Book Review

বুক রিভিউ : পথের পাঁচালী

ইশরাত জাহান

পথের পাঁচালী

লেখক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রথম প্রকাশ : মাসিক ‘বিচিত্রা’ (আষাঢ় ১৩৩৫-আশ্বিন ১৩৩৬)

গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশ : ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ


ইশরাত জাহান:ইশরাত জাহান

Book Review Bangla

ডঃ সৌমিত্র শেখর বলেছেন, “বিভূতিভূষণ দরিদ্র চরিত্রগুলোর সমাবেশ ঘটিয়ে কোন দুঃখগাঁথা তৈরি করতে চাননি। অথবা চান নি প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি বিপ্লব ঘটাতে। তিনি যুগের অস্থিরতায় না জড়িয়ে আবহমানকালের চিরস্থায়ী, চিরসাক্ষী এবং একটি পরিপূর্ণ সত্তা নিসর্গ প্রকৃতিকে অবলম্বন করলেন এ উপন্যাসে।”

সত্যিই তাই, জীবনানন্দের নিসর্গময় কাব্যভাষার গদ্যরূপ যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালী’। এতে কোনো কাব্যময়তা নেই, কিন্তু আছে অদ্ভূত ছন্দময়তা। যে সামাজিক প্রেক্ষাপটে গোটা উপন্যাসটি রূপায়িত, তার ব্যাপ্তি যেন কেবল প্রতি যুগের সাক্ষী শাশ্বত ঘটনাবলীতে নয়। চিরায়ত বাংলার সমস্ত রূপ রসই এই উপন্যাসের মনোমুগ্ধতার আধার। রাংচিতা, গুড়কলমী, রঙিন মাকাল ফল, ঘেঁটু, সোঁদালী, লেবু ফুলের মিষ্টি গন্ধ, গ্রাম্য বধূর ভিজে পায়ের ছাপ, কাশবন, পদ্মঝিল, দুই কিশোর- কিশোরীর দুরন্তপনা, অপার বিস্ময় আর তাদের  অনুসন্ধিৎসু চোখের অবাক করা নিশ্চুপ দৃষ্টি। উপন্যাসটি পড়ার সময় লেখকের বর্ণনাশৈলীর গুণে পাঠক সেই দৃষ্টিকে খুঁজে পাবেন ঠিক! সে নিশ্চুপ দৃষ্টির ভাষা যেন শব্দের চেয়েও জোরে কথা বলে! আর সেই ছবি শিল্পীর তুলিতে বিভূতিভূষণ এঁকেছেন ঠিক নির্ভুলভাবে। দূর অতীতের সাথে পল্লীবাংলার জীবনের গ্রামীণ যোগ দিয়ে  শুরু হওয়া উপন্যাসটির বর্ণনা ধীর। কাহিনীতে আচমকা চমক আনায় শিল্পীর কোনো আগ্রহ ছিলো না।পথের পাঁচালী কিন্তু উপন্যাসের বাক্যশৈলী ও চিত্রায়নে প্রকৃতির অন্তর্নিহিত রসভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিতে লেখক মনোযোগ দিয়েছেন ষোলআনা। আমাদের এই চিরায়ত বাংলার আশা-আকাঙ্ক্ষা, নৈরাশ্য-বেদনার ছবিসহ দারিদ্র্য লাঞ্চিত পল্লীগ্রামের বালক বালিকার মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণ করতে লেখক ছিলেন ব্যস্ত। গৃহস্থালি, পল্লীপথ, বনবাদাড়, মাঠঘাট,  আগাছা-পরগাছা ,পূজা-পার্বন প্রভৃতির ছবির সাথে ধীরে ধীরে করুণ রস নিষিক্ত করে কাহিনীর পরতে পরতে ঔপন্যাসিক সংযোজন করেছেন মানবজাতির আদি এক অনুভূতি – মায়া। যে প্রগাঢ় ভালোবাসা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাসের চরিত্রগুলিতে, অতি সাধারণ ঘটনাপ্রবাহেই পাঠকের মনে তা সঞ্চার করে গভীর মমত্ববোধ। এই মমত্ববোধ লেখকের গভীরতা সঞ্চারী চিত্রকল্পকে আর্দ্রতায় মিশিয়ে দেয় চরিত্রগুলির সাথে। ইছামতীর তীরে নিশ্চিন্দিপুর গাঁ এর ব্রাহ্মণ রায় পরিবারের দারিদ্র্যের সংগ্রাম, গ্রামীণ সংস্কারের আড়ম্বরতা, বৃটিশদের অধীনে গ্রাম্য সমাজের দশা, বিপরীতভাবেই অবস্থাপন্ন বাড়িগুলোতে চোখ টাঁটানো জাঁকজমক- আর সবকিছু ছাপিয়ে ক্রূর হাসি হেসেছে অমোঘ অদৃষ্ট। এরই মাঝে সপ্রতিভ এক বালকের জন্ম হতে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার পাঠশালায় হাতেখড়ি নেয়া। বোন দূর্গার হাত ধরে যে প্রকৃতিকে চিনতে শিখেছিলো ছোট্ট অপু, সেই প্রকৃতির মাঝেই যেন জড়িয়ে গিয়েছে তার অস্তিত্ব। তিন খন্ডের ৩৫ পরিচ্ছেদে বিভক্ত ( ‘বল্লালী-বালাই’, ৬টি পরিচ্ছেদ ; ‘আম আঁটির ভেঁপু’, ৪টি পরিচ্ছেদ; ‘অক্রূর সংবাদ’, ৫টি পরিচ্ছেদ) বিস্তৃত উপন্যাসটি পড়লে মনে হতে পারে মাঝের চার পরিচ্ছেদই এর প্রাণ। কিন্তু মূল দৃশ্যপট অঙ্কনের জন্য এবং তিনটি যুগ-স্থান-পাত্র যথাযথভাবে প্রকাশ করবার জন্য ইন্দির ঠাকরুনের পরিণতি, এরপর অপুর সাথে দূর্গার ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা আর ইতিতে গ্রামের পাঠ চুকিয়ে শহুরে নতুন পরিবেশে এক নির্বোধ বালকের উপলব্ধি সবকিছুই ধারাবাহিক  ও যুগপৎ আকর্ষণ।

বিধবাদের প্রতি অনাচার-অবহেলা, গ্রামের যজমানি প্রথার ক্রূরতা, নিতান্ত সাধারণ ও অল্পদর্শী অভাবগ্রস্তা গৃহবধূর আপাত নিষ্ঠুর আচরণ এবং তার ছোট মেয়ের বিশাল মমতার পরিচয় দিয়ে বল্লালী-বালাই পর্ব সূচিত।


“মানুষের আসা যাওয়ার মাঝে প্রকৃতিই কেবল নীরব নিঠুর দর্শক হয়ে সবকিছুকে জড়িয়ে রাখে। নগন্য জিনিসের মাহাত্ম্য ও উপযোগিতা ঢের বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। দরিদ্রতার কড়াল গ্রাসে বারবার আহত হয় আত্মমর্যাদা, তবু যুদ্ধ থামে না।”


সবচেয়ে প্রাণ সঞ্চারী খন্ড আম আঁটির ভেঁপু। এতে তিলে তিলে বড় হয় অপু। আর তার নিষ্পাপ মন ও কৌতূহলী চোখ দিয়ে পাঠক দেখে সমাজের কঠিন কিছু প্রথা, কিছু রঙিন স্বপ্নবিলাসিতা, কিছু আহ্লাদিত অভিমান – সর্বোপরি মানবশিশুর দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে উন্মোচিত কঠিন বিশ্ব। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের আনাচে কানাচে ছুটে ফিরে দুই ভাই বোন আর তাদের বাবা-মায়ের চলে অফুরন্ত জীবন সংগ্রাম। এরই মাঝে তারা স্বপ্ন দেখে, আশাহত হয় আবার নতুন কল্পনার বীজ রোপণ করে। মানুষের আসা যাওয়ার মাঝে প্রকৃতিই কেবল নীরব নিঠুর দর্শক হয়ে সবকিছুকে জড়িয়ে রাখে। নগন্য জিনিসের মাহাত্ম্য ও উপযোগিতা ঢের বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। দরিদ্রতার কড়াল গ্রাসে বারবার আহত হয় আত্মমর্যাদা, তবু যুদ্ধ থামে না। ভাল-মন্দ, মমতা-পাষণ্ডতায় জড়ানো এক একটি চরিত্র যেন সমাজের মূর্ত প্রতিচ্ছবি। উপন্যাসের শেষ অংশে গ্রামীণ খেলাঘর ছেড়ে বাস্তবতার পাঠ নিতে শহুরে জীবন শুরু করা অপুর পদে পদে ঠোকর খাওয়া যেন বারবার এই-ই বলে যে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নিত্য চক্র শ্বাপদের ন্যায় উদ্যত। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুরতাকে আশ্রয় করেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেন নিজ কলমের খোঁচায় প্রধান পাঁচটি চরিত্রের তিনটিকেই কেড়ে নিলেন। আর অদৃষ্টের খেয়ালী রসিকতাকে মূর্ত করে তুলতেই কী লেখক সব হারানো স্ত্রীলোকটির নাম দিয়েছিলেন ‘সর্বজয়া’? করুণ মৃত্যু, অসহায়ত্ব, কুটিলতা, অকৃত্রিম সরলতা, ক্ষুদ্র হতে বৃহৎ কপটতা, সীমাহীন দরদ আবার হৃদয়হীনতা, কখনো সৃষ্টিছাড়া উল্লাস, কোথাও আবেগী সম্প্রকাশে লেখক অনাড়ম্বর গতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন উপন্যাসটিকে।

বিভূতিভূষণ নিজেই বলেছেন, “করুণা ভালবাসার সবচেয়ে মূল্যবান মশলা, তার গাঁথুনি বড় পাকা হয়।” এখানে করুণা মানে দরদ- মমতা, উপন্যাসের প্রতিটি এককে রয়েছে যার জাঁকহীন বহিঃপ্রকাশ। রেলের থার্ড ক্লাস বগির বাদুর ঝোলা লোকটাও যে মহিমাময় চরিত্র হতে পারে, কিংবা গ্রামের পথে ছিন্ন পোশাক পড়া উষ্কখুস্ক চুলের মেয়েটি অপূর্ব দ্যোতনায়,গভীর অনুভূতিতে হৃদয়কে সিক্ত করে দিতে পারে তার প্রচ্ছন্ন ছবি এঁকে গেছেন লেখক একের পর এক।

তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “পথের পাঁচালী’ বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে।”

পাঁচালী-ই বটে, পথেরই গান এটি। বনফুলের রেণু, আর ক্ষুদ্র ঘাসের মুকুলে যেখানে একাকার হয়ে আছে অতি সাধারণ জীবন আর অতি সূক্ষ্ম ভাববোধ। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে পাঠক খুঁজে পাবেন তার দীর্ঘকালের উপলব্ধি, আর পাবেন অপরাজিত এক স্পৃহা। যে স্পৃহার সৃষ্টি অপুর মনে, বনদেবতার অভয়বাণী ‘সামনে এগিয়ে যাওয়াই জীবন’ থেকে। উপন্যাস শেষে তাই গভীর জীবনবোধ, আর বিষণ্ন মমতায় ভেজা চোখে পাঠক পরের খণ্ডে খুঁজবেন ‘অপরাজিত’ অপুকে!


ইশরাত জাহান

  • বি এ (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ,
  • তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ,
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close