Blog Post

বই বনাম দাসত্বের মুক্তি

মাহাবুবা আক্তার

‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমায় সৃষ্টি করেছেন’ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা এরশাদ করেছেন। জ্ঞান অর্জনের জন্য বই এর বিকল্প আদৌ পৃথিবীতে আবিষ্কার হয়নি আর হবেও না ।শুধু জ্ঞান লাভের প্ল্যাটফর্ম বিভিন্নভাবে পরিবর্তন হয়েছে মাত্র।

বিশ্বের বিখ্যাত দার্শনিক থেলিস,  প্লেটো,  এরিস্টটল ইরাটোস্থিনিস,  ইবনেসিনা,  ম্যাকিয়াভেলি হতে অদ্যাবধি কাউকে পাবেন না যিনি বই এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। তাদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান বিতরণ। মানুষের উপকার সাধন ,আজ আমরা প্রযুক্তির ছোয়ায় বইকে প্রায়ই ভুলে গেছি।

খৃষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীকে এমনি এক রাজা ছিলেন মিশরের প্রথম ফারাও নামে যার নাম দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফিয়াস। টলেমি ছিলেন রাণী ক্লিওপেট্টার পূর্বপূরুষ।শুধু রাজা ক্ষমতাবান বললে ভুল হবে,  রাজা ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী । রাজাদের রাজ্য জয়ের খবর আমরা শুনেছি কিন্তু বই এর রাজ্যের রাজা হিসেবেই দ্বিতীয় টলেমিকে পৃথিবীর অন্য রাজাদের থেকে পৃথক করেছে। গ্রীক মহাবীর আলেকজান্ডারের বন্ধু ও সেনাপ্রধান ছিলেন টলেমি। পিতার মৃত্যুর পরে সাম্রাজ্যের দায়িত্বভার তার টলেমির হাতে পরে।

পিতার তৈরি মিউজিয়ামে ছোটবেলায় বেশিরভাগ সময় কাটত তাঁর । মিউজিয়ামের ভিতরেই ছিল সুদৃশ্যমান একটা লাইব্রেরি । বই এর মধ্যে ডুবে থাকতেই বই সংগ্রহের নেশা জাগে তাঁর।

মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া রাজ গ্রন্থাগার, এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ওগুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগার নামে পরিচিত ছিল এটি। এটি এমনি এমনি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা হয়নি,  এর পিছনে রয়েছে রাজা দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফিয়াসের অগাধ পাণ্ডিত্য ও দুরদর্শীতা।


মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া রাজ গ্রন্থাগার, এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ওগুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগার নামে পরিচিত ছিল এটি। এটি এমনি এমনি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা হয়নি, এর পিছনে রয়েছে রাজা দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফিয়াসের অগাধ পাণ্ডিত্য ও দুরদর্শীতা।


বাল্যকালে পড়াশোনা করতেন এই লাইব্রেরিতে। এভাবেই বই সংগ্রহের নেশা তৈরি হয় তাঁর। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে তিনি ভাবেন কিভাবে এই লাইব্রেরিটিকে সমৃদ্ধ করা যায়। নিজের রাজ্যের বইপ্রেমি মানুষদের যত বই ছিল ,সব সংগ্রহ করলেন। বিনিময়ে তাদের নকল কপি দেয়া হলো। ধীরে ধীরে রাজ্যের বাইরে থেকে বই সংগ্রহ করার জন্য দূত নিয়োগ করলেন। রাজ্যের বাইরে থেকে সেনারা আসলে তাদের কাছে বই আছে কিনা তল্লাশী করা হতো। দেয়া হতো ডুপ্লিকেট বই। মেধাবী ও দক্ষ কারিগরদের দিয়ে তৈরি বই গুলো এত সুন্দরভাবে মোড়কে উপস্থাপন করতেন যে, তারা মূল বইয়ের কথা ভূলে যেতেন। মূল বইয়ের প্রতি আর আগ্রহ থাকতো না।

টলেমী ফিলাডেলফিয়াস বই সংগ্রহের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রাচীন মূল্যবান পুথি, বই,  বিভিন্ন আদি সংগ্রহশালা, বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহের জন্য নিয়োগ করলেন সে দেশের বিখ্যাত ও বিশ্বস্ত পর্যটকদের। পর্যটকদের বিভিন্ন দেশে অনায়াসে বিশ্বস্ত তথ্য দেয়া হয় যার কারণে তিনি পর্যটকদের কাজে লাগালেন। গঠন করলেন বই সন্ধানী টিম।


কৌশলী ও বিচক্ষণ রাজা দ্বিতীয় টলেমি নিলেন অভিনব উদ্যোগ। মিশরে তৎকালীন  লাখ লাখ যুদ্ধবন্দী ইহুদিরা ছিল। তিনি বন্দীরত দাসদের সেই দেশের রাজার কাছে প্রস্তাব পাঠালেন যদি বন্দীদের বিনিময়ে বই দেয়া হয়,  তাহলে ফিরিয়ে দেয়া হবে তাদের নিজ দেশে।


প্রাচীনকালে প্যাপিরাস গাছের পাতার কাণ্ড থেকে তৈরি এক ধরনের কাগজের উপরে লেখা  হতো বই। বিভিন্ন দেশের যেমন আরব,  গ্রীস,  রোম থেকে পর্যটক মিউজিয়াম ও গ্রন্থাগার দেখার জন্য ভিড় করতেন। রাজার সেই মিউজিয়ামে আসতেন সেই সময়ের জ্ঞানী, গুণী ছাত্ররা বিভিন্ন দেশ হতে। আসতেন ইউক্লিড,  ইরাটোস্থিনিসদের মতো প্রখ্যাত গুণীব্যক্তি। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁরা গবেষণা ও করতেন। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে গবেষণার জন্য আসতেন এই লাইব্রেরিতে। একদিকে বই পড়তো মানুষ, আরেকদিকে এই লাইব্রেরিতে বই তৈরি হতো। জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাড়ায় এই আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার,  ছড়িয়ে পড়ে এর সুনাম চারিদিকে। সর্বপ্রথম মৃত মানুষের শরীর ‍নিয়ে পরীক্ষা করা হয় এই লাইব্রেরিতে।

বই সন্ধানী টিমটি কিছুদিনের মধ্যে ইহুদিদের ওল্ড টেস্টামেন্ট এর সংগ্রহ করলেন। ধীরে ধীরে বই এর সংগ্রহ ৪ লাখের বেশি ছাড়িয়ে গেল। রাজা উপলব্ধি করলেন এটি লাইব্রেরি নয়,  এটি একটি রত্নভাণ্ডার হতে চলেছে।

কৌশলী ও বিচক্ষণ রাজা দ্বিতীয় টলেমি নিলেন অভিনব উদ্যোগ। মিশরে তৎকালীন  লাখ লাখ যুদ্ধবন্দী ইহুদিরা ছিল। তিনি বন্দীরত দাসদের সেই দেশের রাজার কাছে প্রস্তাব পাঠালেন যদি বন্দীদের বিনিময়ে বই দেয়া হয়,  তাহলে ফিরিয়ে দেয়া হবে তাদের নিজ দেশে। এভাবে ফেরত দিলেন ১ লাখ ২০ হাজার দাস। রাজা ফিলাডেলফিয়াস মিশরের দাশ মালিকদের ক্ষতিপূরণ বাবদ দিয়েছিলেন ৬০০ টালেন্ট বা ৬ লক্ষ ইউএস ডলারের সমান। বই এর জন্য দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে এটিই প্রথম ছিল।

৪ লাখের বেশি বই হওয়ায় আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি হতে ২য় আরেকটি লাইব্রেরিতে স্থানান্তর করেন কিছু বই যার নাম ছিল সেরাপিস দেব মন্দির। এভাবে সংগ্রহ কত হয়েছিল তার পরিমাণ নির্ধারণ করা ছিল দুষ্কর। প্যাপিরাস কাগজে সুন্দর নির্ভূলভাবে হাতের লেখায় তৈরি সোনার জলের অলংকরণে তৈরি হতো বই।

বিশ্বের বিধ্বংসী রাজারা প্রথমেই আক্রমণ করতো লাইব্রেরিতে, আলেকজান্দ্রিয়ার ভাগ্যেও ঘটেছিল এই চরম পরিণতি। জুলিয়াস সিজারের রাজত্বকালে লাইব্রেরিটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। ধ্বংস করে দেয়া হয় রাজা টলেমির তিলেতিলে গড়া রত্মগুলো। সর্বশেষ পোপ থিওফেলাসের নির্দেশে গ্রন্থাগারটিতে আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হয় ৩৯১  খ্রিষ্টপূর্বাব্দে।

রাজা ২য় টলেমি ফিলাডেলফিয়াস বই প্রেমীদের হৃদয়ে থাকবেন আজীবন চিরস্মরণীয়।


তথ্যসূত্রঃ

  • ১) রোর বাংলা
  • ২) en.wikipedia.org/wiki/Library_of_Alexandria
  • ৩) en.wikipedia.org/wiki/Ptolemy_II_Philadelphus
  • ৪) ancient-origins.net/ancient-places-africa-history-important-events/destruction-great-library-alexandria-001644
  • ৫) truth-zone.net/forum/history/65679-royal-library-of-alexandria-burned-to-ashes-do-you-all-believe-this.html
  • ৬) aetherforce.com/who-really-burned-the-library-of-alexandria-by-preston-chesser/
  • ৭) youtube.com/watch?v=omD9U4eXjzs

মাহাবুবা আক্তার

  • সহকারি লাইব্রেরিয়ান
  • জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, দিনাজপুর।
  • উত্তরবঙ্গ প্রতিনিধি, লাইব্রেরিয়ান ভয়েস।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close