Blog Post

দুই দেশ এক লাইব্রেরিঃ হাসকেল লাইব্রেরি ও অপেরা হাউজ

মাহাবুবা আক্তার

কলকাতার রাজকাহিনী  বা  হিন্দি বেগমজান সিনেমা আমরা কমবেশি সবাই দেখেছি। র‌্যাডক্লিফ লাইন বা ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের করুণ চিত্র ‍ও কতগুলো নারীর আত্মাহুতির চিত্র আমরা মুভিতে দেখি। একটি লাইন বা সীমান্ত কতগুলো জীবন,স্বপ্ন কে বিপন্ন করে দেয়  ১৯৪৭ এর দেশভাগ থেকে শুরু হয়ে অদ্যাবধি চলছেই আমরা ইতিহাসের স্বাক্ষী হচ্ছি। এখন বেগমজানরা নিজের সিদ্ধান্তের ওপর অটল না থাকলেও ,অন্যায়ের প্রতিবাদে জীবন না দিলেও সীমান্তে হত্যা বন্ধ নেই। জেনে না জেনে মানুষ ভারত সীমান্তে যাচ্ছে, নির্মমভাবে হত্যা সহ,জেলে বন্দীসহ অনাকাংখিত ঘটনা চলমান। যাই হোক, আজ আমরা এমনি একটি লাইব্রেরির সাথে পরিচয় করাব যেটি দুই দেশে অবস্থিত, লাইব্রেরিতে যেতে পারে দুই দেশের মানুষ, লাগেনা কোনো পাসপোর্ট বা ভিসা।হাসকেল লাইব্রেরি ও অপেরা হাউজ

লাইব্রেরিটি কানাডা ওযুক্তরাষ্ট্র সীমান্তের একটি সীমানা রেখার মধ্যে অবস্থিত। দাপ্তরিক নামঃ Haskell Free Library and Opera House National Historic Site of Canada.

দুই দেশের এক লাইব্রেরিকে অনন্য ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে এর ঠিকানা দুটি। যুক্তরাষ্ট্র অংশে এর অবস্থান ৯৩ ক্যাসওয়েল এভিনিউ ,ডার্বিলাইন, ভার্মন্ট এবং কানাডার অংশে এর অবস্থান স্ট্যানস্টেড, কুইবেক।

অন্যান্য সাধারণ লাইব্রেরির মতো এই হাসকেল লাইব্রেরিতে রয়েছে সারি সারি বই ও আলমারি। এই সীমারেখা কোনো দেশ তৈরি করেনি। একরকম ইচ্ছে করেই দুই দেশের ভেতর সম্প্রীতি বাড়িয়ে তুলতে এক শতক আগে ঠিক বর্ডারের মাঝখানে লাইব্রেরি আর অপেরা হাউস নির্মাণ করেছিল হাসকেল পরিবার। তবে ব্যাপারটা সহজ না হলেও বর্তমানে লাইব্রেরিটি সীমানা নিয়ে আগন্তুকদের তেমন কোন মাথাব্যাথা নেই বরং তারা উপভোগ করন এ বিষয়টি ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই যদি দেয়া যায় পাড়ি।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, লাইব্রেরিটির সামনে বুলেটিন বোর্ড, শিশুদের জন্য রাখা বইগুলো পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে। আর বাদবাকি সব বর্ডারের অন্যপাশে, অর্থাৎ কানাডায়।

দর্শকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বইয়ের সংগ্রহগুলি। ফ্রান্স ও কানাডার ইতিহাস কেন্দ্রিক বই, সেজন্য লাইব্রেরিয়ান কে হতে হয়, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী। কারণ সংগ্রহগুলি সেই ভাষার।

লাইব্রেরিটির ট্যাপে মোড়ানো লাইনটি অনেকের ধারণা, এটি অতিক্রম করতে পারেননা। বিবিসি কে দেয়া স্বাক্ষাৎকারে লাইব্রেরি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে একজন কর্মকর্তা বলেন, লাইব্রেরিতে যারা আসেন তারা যে কোন জায়গায় যেতে পারেন, অনেকেই পরিবার নিয়ে আসেন বর্ডারের কাছে শুয়ে, বসে বিভিন্ন স্টাইলে ছবি তুলেন|

হাসকেল লাইব্রেরির অপেরা হাউজের সাবেক পরিচালক হাল নিউম্যান বলেন, মানচিত্রের একটা রেখা আমাদের বিভক্ত করবে ,আলাদা করে দেবে এটাই নিয়ম। কিন্তু এই ব্যাপারটিই হাসকেল লাইব্রেরিকে অনন্য করে তুলেছে।সেটা মানুষকে আরো কাছাকাছি এনেছে। কী অদ্ভূত ব্যাপার তাইনা !

অপেরা হাউজটির মধ্যে দিয়ে চলে গেছে দুই দেশের সীমারেখা। দ্যা ইম্পসিবল রুম নামে পরিচিত মঞ্চটি কানাডায় আর এর বেশিরভাগ আসনের মাঝখানে দিয়ে চলে গেছে বর্ডারটি, অর্ধেক আসন আমেরিকায়। যেখানে দুই দেশেই আপনার মাথাকে রাখতে পারবেন আপনিও। লাইব্রেরি পরিচালনার স্বার্থে দুই দেশের মুদ্রা গ্রহণ করতে হয়। এজন্য কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলার পরে লাইব্রেরির সদর দরজার সামনে একটি আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্তে একটি গাড়ি সার্বক্ষণিক রাখা হয়।

সম্প্রতি এক দশক আগে নতুন এলিভেটর স্থাপন কে নিয়ে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষকে বিপাকে পরতে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো ক্রেন নিয়ে এলিভেটর যদি বসানো হয় কানাডায় তো ক্রেন আমেরিকায়। এতে মোটা অংকের টাকা গুণতে হচ্ছে দুই দেশকে। অবশেষে ‍সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, ক্রেন আমেরিকায় থাকবে। আর কানাডায় অবস্থিত এলিভেটর চলবে আকাশপথ দিয়ে। তবে এমন সাময়িক ঝামেলা ছাড়াও দুই দেশের নাগরিকরা উপভোগ করেন লাইব্রেরির এমন স্থাপনাকে। লাইব্রেরিটি নির্মাণের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ক্রসবর্ডার মিথস্ক্রিয়া ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক  তৈরি করা।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, রোর বাংলা, উইকিপিডিয়া


মাহাবুবা আক্তার

  • সহকারি লাইব্রেরিয়ান
  • জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, দিনাজপুর।
  • উত্তরবঙ্গ করেসপন্ডেন্ট, লাইব্রেরিয়ান ভয়েস।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close