Blog Post

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের উদ্ভব ও বিকাশ: একটি পর্যালোচনা

ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম, গ্রন্থাগার বিভাগের প্রধান, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চট্রগ্রাম

সারসংক্ষেপ:

ড. মোঃ রফিকুল ইসলামঅতীতকে জানার কৌতূহল মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এই প্রবণতা থেকেই মানুষ তার উৎস, বিকাশ ও প্রবহমান ধারা অনুসন্ধানের জন্য বারবার ফিরে যায় অতীত ঐতিহ্যের কাছে। তেমনি পাল ও সেন আমলে এদেশে তালপাতা গাছের বাকল প্রভৃতি লিখন উপকরণে যে অজস্র পুঁথি লেখা হয়েছিল, তা অনুমান করা যায়। কারণ এ অঞ্চলের শিক্ষার ঐতিহ্য ছিল সুপ্রাচীন। আর শিক্ষিত মানুষ স্বাভাবিক কারণেই ধর্ম-অর্থ-কামমোক্ষ সাধনার জন্য প্রাচীন পুঁথি অনুলিখন করে ব্যবহার করতো। সেন আমলের পর এদেশে মুসলিম সাহিত্য সংস্কৃতিরও বিকাশ লাভ করে। তাই আঠার শতক পর্যন্ত এদেশে যুগপৎ হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম সভ্যতা সংস্কৃতি ঐতিহাসিক সুনিপুর সাহিত্য সম্ভার রচিত হয়। এগুলোর প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল মূলত হস্তলিখিত প্রাচীন পান্ডুলিপির মাধ্যমেই। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার সংগ্রহ করে বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু, দেবনাগরি, আসামী ও বার্মিজসহ বিভিন্ন ভাষা এবং লিপির প্রায় ত্রিশ হাজারের অধিক প্রাচীন দুম্প্রাপ্য পান্ডুলিপি।

ভূমিকা:

মুদ্রণযন্ত্র আবিস্কারের পূর্ববর্তী সময়ে জ্ঞানচর্চার বাহন ছিল হস্তলিখিত পান্ডুলিপি। এ পান্ডুলিপির মধ্যে নিহিত রয়েছে, অতীতের জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনেক মূল্যবান উপাদান। পান্ডুলিপিকে আমরা প্রাচীন পুস্তকও বলতে পারি। পুস্তক থেকে পুঁথি শব্দের উৎপত্তি। পান্ডুলিপির প্রতিশব্দ হিসাবে পুঁথি শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ইংরেজিতে পান্ডুলিপিকে ম্যানুসক্রিপ্ট বলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে পান্ডুলিপি সংগ্রহশালা। এই বিশাল সংগ্রহ শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই নয় সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পান্ডুলিপি সংগ্রহ ভান্ডার। তবে ত্রিশ হাজারের অধিক দুম্প্রাপ্য ও মূল্যবান পান্ডুলিপি এ সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহের বেশির ভাগ পান্ডুলিপি পনের থেকে উনিশ শতকের মধ্যে লিখিত এবং অনুলিপিকৃত। বিচিত্র উপকরণের মধ্যে এই পান্ডুলিপিগুলি লিখিত হয়েছে, যেমন-তালপাতা, তেরেটপাতা, কলাপাতা, গাছের বাকল, হাতের তৈরি তুলট কাগজ ও মিলের তৈরি কাগজ। এছাড়াও ভাষা ও লিপির ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য রয়েছে। সংগৃহীত পান্ডুলিপি অধিকাংশই প্রাচীন বাংলা হরফে লিখা। বিশেষ করে দেবনগরী, ফার্সি, আরবি ও বার্মিজ ইত্যাদি হরফেরও লিখিত পান্ডুলিপি রয়েছে এবং কিছু কিছু আরবি হরফে লিখিত বাংলা ভাষার পান্ডুলিপি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার কর্তৃক সংগৃহীত এই পান্ডুলিপিসমূহ সংখ্যাধিক্য, বিষয় বৈচিত্র্য এবং উপকরণের দিক থেকে এ উপমহাদেশের মধ্যে অন্যতম সংগ্রহ ভান্ডার। এ সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত লিখিত এবং অনুলিখিত পান্ডুলিপি। আর এ পান্ডুলিপির মধ্যে নিহিত রয়েছে অতীতের জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূল্যবান নিদর্শন।

পান্ডুলিপি কী ?

পান্ডু বা ধূসর বর্ণের উপাদানে হস্তলিখিত গ্রন্থকেই বলা হয় পান্ডুলিপি। এর আরেক নাম পুঁথি। কাগজ আবিস্কৃত হওয়ার পূর্বে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান, যেমন-ভূর্জপত্র, তালপাতা, গাছের বাকল ও কলাপাতা ইত্যাদিতে লেখা হতো। এই উপাদানগুলি কালের আবর্তে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পান্ডুবর্ণ ধারণ করত বলে এতে লিখিত গ্রন্থের নাম হয়েছে পান্ডুলিপি। পরবর্তীকালে যখন তুলট কাগজ আবিস্কৃত হলো, তখন থেকেই পূর্ব অভ্যাসবশত তৈরির সময়ই একে পান্ডুবর্ণের করা হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে ভূর্জপত্রে লিখিত পান্ডুলিপি নেই। তবে তালপাতা, গাছের বাকল, কলাপাতা এবং তুলট কাগজে লিখিত পান্ডুলিপি আছে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে প্রথম হুগলির শ্রীরামপুরে মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাই মুদ্রিত গ্রন্থ সহজলভ্য হওয়ায় ধীরে ধীরে হস্তলিখিত পান্ডুলিপির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়।

পান্ডুলিপি সংগ্রহের আদিকথা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পান্ডুলিপির মধ্যে অতীতের জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান। বিভিন্ন ভাষায় ও বিভিন্ন উপাদানে পান্ডুলিপি লেখা হয়েছে। লেখার উপাদানের মধ্যে যেমন- পাথর, গাছের বাকল, তালপত্র, কদলীপত্র, তেরেটপত্র, তুজপত্র, পশুর চামড়া, কাপড় ও হাতের তৈরি তুলট কাগজ ইত্যাদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হচ্ছে পান্ডুলিপি সংগ্রহশলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের এ পান্ডুলিপি সংগ্রহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ সংগ্রহ ভান্ডার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই পান্ডুলিপি সংগ্রহের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। আর কাজ শুরু করে ১৯২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একটি উচ্চ পর্যায়ের পান্ডুলিপি কমিটি গঠনের মাধ্যমে। এই কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে ড. শুশীল কুমার দে (সংস্কৃত বাংলা বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান) এবং নলিনীকান্ত ভট্রশালী (ঢাকা যাদুঘরের কিউরেটর)। এছাড়াও কমিটি সদস্যরা ছিলেন ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার,রাধাগোবিন্দ্র বসাক, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এন,জি, ব্যানাজী ও ফকরুদ্দীন আহমদ (সাবেক গ্রন্থাগারিক)। ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ‘পান্ডুলিপি শাখা’ নামে একটি নতুন শাখা শুরু হয়। এখান থেকেই পান্ডুলিপি শাখার অগ্রযাত্রা। ১২৫০টি পান্ডুলিপি নিয়ে পান্ডুলিপি শাখার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়।

১৯২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এই কমিটি সংস্কৃত ও বাংলা মিলে প্রায় ৩ হাজারের অধিক পান্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। ১৯২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে আরও ১০ হাজারের অধিক পান্ডুলিপি সংগৃহীত হয়। পরবর্তীকালে পান্ডুলিপি কমিটি পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য অবিভক্ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে এজেন্ট নিয়োগ করেন। এজেন্টদের মধ্যে বাবু সুবোধচন্দ্র ব্যানার্জী, সৈয়দ জাফর হোসাইন, রাজন্দ্রচন্দ্র হাজরা উল্লেখযোগ্য ছিলেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাঁরা প্রচুর পান্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। ১৯৩৩ সালে ড. নলিনীকান্ত ভট্রশালী পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য দেশব্যাপী একটি গণ-বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেন। এই গণ-বিজ্ঞপ্তির ফলে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিপুল সাড়া পাওয়া যায়। আসাম, নদীয়া, মেদনীপুর, হুগলী, ঢাকা, সিলেট, ফরিদপুর ও বরিশাল বিভিন্ন জায়গা থেকে এজেন্টের মাধ্যমে প্রায় ১৭০০০ মত পান্ডুলিপি সংগৃহীত হয়।

পরবর্তী সময়ে উর্দু, ফার্সি ও আরবি পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক একটি কমিটি গঠন করেন। এ কমিটির সদস্যরা ছিলেন যথাক্রমে ফিদা খান, বিভাগীয় প্রধান, ফার্সি ও উর্দু বিভাগ, মারগুফ আহমদ তৌফিক, আরবি বিভাগের শিক্ষক, জাফর হোসাইন আজাদ, ফার্সি বিভাগের শিক্ষক এবং ড. শুশীলকুমার দে, বিভাগীয় প্রধান,সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ। এই কমিটি উর্দু-ফার্সি-আরবি পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য সংবাদপত্রে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করেন এবং তারা উল্লেখযোগ্য সাড়া পান। ১৯২৯-৩০ শিক্ষাবর্ষের মধ্যেই প্রায় ৩০০ টি উর্দু, ফার্সি ও আরবি পান্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। এছাড়া বলিয়াদি জমিদার পরিবারের সদস্য খান বাহাদুর চৌধুরী কাজীমুদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী এবং তৎকালীন ভারতবর্ষের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হেকিম হাবিবুর রহমান সংগৃহীত দুস্প্রাপ্য মূল্যবান পান্ডুলিপির একটি বিরাট সংগ্রহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দান করেন। সংগৃহীত পান্ডুলিপি বেশির ভাগই ছিল তৎকালীন জমিদার শ্রেণি ও উদার ব্যক্তির দান। কিন্তু পান্ডুলিপি ক্রয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচীন পান্ডুলিপি সংগ্রহের উল্লেখযোগ্য কেন্দ্ররুপে গড়ে ওঠে। বিশেষ করে, দেশ-বিদেশের বিদ্যান ও গবেষকদের দৃষ্টি এ পান্ডুলিপির দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে। ১৯৩৫-৩৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রথমবারের মত এম. এ. দ্বিতীয় বর্ষের পাঠ্য তালিকায় পান্ডুলিপি পাঠ্য চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে সংস্কৃত ও পালি বিভাগের পাঠ্যসূচিতেও পান্ডুলিপি পাঠ চালু করা হয়। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগৃহীত পান্ডুলিপির বৃহত্তর ব্যবহারের উপযোগীতা সৃষ্টি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক রির্পোটের তথ্য অনুযায়ী ১৯৩৭-৫০ সাল পর্যন্ত পান্ডুলিপি সংগ্রহের ব্যাপারে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৫১-৫২ শিক্ষাবর্ষ থেকে আবারও পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫২ সালে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ৫৮৫টি পান্ডুলিপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দান করেন। যা পুঁথি পরিচিতি গ্রন্থ নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৬০ সালে এই পুঁথি পরিচিতি গ্রন্থটি, এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এ উপমহাদেশের মধ্যে সাহিত্য বিশারদের সংগ্রহ হচ্ছে মধ্যযুগের ও মধ্যযুগীয় ধারার মুসলিম কবি ও সাহিত্যিকদের রচনার অন্যতম সংগ্রহ। এ পুঁথিগুলোকে সম্বল করে ড. মুহাম্মদ শহীদু যা পুঁথি পরিচিতি গ্রন্থ নামে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় যে, ১৯৫৪ সাল থেকে স্বাধীনতাত্তোর পর্যন্ত তেমন উল্লেখযোগ্য পান্ডুলিপি সংগ্রহ গড়ে ওঠেনি। ১৯৬০ সালে এই পুঁথি পরিচিতি গ্রন্থটি, এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এ উপমহাদেশের মধ্যে সাহিত্য বিশারদের সংগ্রহ হচ্ছে মধ্যযুগের ও মধ্যযুগীয় ধারার মুসলিম কবি ও সাহিত্যিকদের রচনার অন্যতম সংগ্রহ। এ পুঁথিগুলোকে সম্বল করে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. মুহাম্মদ এনামুল হক যথাক্রমে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের কথা ও মুসলিম সাহিত্য নামক ইতিহাস রচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা পান্ডুলিপি সংগ্রহের মধ্যে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ সংগ্রহ খুবই উল্লেখযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগৃহীত পান্ডুলিপির বেশির ভাগ পান্ডুলিপিই পঞ্চদশ শতক থেকে উনবিংশ শতকের প্রথম দিকের মধ্যে লিখিত এবং অনুলিপিকৃত। এই পান্ডুলিপি বিভিন্ন ভাষায় ও বিভিন্ন লিপিতে লেখা হয়েছে। সংস্কৃত, বাংলা, ফারসি, আরবি ও উর্দু ভাষায় লিখিত পান্ডুলিপির সংখ্যাই বেশি। মৈথিলী ও আসামী ভাষারও কিছু পান্ডুলিপি রয়েছে। অধিকাংশ পান্ডুলিপি প্রাচীন বাংলা হরফে লিখিত হয়েছে। তাছাড়া দেবনগরী হরফ এবং আরবি ও ফারসি হরফে লিখিত পান্ডুলিপি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগৃহীত পান্ডুলিপির মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের পান্ডুলিপি রয়েছে যেমন-মহাভারত, রামায়ণ, গীতা, প্রহসন, ব্যাকরণ,অভিধান, কাব্য, নাটক, ন্যায়,ম্মৃতি, মন্ত্র-তন্ত্র, জ্যোতিষ, উপখ্যান, প্রণয়োপখ্যান, ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ, আয়ূর্বেদীয় শাস্ত্র ও হোমিওপ্যাথি শাস্ত্র ইত্যাদি।

একটি সূত্রে থেকে জানা যায় যে, স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অধ্যাপক আলী আহমদকে পান্ডুলিপি সংরক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বদলি করা হয়। অধ্যাপক আলী আহমদকে ‘পান্ডুলিপি সংরক্ষক’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া কর্তৃপক্ষের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল। তাঁর দায়িত্ব প্রাপ্তির পরপরই তিনি পান্ডুলিপি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিষয়ে বহুমুখী ও বিপ্লবাত্বক সাফল্য অর্জন করেছিলেন। অধ্যাপক আলী আহমদ পুঁথিবিশারদ, পুঁথিসংগ্রাহক, এক কথায় পুঁথিপ্রেমিক একজন লোক ছিলেন। তিনি তাঁর অর্ধ-শতাব্দীকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে পান্ডুলিপি শাখাকে নতুন করে ঢেলে সাজান। পান্ডুলিপি সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহার উপযোগী করার জন্য তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণা কর্মকর্তাসহ বেশ কিছু সংখ্যক যোগ্য ও পান্ডুলিপি জ্ঞান সম্পন্ন কর্মচারীকে পান্ডুলিপি শাখায় গবেষণা কাজে নিয়োগ প্রদান করেন। আর পান্ডুলিপি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য প্রথমবারের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ হাজার টাকা বাজেট বরাদ্দ প্রদান করেন। যা ক্রমাম্বয়ে পান্ডুলিপি সংগ্রহশালাকে উন্নত করার জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রতিবছরই বর্ধিত হচ্ছে।

১৯৮৩ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থানকুল্যে “পান্ডুলিপি উন্নয়ন প্রকল্প” নামে একটি প্রকল্প তিনি হাতে নেয়। এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পান্ডুলিপি সংগ্রহ ও উন্নততর পদ্ধতিতে পান্ডুলিপি সংরক্ষণ, পরিচায়ন, তালিকাকরণ ও প্রশিক্ষণ সর্বোপরি ‘পান্ডুলিপি শাখা’ কে একটি গবেষণাগারে পরিণত করা। এই প্রকল্পের অর্থানুকুল্যে কুমিল্লার রামমালা লাইব্রেরী, কিশোরগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরী, সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংগ্রহ কেন্দ্র, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল লাইব্রেরী থেকে প্রায় তিন হাজারের মত পান্ডুলিপি সংগ্রহ করে মাইক্রোফিল্ম করে রাখা হয়। তবে প্রকল্প শেষ হওয়ার পরবর্তী সময়ও এই সংগ্রহের কাজ অব্যাহত ছিল। ১৯৮৮ সালে শ্রীহট্র সংস্কৃত কলেজ থেকে ৫০টি পান্ডুলিপি, ২০০২ সালে কুমিল্লার বৌদ্ধ বিহার এবং কক্সবাজারের রামু বৌদ্ধ মন্দির থেকে বেশ কিছু সংখ্যক পান্ডুলিপি সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ড. আহমদ শরীফ এর পরিবার থেকে প্রায় ৪০৬টি পান্ডুলিপি দান করেন। এই পান্ডুলিপিগুলো মূলতঃ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কর্তৃক সংগৃহীত এবং ড. আহমদ শরীফ কর্তৃত সংরক্ষিত। এই সংগ্রহটি বাংলা পান্ডুলিপি ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

বর্তমানেও পান্ডুলিপি সংগ্রহের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের যে সব পান্ডুলিপি সংগ্রহের অভাবে কালের আবর্তনে হারিয়ে গেছে সেগুলো যদি সংগ্রহ করা সম্ভব হতো তাহলে দেখা যেত প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্যে দুনিয়ার যে কোনো সমৃদ্ধ দেশের মধ্যযুগের সাহিত্যের চেয়েও আমাদের মধ্যযুগীয় সাহিত্য কোনো অংশে কমতি হতো না।

পান্ডুলিপি ধরন

উনিশ শতকের প্রথম দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি পূর্বেই একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বাংলা ভাষী ভূ-খন্ডের বিদ্যোৎসাহী জমিদার, গবেষক ও পৃষ্ঠাপোষকরা সূচনাকাল থেকেই এ গ্রন্থাগারে পান্ডুলিপি শাখা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় এখানো দেশ-বিদেশ থেকে হস্তলিখিত পান্ডুলিপি সংগ্রহের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পান্ডুলিপি শাখায় সংরক্ষিত পুঁথিগুলির মধ্যে মধ্যযুগের সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার অনেক পুঁথি রয়েছে। এর মধ্যে আদি-মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের একটি পুঁথি ফটোকপি আকারে রয়েছে। যা পশ্চিমবঙ্গ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদের্শন চর্যাগীতি বা চর্যাচর্য বিনিশ্চয় এর অনুুলিপি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। আরেকটি বিষয় এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন যে, গ্রন্থাগারের পুঁথি সংগ্রহশাখায় সংরক্ষিত পুঁথিগুলির অধিকাংশ লিপিকৃত। লিপিকৃত হওয়ার ফলে পান্ডুলিপিগুলির বিন্যাস ও বানানের অভিন্নতা অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষিত হয়নি। সে ক্ষেত্রে লিপিকরদের রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে মূল পুঁথি কিছুটা পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য বিষয় বৈচিত্র্যে অনন্য। এই অনন্য সাহিত্যের বিচিত্র ধারার পান্ডুলিপি আমাদের সংগ্রহশালাকে সমৃদ্ধ করেছে। বৈষ্ণব পদাবলী, চৈতন্য-চরিতামৃত, রামায়ণ, মহাভারত, কাহিনীকাব্য, মঙ্গলকাব্য, রোমান্সমূলক আখ্যান-কাব্য, জ্যোতিষশান্ত্র, দর্শন, চিঠিপত্র, ইতিহাস ও অভিধান ইত্যাদি মধ্যযুগের বিশাল সাহিত্যকর্মের প্রতিটির নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত। এখানে যেমন রয়েছে কাশীরাম দাসের মহাভারত, কৃত্তিবাস পন্ডিতের রামায়ণ, শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জোলখা,আলাওলের পদ্মাবতী, তেমনি রয়েছে সংস্কৃত ভাষায় রচিত কাব্য, নাটক, প্রহসন, ম্মৃতিগ্রন্থ, ছন্দ, অলংকার, ব্যাকরণ ও পৌরণিক কাব্য ইত্যাদি। এর পাশাপাশি রয়েছে ফারসি, উর্দু, আরবি, মৈথিলী ও অহমিয়া ভাষায় রচিত সাহিত্যের নানা নিদর্শন ও দৃষ্টান্ত। নিন্মের কয়েকটি পুঁথির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো। প্রথমেই বাংলা পান্ডুলিপি থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পুঁথির বিবরণ উপস্থাপন করা হলো।

১. বিষ্ণুপুরাণ: পান্ডুলিপি শাখায় রক্ষিত বিষ্ণুপুরাণের পৃথিটি ৫৪০ বৎসরের প্রাচীন। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুঁথি সংগ্রহশালার সবচেয়ে প্রাচীন বাংলা পুঁথি।

২. চৈতন্যচরিতামৃত: কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত চৈতন্যচরিতামৃতের এই পুঁথিতে আদি মধ্য এবং অন্ত্য-তিনটি অংশই বিদ্যমান। পৃথিটি বাংলা এবং সংস্কৃত ভাষায় লিখিত। লিপিসন অনুযায়ী এই পুঁথি ২১৪ বৎসরের প্রাচীন। চৈতন্যচরিতামৃত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মানব জীবন নির্ভর কাব্যসাহিত্য সৃষ্টি হিসাবে অনবদ্য। কেননা ঐ সময়ের বিশ্বসাহিত্যে মানুষের জীবন নিয়ে এরুপ পূর্ণাঙ্গ কাহিনী রচিত হয়নি।

৩. পদামৃত সমুদ্র: রাধামোহন রচিত পদামৃত সমুদ্র বৈষ্ণব পদাবলীর একটি সংকলন। এতে বিদ্যাপতি চন্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস প্রমুখ পদকর্তার পদ রয়েছে। বিস্তৃতি টীকা সম্বলিত এই পান্ডুলিপি বৈষ্ণব সাহিত্যের ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

৪. মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মঙ্গল কাব্য ধারার অন্যতম সৃষ্টি। এই কাব্য মঙ্গলকাব্যের বিশিষ্ট কবি নারায়ণদের এর রচিয়তা। এই পৃথিটির বিশেষ তাৎপর্য এই যে, পৃথিটিতে ৩৯টি চিত্র রয়েছে, যা মধ্যযুগের চিত্রকলার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। হুমায়ুন কবিরের বাঙলার কাব্য এবং আহমদ শরীফের বাঙালী ও বাংলাসাহিত্য গ্রন্থে পদ্মপুরাণের যুগান্তকারী ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত স্বভাবধর্মের উল্লেখ ও বিশ্লেষণ রয়েছে।

৫. ইউসুফ-জোলেখা: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধারা হচ্ছে রোমান্সমূলক প্রণয়োপাখ্যান। শাহ মোহাম্মদ সগীর রোমান্সমূলক প্রণয়োপাখ্যান ধারার বিখ্যাত কবি। তাঁরা কাব্য ইউসফ-জোলেখা ১৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে রচিত হয়। ভাষা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই কাব্যটিকে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম কাব্যগুলির অন্যতম বলে বিবেচনা করা হয়।

৬. লায়লী-মজনু: মধ্যযুগের বিশিষ্ট কবি দৌলত উজীর বাহরাম খান। ইনি বাংলায় লায়লী-মজনু উপাখ্যানের আদি রচয়িতা। এই কাব্যে আরব দেশীয় ঘটনা অবলম্বনে বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির বিচিত্র অনুষঙ্গের মিশ্রণে কবি এর মানবিক কাঠামো সৃষ্টি করেছেন। অনন্য বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত। বাহরান খানের আরেক বিখ্যাত কাব্য জঙ্গনামা।

৭. নবীবংশ/ওফাত-ই-রসুল: মধ্যযুগের অন্যতম মুসলিম কবি সৈয়দ সুলতান। সৈয়দ সুলতানের শিস্য মুহাম্মদ খানের মুক্তল হোসেন কাব্য থেকে জানা যায় যে, সৈয়দ সুলতান “আদম হইতে কেয়ামত” পর্যন্ত ইসলামি ধারার একটি ইতিহাস কাব্যে রুপ দেওয়ার ইচ্ছায় লেখনী ধারণ করেছিলেন। কিন্তু ‘ওফাত-ই-রসূল’ অবধি রচনার পর বার্ধক্য বশত আর অগ্রসর হতে পারেনি। নবীবংশ বিরাট গ্রন্থ বলে পাঠক সাধারণ “হযরত মুহাম্মদের জীবন চরিতাশংটিই পাঠ করতেন।” এই অংশ দু’টি পর্বে খন্ডরুপে বহুল প্রচলিত ছিল। এক পর্ব রসূল চরিত অন্যপর্ব ওফাত-ই-রসূল। নবীবংশ কাব্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সৈয়দ সুলতান এই কাব্যে ইসলাম ধর্ম ও দর্শনের পাশাপাশি বাঙালি জীবনের রুচি, সংস্কৃতি এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে কাব্যে তুলে ধরেছেন।

৮. পদ্মাবতী: পান্ডিত্যে ও বৈদগ্ধ্যে আলাওল মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আলাওল আরাকান রাজসভার বিভিন্ন অমাত্যের আদেশ ও পৃষ্ঠাপোষকতায় তাঁর কাব্যসমূহ রচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পান্ডুলিপি শাখায় সংরক্ষিত আলাওলের পুথিগুলি হচ্ছে, যেমন-পদ্মাবতী, সয়ফুলমূলক বদিউজ্জামান, সতীয়মান, লোর চন্দ্রানী, সপ্তয়কর, তোহফা ও সেকান্দর নামা।

৯. রামায়ণ ও মহাভারত: কৃত্তিবাসের রামায়ণও কামীরাম দাসের মহাভারত ধর্মীয় অনুশাসনের আবরণ ভেদ করে আজও বাংলার ঘরে ঘরে পঠিত ও সমাদৃত।

১০. দলিল-দস্তাবেজ ও চিঠিপত্র: মধ্যযুগের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিত্রের পাশাপাশি বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিফলন এই পান্ডুলিপিগুলোকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে সংস্কৃত পান্ডুলিপির সংখ্যাই বেশি। সংস্কৃত পান্ডুলিপির প্রায় সবগুলিই বাংলা হরফে লেখা। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত পান্ডুলিপির বিবরণ নিন্মে সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপন করা হলো-

ক. সারদা তিলক: এই পৃথিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুঁথিসংগ্রহশালায় সবচেয়ে প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথি। পুঁথিটি ৫৬৯টি বৎসরের প্রাচীন এবং গাছের বাকলে লেখা। লিপিকরের হস্তাক্ষর চমৎকার ও স্পষ্ট পৃথিটি বাংলা হরফে লেখা।

খ. কালিদাসের কাব্য: সংস্কৃত-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবি কালিদাস। কবি কালিদাস রচিদ কাব্যসমূহের নান্দনিকতা আজও সৌন্দর্য পিপাসু পাঠকের হৃদয়কে আলোড়িত করে। মেঘদূত, ঋতুসংহার, কুমারসম্ভব, অভিজ্ঞান শকুন্তল্ম ও কালিদাসের অমর সৃষ্টি। কালিদাস তাঁর প্রতিটি রচনায় প্রকৃতি, মানুষ ও জীবন রহস্যের চিরন্তন সত্য উন্মোচন করেছেন। কালিদাসের কাব্যসমূহের লিপিকৃত বাংলা হরফে লেখা পুঁথিগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের অমূল্য সম্পদ।

গ. ব্যাকরণ: কলাপ ব্যাকরণ, মুগদ্ধবোধ ব্যাকরণ,কতন্তবৃত্তি, ভাষাবৃত্তি প্রভৃতি সংস্কৃত ব্যাকরণের কয়েকটি দৃষ্টান্ত। বস্তুতপক্ষে প্রাচীন ভারতবর্ষে বিভিন্ন টোল এবং পাঠশালায় ব্যাকরণ ও ন্যায় ইত্যাদি বিষয়ে গভীরভাবে পাঠদান করা হতো। টোল পাঠশালা থেকে সংগৃহীত হওয়ার ফলেই সম্ভবত পুঁথিশালায় ব্যাকরণ গ্রন্থের সংখ্যা সর্বাধিক।

ঘ. নাটক ও প্রহসন: ভারতীয় নাট্যশান্ত্রের ভিত্তি সৃষ্টি হয়েছে সংস্কৃত নাটককে কেন্দ্র করে। বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকে এসব নাটক বিশ্বসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। বর্তমান কালেও ভারতত্ত¡বিদরা এসব নাটকের বিষয়বস্তু ও প্রকরণ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুঁথিশালায় সংগৃহীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলি হচ্ছে কৌতুকরত্বাকর, প্রবোধচন্দ্রোদয় ও মহানাটক প্রভৃতি।

সুপারিশ:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে পান্ডুলিপি সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসলেও সংগৃহীত পান্ডুলিপি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় অনেক পান্ডুলিপি বিশেষ করে তালপাতার পান্ডুলিপি কীটদ্রষ্ট হয়ে জট লেগে গিয়েছিল। সেগুলি সময়ের সাথে সাথে আরও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে অধ্যাপক আলী আহমদ পান্ডুলিপি শাখার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি পান্ডুলিপি সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পান্ডুলিপি সংরক্ষণের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো নিন্মরুপ-

    • ১.পান্ডুলিপি সংরক্ষণ কক্ষে এয়ারকুলারের ব্যবস্থা করতে হবে।
    • ২. পান্ডুলিপি নিয়মিত ডাস্টিং করা। এছাড়াও কীটনাশক ঔষধ ও ন্যাপথলিনের ব্যবহার করা।
    • ৩. গ্লাস দেয়া আলমিরার পরিবর্তে তারের জালি দেয়া আলমিরাতে পান্ডুলিপি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
    • ৪. পান্ডুলিপি উপরে কাঠের মলাট ও কাগড় দিয়ে মুড়ানোর ব্যবস্থা করা।
    • ৫.পান্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য মাইক্রোফিল্ম ক্যামেরা এবং মাইক্রোফিল্ম রিডার ক্রয় করে পান্ডুলিপিসমূহ মাইক্রোফিল্ম করে রাখা।
    • ৬. কীটদ্রষ্ট পান্ডুলিপি ল্যাবরেটরীতে ফিউমিগেশন এর মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট এর জন্য ল্যাবটেরি স্থাপন করা।
    • ৭.পান্ডুলিপি দীর্ঘস্থায়ী ও মূলপাঠ অক্ষুন্ন রাখার জন্য হ্যান্ড লেমিনেশন ও হাইড্রোলিক লেমিনেশন এর ব্যবস্থা করা।
    • ৮. গ্রন্থাগার কর্মীদেরকে পান্ডুলিপি সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
    • ৯. পান্ডুলিপির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।

বর্তমান যুগ হচ্ছে প্রযুক্তি উৎকর্ষের যুগ। তথ্য সংরক্ষণের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের এই সময়ে Digital Preservation এর কোনো বিকল্প নেই। Non digital ডকুমেন্টকে Digitize করে Digital format এ সংরক্ষণের ফলে ডকুমেন্টের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত হয় এবং ব্যবহার উপযোগিতা বাড়ে। যদি পান্ডুলিপিসমূহ উরমরঃরুব করে ডবন নধংব করে দেয়া হয় তাহলে পৃথিবী ব্যাপী এর অভিগমনের সুবিধা পাবে এবং দেশ ও বিদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে পাঠক এই পান্ডুলিপি ব্যবহার করতে পারবে।

উপসংহার:

বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ-প্রসারের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও কিন্তু পিছিয়ে নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারও সেই গতিশীল প্রযুক্তির সুফল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে প্রাকৃতিক ক্ষয় ও নানাবিধ কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে জ্ঞানের মূল্যবান সম্পদ গ্রন্থসমূহ স্থায়ীভাবে কম্পিউটারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পান্ডুলিপি শাখাই প্রথম তার পুথিগুলো ডিজিটাল ক্যামেরার মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পুঁথিসমূহের প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যের কথা বিবেচনা করেই এ কাজ করা হয়েছে। মানুষের জ্ঞানচর্চার আদি সাক্ষ্য হিসেবে হস্তলিখিত পান্ডুলিপির তাৎপর্য কোনও কালেই নিঃশেষিত হবে না। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।


তথ্যসূত্র

১. পারভীন, সৈয়দ ফরিদা, ও সুলতানা, শাহীন (সংকলন), পান্ডুলিপি বিষয়ক প্রবন্ধাবলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, ঢাকা, ২০১২
২. রফিকুল ইসলাম, ড. মোঃ, ঢাকার গ্রন্থাগারের ক্রমবিকাশ ও ব্যবস্থাপনা, সময় প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৮
৩. ইফতিখার-উল-আউয়াল (সম্পা), ঐতিহাসিক ঢাকা মহানগরী: বিবর্তন ও সম্ভাবনা, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ২০০৩
৪. আব্দুল্লাহ, ড. মোহাম্মদ, বাংলাদেশে ফারসি সাহিত্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮০
৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে তথ্য সংগ্রহ
৬. ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close