Blog Post

বার্মিংহামের স্মৃতিকথা : পর্ব-৩ (অন্ধকারে বন্দী সময়)

আসিফ মাহতাব পাভেল

লাইব্রেরি অব বার্মিংহামের আরও অনেক কর্নার দেখা বাকি ছিল তার পরেও পরিদর্শন দ্রুত সম্পন্ন করতে হলো। একদিনে দূরবর্তী আরও দু’টি লাইব্রেরি পরিদর্শন করার সূচি থাকায় এই সংক্ষেপন। পরবর্তী গন্তব্য ছিল হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরি এবং দিন শেষে সাউথহ্যাম। আমার অবশ্য বার বার মনে হচ্ছিল আরও খানিকটা সময় যদি এই লাইব্রেরি অব বার্মিংহামে কাটারো যেত! আমাদের দলনেতা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মাননীয় মন্ত্রীর পিএস ও উপসচিব কেরামত আলী স্যার। তিনি সবাইকে লাইব্রেরির পেছনের খোলা স্থানে সমাবেত হওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। আমাদের কেউ কেউ তখনও সেলফি তুলতে ব্যস্ত।

বাইরে বেশ ঠাণ্ডা পড়েছিল। ঠাণ্ডা আবহাওয়া আর বেশী বেশী আপেল জুস খাওয়ার কারণে আমার বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছিল। এদিকে হাতে সময় কম থাকার কারণে লাইব্রেরি অব বার্মিংহামের ওয়াশরুম ব্যবহার করা সম্ভব হলো না।

আমি তাপস দাকে জিজ্ঞেস করলাম,

– দাদা, হ্যান্ডসওয়ার্থ লাইব্রেরিতে যেতে কতক্ষণ লাগবে?
– আমিতো ভাই নিশ্চিত নই, তবে ২০-২৫ মিনিট লাগতে পারে। তাপস দা বললেন।

হ্যান্ডসওয়ার্থ আর সাউথহ্যাম ভিজিটের জন্য আমাদের স্পনসর লাইব্রেরিজ আনলিমিটেড প্রকল্প থেকে একটি বাস ভাড়া করা হয়েছিল। বাসটি আমদের সামনে আসতেই আমরা এক এক করে বাসে উঠলাম। বেশ বড় সাইজের বাস কিন্তু আমরা যাত্রী ছিলাম মাত্র ১৬ জন। সবাই একটু দূরত্ব বজায় রেখে আয়েশী ভঙ্গিতে আসন গ্রহণ করল। আমি অবশ্য একটু আঁটোসাটো হয়ে বসলাম। কখন কোথায় বাথরুমে গিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটাবো, সেই চিন্তায় বুঁদ হয়ে রইলাম। আমাদের দেশ হলে একটু আড়াল-আবডাল পেলেই প্রয়োজন মেটানো যায়। কিন্তু এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে সেটা চিন্তাই করা যাচ্ছে না। রাস্তার দু’পাশের দৃশ্যাবলী কিছুতেই উপভোগ করতে পারছিলাম না। এমন সময় বাসে একটা ছোট্ট বুথের মতো চোখে পড়লো আমার, সেখানে কিছু একটা লেখা রয়েছে। দূর থেকে লেখাটা পড়া যাচ্ছিল না।

আমি কৌতুহলবোধ করে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। লেখাটা পড়েই উল্লাসিত হলাম। কারণ ছোট্ট এই বুথের দরজায় লেখা রয়েছে ‘Toilet’। আমাদের দেশে এরকম চলন্ত বাসে টয়লেটের সমাবেশ অন্ততঃ আমার আমার চোখে পড়েনি। প্রয়োজন সারবার জন্য দেরী না করেই ভেতরে প্রবেশ করলাম এবং দরজা লক করতেই মনে হলো বিরাট একটা ভুল করে বসেছি। দরজা বন্ধ করতেই নিকষ অন্ধকারে হারিয়ে গেলাম। একটু আলোর জন্য চারপাশ হাতড়াতে লাগলাম। মনে হলো কফিনের মধ্যে বন্দী হয়ে আছি। আমি দরজার লক বা হাতল কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। নিজের বোকামীতে চরম রাগ হতে লাগল। আমি যে এই কফিনের ভেতরে আটকা পড়েছি সেটা কারও ভাবনায় আসার কথা না। সবাই ভিনদেশের চারপাশের দৃশ্য উপভোগে ব্যস্ত ছিল। আমার হার্টবিট এমনিতেই বেশী, এ অবস্থায় তা আরও বেড়ে গেলো। মনে হলো অনন্ত সময় যেন পার হয়ে যাচ্ছে। কেউ কখনও আর আমাকে খুঁজে পাবে না। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। কতক্ষণ পরে জানি না, চিৎকার দেয়া শুরু করলাম। বাইরে সবাই তখনও নিজেদের নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে ব্যস্ত। আমি তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম ঠিকই কিন্তু কেউ মনে হয় আমার চিৎকার শুনতে পাচ্ছিল না। আমি আবারও চিৎকার করলাম। তবুও কারও সাড়া পেলাম না। অনেক সময় ঘুমের মধ্যে এরকম হয় চিৎকার করি কিন্তু কেউ শুনতে পায় না, নিজের হাত-পা পর্যন্ত নড়ানো যায় না, আঞ্চলিক ভাষায় এ পরিস্থিতিকে ‘বোবায় ধরা’ বলে। আমার তখন সেই বোবায় ধরার পরিস্থিতি। আমার পকেটে মোবাইল থাকলেও সেটা ব্যবহারের কথা সেই মুহুর্তে ঘুণাক্ষরেও মনে আসেনি।

এক একটি সেকেন্ড, এক ঘণ্টার সমান মনে হতে লাগল। একটু পরে আবারও চিৎকার করলাম, সাথে দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিতে থাকলাম। অনেকক্ষণ পরে (অন্ততঃ আমার কাছে তাই মনে হলো) কক্সবাজারের লাইব্রেরিয়ান ঋশিকেশ পালের গলা শুনতে পেলাম,

– এর মধ্যে কে যেন আছে! ঋশিকেশ অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলল মনে হলো।
– ঋশিকেশ আমি আটকা পড়েছি! যতটা পারা যায় চিৎকার করলাম।
– কে, আসিফ স্যার নাকি?
– হ্যাঁ, আমি মারা যাচ্ছি!
– স্যার, একটু অপেক্ষা করেন, দেখি কী করা যায়!
– যা করার তাড়াতাড়ি করো ভাই!
ঋশির শব্দ পেলাম না। আমি তখন ঘেমে ভিজে উঠেছি। তবে বাইরে গুঞ্জন শুনতে পেলাম একটু পরে একজন বিদেশীর কণ্ঠ শুনতে পেলাম,
– তুমি ঠিক আছো?
– না, আমি আটকা পড়েছি!
– ভেতরে দরজার নবটি ঘোরাও, খুলে যাবে।
– ভেতরে ভীষণ অন্ধকার, আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
– দুই সেকেন্ড অপেক্ষা করো।

বাইরে নিরবতা। বিদেশীটা মনে হয় চলে গেল কোথাও। একটুপরেই গাড়ি কাঁপিয়ে ইঞ্জিন চালু হওয়ার শব্দ শুনলাম এবং তখনই আলো জ্বলে উঠল। আমি দরজা খুলতেই কতগুলো উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পেলাম। একটি মুখ আমার পরিচিত নয়। কালো এই অপরিচিত মুখটিই প্রথমে কথা বলল,

– তুমি ঠিক আছো তো?
– হ্যাঁ এখন ঠিক আছি, ধন্যবাদ।
– আমি দুঃখিত, তুমি আটকে পড়েছো, কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। আরও আগে গাড়ি স্টার্ট দিলে তোমাকে অন্ধকারে থাকতে হতো না।
– তোমার দুঃখিত হওয়ার কোন কারণ নেই। আমি বোকার মতো না বুঝে বাথরুম ব্যবহার করেছি।
– যাক গে, এখন আর ভয় নেই, তোমার ইচ্ছে মতো এটা ব্যবহার করতে পারো।

ভেতরে ভেতরে খুবই বিব্রতবোধ করলাম, কতগুলো মানুষকে টেনশনে ফেলে দেয়ার কারণে। ভাগ্যিস ঋশি পাল শুনতে পেয়েছিল না হলে কী হতো কে জানে! আমার সিনিয়র কয়েকজনকে দেখে মনে হলো, তারা বিষয়টি টের পায়নি। আমি স্বস্তি নিয়ে জানালার পাশে একটি সিটে বসে বিলেতের লাল-নীল-সাদা-কালো দৃশ্য উপভোগ করা শুরু করে দিলাম। গন্তব্য হ্যান্ডসওয়ার্থ কাউন্টি লাইব্রেরি।

[ঘটনাকাল নভেম্বর, ২০১৭]


বার্মিংহাম লাই্রব্রেরির আট তলার উন্মুক্ত প্লাজা
                                                                           বার্মিংহাম লাই্রব্রেরির আট তলার উন্মুক্ত প্লাজা
দূরত্ব বজায় রেখে আয়েশী ভঙ্গিতে সফরসঙ্গীরা
                                                                        দূরত্ব বজায় রেখে আয়েশী ভঙ্গিতে সফরসঙ্গীরা
বাস ছাড়ার পূর্ব মুহুর্ত
                                                                                                              বাস ছাড়ার পূর্ব মুহুর্ত
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close