স্মৃতিতে অম্লান

তুমি রবে নীরবে: খ. ম. আউয়াল

কনক মনিরুল ইসলাম

কনক মনিরুল ইসলাম

খ.ম আব্দুল আউয়াল ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ড. মির্জা রেজা ভাইয়ের মাধ্যমে। স্থান, কাল ও সময়টি ঠিক মনে করতে পারছিনা। ড. রেজা ভাই যখন তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তখন বলেছিলেন আমাদের আউয়াল ভাই কিন্তু খুব গুণী মানুষ, বেলিডের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বেলিডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বেলিডের আজকের অবস্থানের পেছনে তাঁর রয়েছে অনেক অবদান। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ তিনি খুব ভালো লেখেন। তাঁর লেখাতে তুমি শব্দ চয়ন দেখলেই বুঝবে তিনি কেমন লিখেন। তুমিও তো লেখালেখি কর। তাঁর লেখা পড়ে তুমি কিছু শিখতেও পারো। বিনয়ী আউয়াল ভাই বললেন, “রেজা সবসময় আমার সম্পর্কে একটু বেশীই বলে। তুমি ভালো লিখতে চাইলে চিরায়ত বাংলা সাহিত্য পড়ো, সমৃদ্ধ হবে।”

এরপর থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আউয়াল ভাইয়ের সাথে দেখা হলে কথা হতো। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ হতো। তবে তিনি ছিলেন মৃদুভাষী ও নিভৃতচারী মানুষ। পেশাজীবীদের অনুষ্ঠানগুলোতে তাঁকে খুব কমই দেখা যেত। বেলিডের কয়েকটি অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখেছি, তাঁকে জোর করে সামনের সারিতে না বসালে কখনও সামনে আসতেন না। যখনই কথা বলতেন মুখে থাকতো একগাল হাসি, কথায় ফুটে উঠতো বিনয়।

তাঁর শরীরে যে দানা বেঁধে উঠেছে ক্যান্সার তা তাঁর হাসিমাখা মুখ দেখে কখনও বুঝার উপায় ছিল না। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তাঁর সাথে আমার কথা হয়েছিল। তখন তিনি চিটাগাংয়ে তাঁর মেয়ের বাসায়। আমি তাঁকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলাম, বলা চলে ফোন করে বিরক্তই করেছিলাম।

তাঁকে যেদিন প্রথম ফোন দিলাম, উদ্দেশ্য ছিল ড. রেজা ভাইকে নিয়ে আমি যে একটি স্মারকগ্রন্থ লেখার কাজ শুরু করেছি তা তাঁকে জানানো এবং তাঁর কাছে একটা লেখার আবদার করা। তাঁকে ফোন দিলাম, ফোন রিসিভ করলেন তিনি। তিনি আমাকে সহজেই চিনতে পারলেন। আমি আগেই জানতাম ড. রেজা ভাইয়ের সাথে তাঁর খুব নিবীড় সম্পর্ক ছিল। প্রথমে তাঁকে বললাম ড. রেজা ভাই তো আমাদের ছেড়ে খুব অকালেই চলে গেলেন। রেজা ভাইয়ের কর্ম ও ব্যক্তিজীবন পরবর্তী গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের কাছে তুলে ধরার প্রয়াসে ড. রেজা ভাইকে নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করতে চাই। আমি জানি ড. রেজা ভাইয়ের সাথে আপনার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল এবং তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, তাঁর পি.এইচ.ডি সম্পন্ন করা কখনও সম্ভব হতো না যদি আপনি তাঁকে মানসিকভাবে সাহায্য না করতেন। আউয়াল ভাই বিনয়ের সাথে হেসে বললেন, “ও সব সময় আমার সম্পর্কে একটু বাড়িয়েই বলতো।” তিনি রেজা ভাইকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি বলে ধন্যবাদ জানালেন। তিনি বললেন, “তাঁর সাথে আমার অনেক ঘটনা তবে আমি ব্যক্তি রেজা ও তাঁর পিএইচডি নিয়ে তোমাকে একটা লেখা দিবো।” তবে শর্ত দিলেন তাড়াহুড়া করা যাবে না, তিনি একটু ধীরে সুস্থে লেখাটি দিতে চান। আমি বললাম কোন সমস্যা নেই। আপনি যখন দিবেন তখনই নিব। স্মারকগ্রন্থটিতে কার কার লেখা পেলে গ্রন্থটি সমৃদ্ধ হবে সে সম্পর্কেও তিনি কিছু দিক-নির্দেশনা দিলেন। এভাবে প্রথম আলাপের সমাপন।

এরপর দীর্ঘ একমাস পর তাঁকে ফোন দিলাম। ফোন ধরেই তিনি বললেন আমি খুবই লজ্জিত তোমার লেখাটি আমি শুরু করেছিলাম কিন্তু কোথায় রেখেছি আর খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি ভাই, আমাকে কি আর কয়েকটা দিন সময় দিতে পারবে?

আমি লেখাটি পুনরায় শুরু করবো এবং এক সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে দিবো। একজন বড় মাপের মানুষ কতটা বিনয়ী হতে পারে সেদিন আমি আউয়াল ভাইয়ের মধ্যে দেখেছিলাম। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন অমায়িক, বিনয়ী ও সজ্জন মানুষ।

রেজা ভাইকে নিয়ে লেখা আউয়াল ভাইয়ের পান্ডুলিপি
                                                                      রেজা ভাইকে নিয়ে লেখা আউয়াল ভাইয়ের পান্ডুলিপি

আউয়াল ভাই তাঁর কথা রেখেছিলেন। প্রায় তিনদিন পর মফিজ ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বললো ‘আউয়াল ভাই তোমাকে একটা লেখা পাঠিয়েছেন। লেখাটা আমি পড়েছি, লেখাটি পড়ে আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম।’ মফিজ ভাই বললেন, “তুমি কি জানো, আউয়াল ভাই অনেক অসুস্থ? তারপরেও তুমি তাঁর কাছ থেকে লেখা পেয়েছ, তুমি ভাগ্যবান।” মফিজ ভাইয়ের সাথে দেখা করে আউয়াল ভাইয়ের পান্ডুলিপিটা সংগ্রহ করলাম। মফিজ ভাই বললেন ”লেখাটা সংগ্রহে রেখো। বর্তমানে ভালো লেখে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম।” আমি বাসায় ফিরে তাঁর লেখাটি পড়ে শিহরিত হলাম। তাঁর লেখায়, কি সুন্দর শব্দ চয়ন আর বাক্য বুনন। কেউ না পড়লে বুঝতে পারবে না তাঁর শব্দ ব্যবহারের গভীরতা। আশা করছি অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ড. রেজা, স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশিত হবে। তখন তাঁর লেখক প্রজ্ঞা আবারো উন্মোচিত হবে।

তাঁর মৃত্যু সংবাদ যখন শুনলাম আবারো তাঁর হৃদয় নিংড়ানো লেখাটি পড়লাম। তাঁর সম্পর্কে আরো জানার ইচ্ছে হলো। মফিজ ভাইকে ফোন করলাম – মফিজ ভাই, আউয়াল ভাই সম্পর্কে জানতে চাই। তাঁর সম্পর্কে আমাকে আরো কিছু বলেন। মফিজ ভাই আউয়াল ভাইকে নিয়ে কথার ঝুড়ি খুললেন। আমি যত শুনি ততোই বিমোহিত হই, শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যেতে থাকে তাঁর সম্পর্কে। মফিজ ভাইয়ের কাছে শুনলাম তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন। আর তাঁর সহপাঠী ছিলেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা, বেবী মওদুদ, নির্মলেন্দু গুণ সহ প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের সকলের সাথে আউয়াল ভাইয়ের আত্মার সম্পর্ক কিন্তু তিনি তা কখনও কেউকে বুঝতে দিতেন না। প্রিয় আউয়াল ভাই আপনি আপনার সাধারণ জীবনযাপনে আমাদের আনেক কিছু শিখিয়ে গেলেন। আপনার কর্ম, সরলতা ও বিনয় আমরা যেন অনুসরণ করতে পারি। উপরে ভাল থাকবেন আউয়াল ভাই, আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন।


লেখকঃ লাইব্রেরিয়ান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

    • সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, লাইব্রেরিয়ান ভায়েস
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close