই’। বাংলায় বই- লেখাটা ব্যকরণসম্মত কিনা এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে যুক্তি-তর্ক শুরু হলো। আমি অবশ্য ক্ষুদ্র জ্ঞান নিয়ে সেই যুক্তি-তর্কে অংশগ্রহণের সাহস করলাম না। বরং লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রম দেখতে লাগলাম। এখানকার কমিউনিটিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান আর ভারতের মানুষ বেশী থাকায় উপমহাদেশীয়দের জন্য উল্লেখযোগ্য পাঠসামগ্রী সংগ্রহ করা হয়েছে।

হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরিতে বাংলা বইয়ের সেল্ফ
হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরিতে বাংলা বইয়ের সেল্ফ
সফরকারীদের হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরি সম্পর্কে বর্ণনা করছেন সেখানকার লাইব্রেরিয়ান
সফরকারীদের হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরি সম্পর্কে বর্ণনা করছেন সেখানকার লাইব্রেরিয়ান

লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনার জন্য এখানে একটি কাস্টমাইজ্ড সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। ছোট্ট একটা ইন্টারনেট কর্নার আছে আরও আছে মুভি কর্নার যেখানে বসে বিভিন্ন ভাষার সিনেমাসহ নানা রকমের অডিও-ভিজ্যুয়াল সামগ্রী উপভোগ করা যায়। লাইব্রেরির কার্যক্রম দেখা শেষে আমরা আবার সভাকক্ষে গিয়ে বসলাম। লাইব্রেরিয়ান আমাদের জন্য কেক, বিস্কুট এবং কফি দিয়ে আপ্যায়িত করলেন। খাবারগুলো বেশ সুস্বাদু ছিল যা বাড়িতে তৈরি বলে জানলাম। আমাদের কয়েকজনের ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলো। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে সহজগম্যতা (easy access) থাকলেও, বাথরুমের ক্ষেত্রে তালা-চাবি পদ্ধতি। লাইব্রেরি-কর্মীদের জানাতে তাদের একজন বেশ কিছুক্ষণ পরে চাবি নিয়ে আসলেন। তালাবদ্ধ ওয়াশরুম কিন্তু পরিচ্ছন্নিআর ছিমছাম। লাইব্রেরিজ আনলিমিটেডের পক্ষ থেকে আমাদের সিনিয়র কর্মকর্তাগণ হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ানকে সৌজন্য উপহার দিলেন। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের উপপরিচালক জনাব হরেন্দ্রনাাথ বসু তাঁর প্রকাশিত বই লাইব্রেরিতে উপহার দিলেন। লাইব্রেরিজ আনলিমিটেডের নির্দেশনা থাকায় আমরা ইংল্যান্ডের লাইব্রেরিগুলোর জন্য কোন উপহার নিয়ে যাইনি। তাই বসু স্যারের নিয়ে যাওয়া বইগুলো ছিল গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পক্ষে আমাদের মুখরক্ষার অবলম্বন কারণ ওখানকার প্রায় সব লাইব্রেরিই ছিল আতিথিয়তাপূর্ণ। হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরি থেকে বিদায় নিলাম।

হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরির অডিও-ভিজ্যুয়াল কক্ষের একটি মনিটর
                                                               হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরির অডিও-ভিজ্যুয়াল কক্ষের একটি মনিটর
হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান কে সৌজন্য উপহার দিচ্ছেন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ
             হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান কে সৌজন্য উপহার দিচ্ছেন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ

আমরা আবারও বাসে চড়ে বসলাম। এখান থেকে একান্ন কিলোমিটার দূরে সাউথহ্যামে আমাদের দুপুরের লাঞ্চ এবং দিনের শেষ লাইব্রেরি পরিদর্শন। বাসটি সাউথহ্যামের দিকে রওনা দিল। দু’পাশে বিস্তীর্ণ কৃষি জমি আর খামার। খামারগুলোতে ভেড়ার পালই বেশী চোখে পড়লো। রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যা অনেক বেশী হলেও রাস্তার দুই পাশে খুব কম মানুষ। প্রায় ঘণ্টাখানেক যাত্রা শেষে আমরা সাউথহ্যামে গিয়ে পৌঁছালাম। মফস্বলের আদলে গড়া সাউথহ্যাম শহরটি বার্মিংহাম থেকে বেশ দূরেই বলা যায় এবং যে রাস্তা দিয়ে আমরা এলাম তা প্রায় জনমানব শুন্য। আমরা যখন সাউথহ্যামে পৌঁছালাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার পথে। বাস থেকে নেমে কেউ কেউ দুপুরের নামাজের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি লাইব্রেরির বাইরের গেলাম আশেপাশের দৃশ্য দেখার জন্য। বেশ পুরোনো একটা চার্চ চোখে পড়লো। এলাকায় ওটাই মনে হয় সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং। চার্চটি দেখে উপমহাদেশের পুরোনো মন্দিরের কথা মনে পড়ে গেল যেগুলো আশেপাশের এলাকার মধ্যে সবচেয়ে উঁচু হতো একসময়। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের মসজিদগুলোও এখন সুরম্য ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে থাকে।

সাউথহ্যাম চার্চের সম্মুখে সহকর্মীর সাথে লেখক
সাউথহ্যাম চার্চের সম্মুখে সহকর্মীর সাথে লেখক
সাউথহ্যাম লাইব্রেরির প্রবেশমুখে লাইব্রেরি ব্যবহারের নির্দেশনা
সাউথহ্যাম লাইব্রেরির প্রবেশমুখে লাইব্রেরি ব্যবহারের নির্দেশনা

লাইব্রেরি ভবনের ভেতরে ঢুকে দেখি লাঞ্চ শুরু হয়ে গেছে। মেনুতে রয়েছে স্যান্ডউইচ, সামুচা, কেক, আপেল আর কফি। খেতে খেতে আমাদের মেন্টর আইয়ুব খান কাউন্টি লাইব্রেরি নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা দিলেন। সম্ভবত সাতাশটি লাইব্রেরি নিয়ে এই নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। সাউথহ্যাম লাইব্রেরি ভবনে একটি কমিউনিটি সেন্টার রয়েছে। মধ্যহ্নভোজের পরে আমরা পাঠকক্ষে প্রবেশ করলাম। মফস্বল এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হলেও আধুনিক সব সুবিধা এই লাইব্রেরিতে রয়েছে। বইগুলোতে আরএফআইডি ট্যাগ লাগানো।

সাউথহ্যাম লাইব্রেরির প্রবেশদ্বার
 সাউথহ্যাম লাইব্রেরির প্রবেশদ্বার

গভীর মনোযোগ দিয়ে লাইব্রেরির স্বয়ংক্রিয় বই লেনদেন ব্যবস্থা দেখছিলাম, এমন সময় সাদা চামড়ার এক ভদ্রলোক এসে জিজ্ঞেস করলেন,

– তুমিই কি আজকের প্রশিক্ষক?
– মাফ করবে, আমি তোমার কথা বুঝতে পারিনি। আমি বললাম।
– আজকে কি তোমার প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা?
– দেখ আমি অন্য দেশ থেকে এসেছি লাইব্রেরি পরিদর্শনের জন্য। দয়া করে একটু বুঝিয়ে বলবে তুমি কিসের প্রশিক্ষণের বিষয়ে জানতে চাচ্ছো?
– ঐ যে ফুটফুটে বালককে দেখছো, ওটা আমার ছেলে, ওকে নিয়ে এসেছি গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশিক্ষণের জন্য। শিশু কর্নারে বসে থাকা একটি ছেলেকে দেখিয়ে লোকটি বলল।
– বাহ বেশতো! আমার মনে হয়, তুমি এখানকার লাইব্রেরি-কর্মীকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবে। হাসিমুখে বললাম।

লাইব্রেরির কর্মরত একজন এগিয়ে এসে লোকটির সাথে কথা বলল। তাদের কথোপকথনে যা বুঝলাম তা হলো, এখানে লাইব্রেরি সেবার সাথে সাথে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এইসব প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষকরা আসে প্রশিক্ষণ দিতে। আরও জানা গেল যে লাইব্রেরির তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক আছে, যারা টিউশন (ক্লাশের হোম ওয়ার্ক) সেবা দিয়ে থাকে বিনামূল্যে।

লাইব্রেরিতে অনলাইন সিটিকাউন্সিল সার্ভিস
লাইব্রেরিতে অনলাইন সিটিকাউন্সিল সার্ভিস

লাইব্রেরির কর্মকর্তা আমাদের একটি বিশেষ সাউন্ডপ্রুফ রুমে নিয়ে গেলেন। এখানে ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে দূরবর্তী সিটি কাউন্সিলের বিভিন্ন ধরণের সার্টিফিকেট সেবা প্রদান করা হয়। আমাদের সামনেই তিনি সিটি কাউন্সিলের এক মহিলা কর্মকর্তার সাথে ভিডিওতে কথা বললেন এবং একটি সনদ নেয়ার পদ্ধতি দেখালেন। আমরা দেখলাম, কিছু ডামি তথ্য নিয়ে অনলাইনে সরাসরি ডামি নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট দেয়া হলো। যা প্রিন্ট করে ব্যবহার করা যায়। আমাদের মধ্যে একজন জানতে চাইলেন এটাতো ঘরে বসেই করা সম্ভব, তাহলে লাইব্রেরিতে এই সেবাটি কেন দেয়া হয়? লাইব্রেরির কর্মকর্তা জানালেন যে, আইনগতভাবে লাইব্রেরিতেই এই সেবাটি অনুমোদিত এবং স্থানীয় নাগরিকরা এখানেই সেবাটি গ্রহণে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সার্টিফিকেট ছাড়াও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন, ডকুমেন্ট সত্যায়নের কাজও লাইব্রেরিতে করা যায়।

লাইব্রেরির এক কোনায় ‘Love your library’ লেখা একটি সাইনবোর্ডের নিচে কিছু নতুন-পুরাতন বই বিক্রি হচ্ছিল। কর্তৃপক্ষ জানালেন যে, যেসব বই লাইব্রেরিতে কম ব্যবহার হয় বা যেগুলোর চাহিদা নেই সেগুলোকে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করা হয়। আমি মনে মনে ভাবলাম, আমাদের দেশে একটি বইকে লাইব্রেরিতে ঢোকানো তূলনামূলক যতটা সহজ, বইটি ব্যবহারের অযোগ্য হলেও তা লাইব্রেরি থেকে সরিয়ে ফেলা ততটাই কষ্টসাধ্য একটি ব্যাপার।

LOVE YOUR LIBRARY

আমরা লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসে উঠলাম ততক্ষণে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। বার্মিংহামে আমাদের আজেকেই শেষ দিন। সকলেই কম-বেশী ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। রাত আটটায় ট্রেনে উঠতে হবে, পরবর্তী গন্তব্য স্বপ্নের শহর লন্ডন।

[ঘটনাকাল নভেম্বর, ২০১৭]

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close