Blog Post

জাতির পিতার বইপ্রীতি ও সাহিত্যপ্রেম

কনক মনিরুল ইসলাম

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল অসম্ভব বইপ্রীতি ও সাহিত্যপ্রেম। বিশ্ব সাহিত্যে অবাধ বিচরণ ছিল জাতির পিতার। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বার্নার্ড শ, রবার্ট পেইন, বারট্রান্ড রাসেল, কেনেডি এবং মাও সেতুং-এর বহু বই। তিনি অবসর পেলেই বই নিয়ে বসে পড়তেন। বঙ্গবন্ধুর লেখা বিভিন্ন বই, চিঠিপত্র ও ভাষণে তাঁর সাহিত্যপ্রেমের প্রমাণ মিলে। তাঁর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং সদ্য প্রকাশিত ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন কবি ও সাহিত্যিকদের কথা উদ্ধৃত করেছেন যা তাঁর কাব্য ও সাহিত্যপ্রীতির বহি:প্রকাশ। তিনি সাহিত্যে স্থান করে নেওয়ার জন্য লেখেননি। লিখেছিলেন সময়ের প্রয়োজনে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানোর প্রয়াসে। তাঁর সেই লেখাই এখন আমাদের অতীতের জিজ্ঞাসাকে নিবৃত্ত করছে প্রতিনিয়ত।

বঙ্গবন্ধু কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, ছিলেন সকল পেশাজীবীর প্রতিনিধি। বাংলাদেশসহ বিশ্ব বরেণ্য সকল শিল্পী সাহিত্যিকদের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। কবি সাহিত্যিকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নে তিনি যুক্ত করেছিলেন শিক্ষক-প্রকৌশলী ও পেশাজীবীদের, শিল্পী সাহিত্যিকদের প্রশাসনের সঙ্গে রেখেছিলেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন সাহিত্যের একজন অনুরাগী পাঠক। ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বলেন, ‘শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকবৃন্দের সৃষ্টিশীল বিকাশের যে কোনো অন্তরায় আমি এবং আমার দল প্রতিহত করবো’। (রহমান, ২০১৫, পৃ. ৩০)

একবার আহমেদ কামাল নামে বঙ্গবন্ধুর জনৈক বন্ধু তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনার প্রিয় বই কি?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, “নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বার্নার্ড শ, কেনেডি এবং মাও সেতুং- এর গ্রন্থাবলী।’’ তাঁর এ কথার সত্যতা পাওয়া যায় উপরিউক্ত গ্রন্থকারদের সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞানপিপাসা দেখেই। একথা আর কারো কাছে অজানা নেই যে, বঙ্গবন্ধু কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা আউড়িয়ে যেতেন। এক্ষেত্রে তাঁর স্মৃতিশক্তির প্রাখর্য সর্বজনবিদিত। রবীন্দ্রনাথের প্রতি অটল ভক্তিই তাঁকে বাঙালী জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে সচেতন করেছিল।’ (ইসলাম, ২০১১, পৃ. ৮৪৮-৪৯)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বইপ্রেমিক ও সাহিত্য অনুরাগীই ছিলেন না, তিনি বাংলাদেশের শিক্ষা ও গ্রন্থাগার উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছিলেন, যার প্রতিফলন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে দেখতে পাই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষাখাতে ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় গ্রন্থাগার ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। (দৈনিক সংবাদ, ১৯ জুলাই, ১৯৭২)

বঙ্গবন্ধু কবিতা পড়তে এবং তাঁর বক্তব্যে কবিতার পঙ্ক্তি ব্যবহার করতে ভালোবাসতেন। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতাই বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্থ ছিল। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বঙ্গমাতা’ কবিতার পঙ্ক্তি ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি’ এবং ১৯৭২ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি কলকাতার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভাষণ দেবার সময় তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেছেন। ‘নিঃস্ব আমি রিক্ত আমি’ এবং ‘নাগিনীরা দিকে দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস’ তাঁর কণ্ঠে সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল বেশি। তাঁর অন্তর দখল করে রেখেছিলেন বিশ্বকবি। রাজনৈতিক জীবনে দুঃখ দৈন্য সংকটে আবৃত্তি করতেন, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা’ কিংবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে..’ বহুল পরিচিত চরণসমূহ। জেলে থাকার সময় তিনি ‘সঞ্চয়িতা’ হাতে তুলে নিতেন। বোঝা যায় একমাত্র সঙ্গী বা অনুপ্রেরণা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা একাডেমী আয়োজিত ১৯৭২ সালের ৮ই মে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ ও অপরিমেয় ত্যাগের বিনিময়ে। কিন্তু সত্য, শ্রেয়, ন্যায় ও স্বজাত্যের যে চেতনা বাঙালি কবিগুরুর কাছ থেকে লাভ করেছেন, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁরও অবদান অনেকখানি। বাঙালির সংগ্রাম আজ সার্থক হয়েছে। বাঙালির রবীন্দ্র সম্মাননার চেয়ে বড় কোন দৃষ্টান্ত আমার জানা নেই।’ (বিশ্বাস, ২০১৯, পৃ. ১৮)

বঙ্গবন্ধু সবসময় বাংলা সাহিত্যকে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। তার দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই ১৯৪৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে ভ্রমণকালে একই গাড়িতে করাচি আসার পথে উর্দুভাষী কয়েকজন পাকিস্তানিকে তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন। (রহমান, ২০১২, পৃ. ২১৭)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বইপ্রীতি ও রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এর প্রতি অনুরাগ সম্পর্কে একটি দুর্লভ তথ্য পাওয়া যায় দৈনিক বাংলার জনৈক সাংবাদিকের নেয়া বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের একটি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। সেই সাক্ষাৎকারে বেগম মুজিব বলেন, ‘কবিগুরুর অমর বাণীই বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের পাথেয়।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবনের এক অনন্য আদর্শ। সংগ্রামী জীবনের দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রতিপদে যখন ছিল পাকিস্তানি শাসকদের হিংস্র অত্যাচার, দুঃশাসনের কারাগারের লৌহপ্রকোষ্ঠ আর মৃত্যুর হাতছানি তাঁর জীবনকে করতো যন্ত্রণার্ত, সে বেদনার মুহূর্তগুলোতে কবিগুরুর অমর বাণীই বঙ্গবন্ধুকে সান্তনা দিতো, দিতো পথের সন্ধান’- বললেন বেগম শেখ মুজিব।

…..প্রতিবারই জেলে যাবার সময় বঙ্গবন্ধু ‘সঞ্চয়িতা’টা হাতে তুলে নিতেন। কারাগারের নিঃসঙ্গতায় বঙ্গবন্ধুর একমাত্র সহচর ছিল ‘সঞ্চয়িতা’। বইটার গায়ে পড়েছিল জেলের সেন্সরের অনেকগুলো সিল। অনেক যত্নে রাখা সত্ত্বেও সঞ্চয়িতা‘র কপিটা বহু ব্যবহারে পুরাতন হয়ে গিয়েছিল। কারাগারের মুহূর্তগুলোতে বঙ্গবন্ধু পড়াশোনা করতেন একাগ্রচিত্তে।

……বঙ্গবন্ধুর জীবনে রবীন্দ্রনাথ যে কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছে আজ তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। তবুও প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য বেগম মুজিবকে চঞ্চল দেখালো। লাজুক কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘‘কোন কারণে আমি মনোক্ষুন্ন হলে অতীতে বঙ্গবন্ধু আমাকে কবিগুরুর কবিতা শোনাবার প্রতিশ্রুতি দিতেন। আজো শত কাজের চাপে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও এতটুকু সময় পেলেই সন্তানদের নিয়ে তিনি কাব্য আলোচনা করেন। আবৃত্তি শোনান পরিবারের লোকদের।

রবীন্দ্র শতবার্ষিকীর সময় একবার বিশ্বস্ত লোককে দিয়ে আমি রবীন্দ্র রচনাবলীর পুরো একসেট কলকাতা থেকে আনিয়েছিলাম। ওর সামনে যখন উপহার হিসাবে বইগুলো উপস্থিত করলাম, খুশির আবেগে তিনি তখন প্রতি বিহ্ববল হয়ে পড়লেন। উজ্জল চোখ দুটো তুলে তিনি একবার শুধু তাকালেন। সে চোখে শিশুর মতো তৃপ্তি আর প্রগাঢ় কৃতজ্ঞতা। রবীন্দ্র-নজরুলের প্রতি অনুরাগ বঙ্গবন্ধুর শৌখিনতা নয় -এটা তাঁর ব্যক্তি জীবনের খোরাক, মানসিক শক্তির উৎস। তাঁর যে জীবন রাজনৈতিক চেতনায় অভিষিক্ত, সে চেতনারই অভিব্যক্তি প্রকাশের প্রেরণা রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য।’’ (দৈনিক বাংলা, ৮ মে ১৯৭২)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বইপ্রীতি সম্পর্কে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইতে লিখেছেন, ‘১৯৪৯ থেকে আব্বা যতবার জেলে গেছেন কয়েকখানা নির্দিষ্ট বই ছিল যা সব সময় আব্বার সঙ্গে থাকত। জেলখানার বই বেশিরভাগই জেল লাইব্রেরিতে দান করে দিতেন, কিন্তু আমার মা’র অনুরোধে এই বই কয়টা আব্বা কখনো দিতেন না। সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তার মধ্যে রবীন্দ্র-রচনাবলী, শরৎচন্দ্র, নজরুলের রচনা, বার্নার্ড শ’র কয়েকটা বইতে সেন্সর করার সিল দেয়া ছিল। জেলে কিছু পাঠালে সেন্সর করা হয়, অনুসন্ধান করা হয়, তারপর পাস হয়ে গেলে সিল মারা হয়। পরপর আব্বা কতবার জেলে গেলেন তার সিল এই বইগুলোতে ছিল। মা এই কয়টা বই খুব যত্ন করে রাখতেন। আব্বা জেল থেকে ছাড়া পেলেই খোঁজ নিতেন বইগুলো এনেছেন কিনা। যদিও অনেক বই জেলে পাঠানো হতো। মা প্রচুর বই কিনতেন আর জেলে পাঠাতেন। নিউ মার্কেটে মা’র সঙ্গে আমরাও যেতাম। বই পছন্দ করতাম, নিজেরাও কিনতাম। সব সময়ই বইকেনা ও পড়ার একটা রেওয়াজ আমাদের বাসায় ছিল। প্রচুর বই ছিল। সেই বইগুলো ওরা (পাকিস্তানিরা) নষ্ট করে। বইয়ের প্রতি ওদের আক্রোশও কম না। আমার খুবই কষ্ট হয় ঐ বইগুলোর জন্য যা ঐতিহাসিক দলিল হয়ে ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে সবই হারালাম।’ (হাসিনা, ২০১৪, পৃ. ৭০-৭১)

জেলবন্দী নিঃসঙ্গ জীবনেও বই ছিলো বঙ্গবন্ধুর একমাত্র অবলম্বন। ২১ ডিসেম্বর, ১৯৫০ সালে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট জেল থেকে বঙ্গবন্ধু একটি চিঠি লিখেছিলেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। সেই চিঠিটি তৎকালীন সরকার বাজেয়াপ্ত করলেও গবেষকরা পরবর্তী সময় উদ্ধার করেন। সেই চিঠিটিতে লেখা আছে- ‘Last October when we met in the Dacca Central Jail gate, you kindly promised to send some books for me. I have not yet received any book. You should not forget that I am alone and books are the only companion of mine’ (নিরীক্ষা, জুলাই- সেপ্টেম্বর, ২০১২, প্রেস ইনস্টিটিউট, ঢাকা।)

১৯৭২ সালে নিউইয়র্ক টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ডেভিড ফ্রস্ট কর্তৃক ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়িতে গৃহীত সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানি ফৌজ আমার সবকিছু লুণ্ঠন করেছে। কিন্তু এই বর্বর বাহিনী আমার আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, আমার সন্তানদের দ্রব্য-সামগ্রী লুণ্ঠন করেছে তাতে আমার দু:খ নাই। আমার দু:খ, ওরা আমার জীবনের ইতিহাসকে লুণ্ঠন করেছে। আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনের দিনলিপি ছিল। আমার একটি সুন্দর লাইব্রেরি ছিল। বর্বররা আমার প্রত্যেকটি বই আর মূল্যবান দলিলপত্র লুণ্ঠন করেছে। সবকিছুই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিয়ে গেছে।’ (সালিম, ১৯৯৮, পৃ. ১০৪)

তিনি যখন কলকাতা ‘বেকার’ হোস্টেলে থাকতেন আর ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়ন করতেন তখন থেকেই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতির ছবক গ্রহণ করতেন। সেই সময় এই বেকার হোস্টেল ছিল রাজনীতির একটা আখড়া। তাঁর ছোটবেলা থেকে আজন্ম লালিত যে পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নের পথ খুঁজছিলেন তিনি সর্বত্র। এখানে রাজনীতি চর্চা করতে গিয়েও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ ও বাঙালির সার্বিক আশু মুক্তি কামনা। বলতে গেলে, ঠিক এ সময় থেকেই তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি নজরুলের কাব্যের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। একদিকে রাজনীতি ও অন্যদিকে সাহিত্য চর্চা এ দুটো ছিল তাঁর একান্ত আপনজনের মতো। বাংলার মানুষ তিনি-বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ-বাতাস, বাংলার পানি আর বাংলার সবুজের অসীম সমারোহ তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো। বাংলার মাটির রসে সিক্ত হয়ে প্রাচীণ যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত যে সাহিত্য বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছিল তাকে শেখ মুজিব কঠোর বাস্তবের নির্মম পাষাণ স্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে থেকেও উপেক্ষা করতে পারেননি। কাব্য সুন্দরীর ডাকে তিনি সাড়া দিয়েছিলেন, তাই তাঁর চরিত্রের ভেতর কোমল-কঠোরের সমাবেশ দৃষ্টি গোচর হয়। (ইসলাম, ২০১১, পৃ. ৮৪৯)

বঙ্গবন্ধুর সাহিত্য ও বইপ্রীতি তাঁর পরিবারের মধ্যেও প্রবাহিত হয়েছিল। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন লেখনীতেও তাঁর পরিবারে সাহিত্য ও বইপ্রীতির নানা দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে যে গ্রন্থাগার দিবস পালন করা হয় সে কৃতিত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্রতিবছর ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দেশের জনগণের পাঠাভ্যাস সৃষ্টি এবং সরকারি বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোর কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী এ দিবসটি উদযাপন করা হয়ে থাকে।

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শন সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বই পাঠের বিকল্প নেই। বাংলার মানুষ ও বাংলার মাটির প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে গভীর দরদ, মমত্বের সৃষ্টি হয়েছিল তা তাঁর বইপ্রীতি থেকেই। বাংলার প্রতিটি মানুষকে প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে বই পড়া ও সাহিত্য প্রীতির বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে হলে আমাদের বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথই অনুসরণ করতে হবে।


তথ্যসূত্র:

  1. রহমান, আতিউর ২০১৫,‘বাঙালি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক বঙ্গবন্ধু’, শোকাশ্রু, ঢাকাঃ বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদ, পৃ. ৩০।
  2. বিশ্বাস, মিল্টন ২০১৯, শিল্প সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু, ঢাকাঃ নবযুগ প্রকাশনী, পৃ. ১৮।
  3. ইসলাম, মাযহারুল ২০১১, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, ঢাকাঃ আগামী প্রকাশনী, পৃ. ৮৪৯।
  4. রহমান, শেখ মুজিবুর ২০১২, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকাঃ দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, পৃ. ২১৭।
  5. সালিম, আহমেদ ১৯৯৮, পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিবের বন্দি জীবন, ঢাকাঃ সাহিত্য প্রকাশ, পৃ. ১০৪।
  6. হাসিনা, শেখ ২০১৪, শেখ মুজিব আমার পিতা, ঢাকাঃ আগামী প্রকাশনী, পৃ. ৭০-৭১।

লেখক: কনক মনিরুল ইসলাম
লাইব্রেরিয়ান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
ই-মেইল: kanokmonir@gmail.com

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close