Blog Post

গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার সমস্যা ও সম্ভাবনা: পরিপ্রেক্ষিত একাডেমিক গ্রন্থাগার

ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম, গ্রস্থাগার বিভাগের প্রধান, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

ভূমিকা:

ড. মোঃ রফিকুল ইসলামগ্রন্থাগার হচ্ছে সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতিবিম্ব। আজকের মতো সুসজ্জিত গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব পাওয়া না গেলেও সভ্যতার একমাত্র ধারক ও বাহক হিসেবে গ্রন্থাগার স্বীকৃত। প্রাচীনকালের যে সকল সভ্যতার নির্দশন পাওয়া যায়, তার প্রত্যেকটি সভ্যতায়ই গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব বিদ্যমান, যদিও সে সকল গ্রন্থাগার তৎকালীন রাজপরিবার এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। তখনকার গ্রন্থাগারগুলো ছিল গণমানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। শুধু তাই নয়, গ্রন্থাগার ছিল তখনকার সমাজে আভিজাত্যের প্রতিক। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষের ধারণা ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে। তাই বর্তমানে সময়ে গ্রন্থাগার সমাজের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। তাছাড়া জাতীয় উন্নয়নে গ্রন্থাগার একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানব সভ্যতার শুরু থেকে ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা অঞ্চলের গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পাল আমলে নালন্দা মহাবিদ্যালয় গ্রন্থাগারের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে গ্রন্থাগারের সন্ধান পাওয়া যায়। মোঘল শাসনামলে  ১৬১০ সালে ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী ঘোষণা করা হয়। তখন থেকেই অর্থাৎ সতের শতক থেকে ঢাকায় বুদ্ধিজীবী  সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যদিও মোঘল আমলে কোন গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি। তথাপি ঢাকার নগরীর বিশাল নগরায়নের ধারা থেকেই অনুমান করা যায় যে, এখানে বিভিন্ন প্রকার গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে ছিল। ব্রিটিশ যুগে আঠার ও উনিশ শতকে ঢাকায় গণগ্রন্থাগারের ইতিহাস পাওয়া যায়। তখন থেকে অদ্যবধি বহু গ্রন্থাগারের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে।

গ্রন্থাগারের ইংরেজি প্রতিশব্দ Library এর উৎপত্তি ঘটেছে মূলত ল্যাটিন শব্দ Liber থেকে । Liber শব্দটি থেকে এসেছে Librarium শব্দটি, যার অর্থ ‘বই রাখার স্থান’, এটি থেকে উদ্ভূত হয়েছে ফরাসি শব্দ Librarie এবং শেষে ইংরেজি Library।

ইউনেস্কো-র সংজ্ঞা মতে, ‘মুদ্রিত বই, সাময়িকী অথবা অন্য যে কোনো চিত্রসমৃদ্ধ বা শ্রবণ-দর্শন সামগ্রীর একটি সংগঠিত সংগ্রহ হলো গ্রন্থাগার যেখানে পাঠকের তথ্য, গবেষণা, শিক্ষা অথবা বিনোদন চাহিদা মেটানোর কাজে বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারকে সহজতর করার জন্য নিয়োজিত থাকবেন কিছু কর্মী।’

জে এইচ শেরা বলেন- “Library is a product of cultural maturation. It came into being when societies ceased to be nomadic and became urbanized, and when graphic records became important to effective operation of organized human relationship”2

গ্রন্থাগার সমাজে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, সমাজে মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম।  গ্রন্থাগার হলো জ্ঞান ও তথ্য ভান্ডার। যা পাঠোপযোগী মুদ্রিত ও অমুদ্রিত সকল সংগ্রহ সকল সংগ্রহ এবং দৃশ্য ও শ্রাব্য সকল সংগ্রহের সমষ্টি। এই সামগ্রিক সংগ্রহ মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির সৃজনশীল নিদর্শন, সামাজিক চেতনার উন্মেষ ও বিকাশের কার্যকর মাধ্যম এবং জ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্যমূলক প্রতিষ্ঠান। পুস্তক ও অন্যান্য সামগ্রী যদি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সংগৃহিত হয় তাকে কিন্তু গ্রন্থাগার বলা যায় না, তা হবে সমাহার। গ্রন্থাগারের মূল উদ্দেশ্য হলো এর সুষ্ঠু ব্যবহার ও জ্ঞান চর্চা।

ব্যবস্থাপনা কি?

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সঙ্গতি রেখে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে।  বস্তুত মানুষ যখন থেকে সংঘবদ্ধ হয়ে সমাজে বসবাসের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তখন থেকেই ব্যবস্থাপনার সূত্রপাত ঘটেছে।  সভ্যতার বিবর্তনের সাথে সাথে আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডের জটিলতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।  আধুনিক যান্ত্রিক ও প্রযুক্তি নির্ভর সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে এ ব্যবস্থাপক শ্রেণি। একটি দেশের  আর্থ-সামাজিক ও শিল্পীর উন্নয়নে ব্যবস্থাপকগণ পালন করে এক মুখ্য ভূমিকা। কর্মক্ষেত্রে তাঁদের সম্পাদিত কার্যক্রম পরিকল্পনা, সংগঠন, নেতৃত্বদান ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সমম্বয়ে আবির্ভূত বিষয়ই (ডিসিপ্লিনই) হচ্ছে ব্যবস্থাপনা।

ব্যবস্থাপনা শব্দটি ব্যাপক অর্থবহ এবং বিভিন্ন মনীষী বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। ইটালীয় শব্দ ম্যানেজিয়ার (Maneggiare) ও ম্যানেজ (Manage) থেকে ইংরেজি Management শব্দটির উৎপত্তি হয়; যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ব্যবস্থাপনা।

Maneggiare শব্দের অর্থ হল অশ্বকে পরিচালনা করা। কিন্তু কালের বিবর্তনের অর্থেরও পরিবর্তন হয।  বর্তমানে এটি মূলত মানব জাতিকে পরিচালনা করার অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। Manage শব্দটির অর্থ হল কর্তৃত্ব করা। ব্যবস্থাপনা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সফলকাম হয়। বস্তত বর্তমানে ব্যবস্থাপনার অর্থই হচ্ছে, মানবীয় ও বস্তুগত সম্পদসমূহের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা।

ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ওয়েরিস ও কুঞ্জু বলেন-

“Management is the process of designing and maintaining an environment in which individuals. Working together in groups, efficiently accomplish selected aims.”

উপরি-উক্ত সংজ্ঞার আলোকে ব্যবস্থাপনাকে মূলত প্রতিষ্ঠানের এমন একটি অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যা বিভিন্ন কলা-কৌশল ও কার্যক্রমের মাধ্যমে এবং জনশক্তিসহ অন্যান্য উপাদানের সহায়তায় স্বল্পতম ব্যয়ে সর্বাধিক প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়। ব্যবস্থাপনা মুলত একটি দল বা প্রতিষ্ঠানের উপকরণাদির দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত উদ্দেশ্য অর্জনের নিমিত্তে একটি কর্ম-প্রক্রিয়া বিশেষ ব্যবস্থাপনার সাথে গ্রন্থাগারের সম্পর্কের কি বা গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা কি? তা নিম্নে বর্ণিত হলো-

গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা:

বাংলাদেশে গ্রন্থাগার ব্যবস্থার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সেবার মান উন্নয়ন ও দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণ উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করে আসছে। উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পাঠ্যসামগ্রী সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন, ওয়েবসাইট প্রর্বতন, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রদান, পর্যাপ্ত কম্পিউটার ক্রয় ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার উন্নয়ন ইত্যাদি। সাধারণভাবে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলা যায়-

Library management is a sub-discipline of institutional management that focuses on specific issues faced by libraries and library management professionals.

মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই ব্যবস্থাপনার প্রচলন শুরু হয়েছিল। বিংশ শতকের ব্যবস্থাপনা হলো জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান শাখা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্যবস্থাপনা সমাজের উন্নতি ও কল্যাণের সোপানরুপে কাজ করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেখা গেল যে উন্নত ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ফলে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জাপান, জার্মানী ও রাশিয়া ইত্যাদি দেশসমূহ প্রভুত উন্নতি লাভ করে।

প্রশাসন যে লক্ষ্য ও নীতি নির্ধারণ করে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা রুপায়নের চেষ্টা করে। ব্যবস্থাপনা প্রশাসনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গ্রন্থাগার সংগঠনের জন্য প্রশাসন যে নীতি নির্ধারণ করে, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করাকেই গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বলে।

সাধারণভাবে কোন কার্যসূচির নির্বাহ করার পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনা বলা হয়।  ব্যবস্থাপনার ধারণা অনেক পুরাকালের। ক্রমাম্বয়ে এর সংজ্ঞার পরিবর্তিত রুপ দেখা যায় এবং পরিবর্তিত রুপটিই বর্তমানে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার যুগে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

গ্রন্থাগার পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় এবং গ্রন্থাগারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রুপায়নের ধারাবাহিক কার্যকরী দিকগুলো গ্রন্থাগার অন্তর্ভুক্ত। একটি গ্রন্থাগারের উন্নতি, অবনতি কিংবা ব্যর্থতা অথবা কর্মোদ্যোগ, কর্মহীনতা নির্ভর করে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার উপর। পাঠক ও ব্যবহারকারীদের যথার্থরুপে গ্রন্থাগার-মনস্ক করা, তাঁদের প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধুনিকতম পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে গ্রন্থাগার ব্যবস্থার যথাযোগ্য উন্নতি সাধন আধুনিক গ্রন্থাগার পদ্ধতির পরিচায়ক।  পাঠক ও ব্যবহারকারী গ্রন্থাগারের যে ব্যবস্থা ও রুপ দেখতে পান ও তাদের সঙ্গে পরিচিত হন, তা’হল গ্রন্থাগারের কার্যকরী দিক।  সেই দিক দিয়ে গ্রন্থাগার খবুই  গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রন্থাগার যেহেতু একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের কল্যাণেই তার টিকে থাকা, সেহেতু অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দিকে গ্রন্থাগারকে ফিরে তাকাতে হয়।  ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহকে গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। আসলে গ্রন্থাগারিকও একজন প্রশাসক। গ্রন্থাগারিক যেমন একদিকে ব্যবস্থাপনা শাস্ত্রের তত্ত্বসমূহকে স্বরণে রাখতে হয়। অপরদিকে তেমনি জনপ্রশাসনের নীতিসমূহের দিকেও সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে হয়। তাই গ্রন্থাগারের লক্ষ্য হয় ন্যূনতম ব্যয়ে পাঠ্য দ্রব্যের অধিকতর ব্যবহার। গ্রন্থাগারিককে শুধু বিদ্বান হলেই চলে না, তাকে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার মূলনীতি সম্বন্ধেও হতে হয় পরম বোদ্ধা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার স্তরে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার থাকার অনুবিধি আছে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার প্রকল্পের ওয়ার্কশপ পেপারে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় একজন শিক্ষা ব্যবস্থাপকের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে-

Library is the soul of every education institution.The education manager should appreciate it and take necessary measures to equip library with qualified librarian, Supporting staff, books and catalogues, open shelves, sitting arrangement and reading facilities. On every working day library should remain open for a reasonable time. Provision should be there to keep it open during vacation and when necessary. Above all, the education manager will undertake all possible measures to grow a reading habit among the students.১০

গ্রন্থাগার নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন:

আজকের এ আধুনিক যুগে গ্রন্থাগার সার্ভিসকে অত্যাবশ্যকীয় বলে ধরা হয়। উন্নত বিশ্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সাথে সাথে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করা হয় এবং সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হয়। গ্রন্থাগার ব্যতীত কোনো প্রতিষ্ঠান চলতে পারে এটা তাঁরা কল্পনাও করতে পারে না। তাই সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত, শিক্ষার মানও উন্নত। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার থাকলেও মহাবিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা খুবই করুণ। কোনো কোনো কলেজের সমৃদ্ধশালী গ্রন্থাগার থাকলেও অধিকাংশ কলেজে গ্রন্থাগারের অবস্থা ভাল নয়।  কোনো কোনো স্কুল গ্রন্থাগার থাকলেও অধিকাংশ স্কুলে গ্রন্থাগার নেই। এর পরিবর্তন যত তাড়াতাড়ি হবে ততই দেশের জন্য সমাজের জন্য মঙ্গল হবে।

১৯৯৭ সালের ২৩ এপ্রিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রতি এক নির্দেশনামা জারি করা হয়। তাতে বলা হয়, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার একাডেমিক স্বীকৃতিদানের শর্তাবলির অন্যতম হলো সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ২০০০ কপি বই থাকতে হবে। অনুরুপ আইন ব্রিটেনে করা হয়েছে ১৮৭০ সালে। আরও বলা হয়েছে যে, গ্রন্থাগার ভবন ছাড়া বিদ্যালয় ও কলেজেকে স্বীকৃতি দেয়া যাবে না। ১১

গ্রন্থাগার প্রশাসনে ব্যবস্থাপনার নীতিগুলোর সঠিকভাবে প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় না। অনেক সময় গ্রন্থাগারিক বা পরিচালক তাঁর নিজম্ব মতানুসারে গ্রন্থাগার পরিচালনা করতে পারেন না। বিভিন্ন প্রকার গ্রন্থাগারের ব্যবস্থাপনার বর্তমান অবস্থা আলোচনা করলেই বুঝা যাবে আমাদের দেশের গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার স্বরুপ।

গ্রন্থাগারটিতে স্বল্পসংখ্যক পেশাজীবী ও দক্ষতা সম্পন্ন যোগ্য লোক রয়েছে।  কিন্তু উপযুক্ত কর্মসৃষ্টির অভাবে জনশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে ব্যবহার করা যায় না।  অন্যদিকে যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব বন্টন না করার জন্য সম্ভাব্য জনশক্তির ব্যবহার সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয় না। এর ফলে কর্মবিমুখীনতা জন্ম নেয়।  এছাড়াও পেশাজীবী ও যোগ্য জনশক্তির অধিকাংশকেই যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি না দিয়ে স্থবির করে রাখা হয়েছে। ফলে কর্মস্পৃহা যেমনি বৃদ্ধি পায় না তেমনি স্বাভাবিক মানসম্পন্ন সেবাদান বিঘ্নিত হয়। ১২

প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য নিজস্ব নীতি প্রণয়ন করা আবশ্যক। গ্রন্থাগার নীতিতে যে সব বিষয়ে সুম্পষ্ট বিবৃতি থাকা আবশ্যক তা হলো-

  • ক. গ্রন্থাগার ব্যবহারের জন্য শিক্ষার্থীদের পাঠকক্ষে পড়ার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা;
  • খ. কোনো ধরণের তথ্যসম্পদ সংগ্রহ করা হবে;
  • গ. শিক্ষকদের জন্য কী আলাদা সংগ্রহ গড়ে তোলা হবে;
  • ঘ. গ্রন্থাগারের জন্য কী আলাদা ভবন আছে, অন্য কোন ভবনে স্থান বরাদ্দ করবে? কী পরিমাণ স্থান বরাদ্দ করা হবে?
  • ঙ. নিয়মিতভাবে কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করবে? নিজস্ব প্রকল্প বা সরকার থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে?
  • চ. কী কী সেবাসামগ্রী থাকবে;
  • ছ. গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার জন্য ভৌত সুবিধা, জনশক্তি ও দ্রব্য-সামগ্রী কী পরিমাণ সরবরাহ করা সম্ভব। ১৩

গ্রন্থাগার নীতি প্রণয়ন:

প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সিনিয়র শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক, তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞের সমম্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নীতি প্রণীত হতে পারে। প্রণীত নীতির ভিত্তিতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। প্রণীত গ্রন্থাগার নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রধান গ্রন্থাগারিক বা গ্রন্থাগারিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। গ্রন্থাগার পরিকল্পনায়-ক. গ্রন্থাগারের বিভাগগুলোর গঠন, অবস্থান, পারিস্পারিক সম্পর্ক ও বিভাগসমূহের গতিশীলতা. খ. গ্রন্থাগারের উপকরণসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ, বিন্যাস ও ব্যবহারের পদ্ধতি নির্ণয়, গ. গ্রন্থাগারের লক্ষ্য অর্জন ও উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কর্মধারার সামগ্রিক পরিকল্পিত রূপ, কর্মীবৃন্দ পরিচালনা এবং কর্মসূচি নির্ধারণ ও সমম্বয় প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত হবে।

গ্রন্থাগারে সংগ্রহ নীতি:

প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থাগারের একটি সুস্পষ্ট সংগ্রহ নীতি ও সংগ্রহ পদ্ধতি থাকা আবশ্যক।

এ নীতি অবশ্য প্রতিষ্ঠানভেদে কিছুটা পৃথক হতে পারে। উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর-

“Conservation of Universe of knowledge, dissemination and imparting instruction and taking up research publication and extension programmes”

এর উপর ভিত্তি করে সংগ্রহ গড়ে ওঠে।  আর এসব উপাদানগুলোই একটি শিক্ষায়তানিক গ্রন্থাগারের সংগ্রহ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার সংগ্রহ নীতির বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রভাবাম্বিত করে থাকে। সংগ্রহ নীতির উপাদানগুলো নিম্নরূপ-

বর্তমান সংগ্রহ সংখ্যা, বর্তমান সংগ্রহের প্রকৃতি, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান ও শিক্ষণ পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের/ব্যবহারকারীদের সংখ্যা, শিক্ষক সংখ্যা ও তাদের তথ্য চাহিদার প্রকৃতি, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা (অবকাঠামো, জনশক্তি ও আর্থিক), গবেষণা কার্যক্রম, সহ-শিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম ও তথ্যসম্পদ সংগঠনের প্রকৃতি।

শিক্ষা বিষয়ক সংগ্রহ:

বর্তমানে শিক্ষা একটি আলাদা বিষয় (Discipline) হিসেবে বিবেচিত। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান/উপপ্রাধান ও শিক্ষকবৃন্দ কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পর্কে অবশ্যই হালনাগাদ তথ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাক্রম, শিক্ষানীতি, শিক্ষার ইতিহাস, বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, মূল্যায়ন ও পরীক্ষা পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার একটি স্বতন্ত্র সংগ্রহ গড়ে তোলা আবশ্যক।

তথ্য সম্পদের প্রকৃতি:

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার কোন ধরণের তথ্যসম্পদ গড়ে তোলা হবে এবং এর প্রকৃতি কী ইত্যাদি সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা থাকতে হবে। যে ডকুমেন্ট বা উপকরণে জ্ঞান, তথ্য ও ডাটা সন্নিবেশিত থাকে।  এ উপকরণ হতে পারে মুদ্রিত কিংবা অমুদ্রিত বা শ্রবণ-দর্শন, যেমন-কম্পিউটার ডিস্ক।  কলেজ গ্রন্থাগার/তথ্যকেন্দ্র উপযোগী সংগ্রহের একটি নমুনা নিয়ে বর্ণনা করা হয়। তা হলো-সাধারণ রেফারেন্স গ্রন্থবলি অভিধান এবং বিশ্বকোষ জাতীয় গ্রন্থাবলি Encyclopedia Britannica, Encyclopedia American ও বাংলা বিশ্বকোষ ইত্যাদি। এছাড়াও রেফারেন্স বই যেমন-এটলাস, গ্লোব, ডাইরেক্টরি, জীবনীকোষ ও গ্রন্থপঞ্জি ইত্যাদি। প্রতিটি গ্রন্থাগারে সাময়িকী বা জার্নাল জাতীয় প্রকাশনা নিয়মিত সংগ্রহ করা উচিত। ১৪

নন-প্রিন্ট ম্যাটেরিয়ালস ও শিখন সম্পদ:

বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে কাগজে মুদ্রিত তথ্যের পাশাপাশি শ্রবণ-দর্শন সামগ্রীতেও তথ্য বাজারজাত হচ্ছে। এজন্য আধুনিক গ্রন্থাগারগুলোতে প্রিন্ট ম্যাটেরিয়ালস শাখা ও নন-প্রিন্ট ম্যাটেরিয়ালস শাখা নামে পৃথক শাখা দেখা যায়। নন-প্রিন্ট ম্যাটেরিয়ালসসমূহ-স্লাইড, ফিল্মস্ট্রিপ, টেপ-রেকর্ড, মোশন পিকচার (মুভি/ফিল্ম), টেলিভিশন প্রোগ্রাম, প্রোগ্রামড ম্যাটেরিয়াল এবং কম্পিউটার ডিস্ক ইত্যাদি।

তথ্যসম্পদ নির্বাচন ও এর উৎসসমূহ:

প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক বইপুস্তক (ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামের) দেড় লক্ষাধিক জার্নাল এবং লক্ষ লক্ষ নন-বুক ম্যাটেরিয়ালস প্রকাশিত হয়। তথ্য কিভাবে কারা উৎপাদন করছে এ বিষয়ে শিক্ষাকর্মীদের ও গ্রন্থাগারকর্মীদের অবশ্যই জানা থাকা বাঞ্ছনীয়।  উৎসসমূহ নিম্নরূপ- দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক প্রকাশনা সংস্থাসমূহের প্রকাশনার তালিকা, সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনার তালিকা, বিভিন্ন দেশের জাতীয় গ্রন্থপঞ্জি ও সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রকাশনা ইত্যাদি।

তথ্যসম্পদ ব্যবহার উপযোগীকরণ:

গ্রন্থাগার ও তথ্য কেন্দ্রের তথ্যোপকরণগুলো বুদ্ধিবৃক্তিক কাজে ব্যবহৃত হয় বিধায় এগুলো ব্যবহারোপযোগী করার জন্য প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ার। নিম্নের স্তরগুলো সম্পন্ন করে তথ্যসম্পদগুলো পাঠপোযোগী করতে হয়।

সংযোজনকরণ:

একটি গ্রন্থাগার যে সব তথ্যসম্পদ সংগ্রহ করা হয় তা সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডভুক্ত করা আবশ্যক। এটাকে সংযোজন কার্য বা অ্যাকসেশনিং বলা হয়। একটি সংযোজন রেজিস্টার ও একটি ডকুমেন্টের জন্য ন্যূনতম সংযোজন সংখ্যা, গ্রন্থাগার, শিরোনাম, সংস্করণ, প্রকাশন, প্রকাশ স্থান ও সাল, উৎস ও মূল্য ইত্যাদি তথ্য থাকা বাঞ্ছনীয়।  একটি সংযোজন সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে চলবে। শেষ সংযোজন নম্বরটি হলো ঐ গ্রন্থাগারের সংগ্রহ সংখ্যার নির্দেশক।  এ রেকর্ড অডিট কার্য এবং যে কোনো গ্রন্থ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সহায়তা করে। ১৫

ক্যাটালগিং ও ক্লাসিফিকেশন:

শ্রেণিকরণ ও সূচিকরণ ছাড়া গ্রন্থাগারকে গুদামের সঙ্গে তুলনা করা চলে। একটি গ্রন্থাগারে কী আছে, কোথায় আছে, তা সূচিকরণ ও শ্রেণিকরণই বলে দিবে। গ্রন্থাগার ব্যবহারকারীরা সাধারণত লেখক, শিরোনাম বিষয়বস্তুর দৃষ্টিকোণ হতে তার কাঙ্খিত তথ্য বা গ্রন্থ অনুসন্ধান করে থাকে।  ক্যাটালগ বা সূচিকরণ এ অনুসন্ধানের উত্তর, আর শ্রেণিকরণ তার অবস্থান জানিয়ে দেয়।  শ্রেণিনম্বরের ভিত্তিতেই সংগৃহীত তথ্যসম্পদ শেলভিং করা হয়। প্রস্ততিকরণের জন্য উপকরণসমূহ-ডিউই ডেসিম্যাল ক্লাসিফিকেশন সিডিউল, ইনডেক্সও টেবিল-১ সেট, সেয়ার্স লিস্ট অব সাবজেস্ট হেডিং , এএসিআর-২ ও ক্যাটালগ কার্ড, বুক পকেট, বুক কার্ড ও বুক স্লিপ ইত্যাদি।

গ্রন্থাগারের অবকাঠামো, জনশক্তি ও অর্থায়ন:

যে কোনো সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্য জনশক্তি, সামগ্রী ও অর্থ হলো অন্যতম উপাদান। প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিতে একটি কলেজ যদি একটি প্রতিষ্ঠান হয় তাহলে গ্রন্থাগার ও তথ্যকেন্দ্র হলো একটি সাব-সিস্টেম। কাজেই গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার জন্যও উপর্যুক্ত উপাদানগুলো সমভাবে আবশ্যক। গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিষয়টি Input-Process-Output এর ফ্রেমওয়ার্ক নিম্নে ছকের মাধ্যমে দেখানো হলো-

ভৌত অব-কাঠামো:

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার ও তথ্য কেন্দ্রের আকার কেমন হবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মূলত গ্রন্থাগারের আয়তন প্রতিষ্ঠানের মোট শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংখ্যা, পাঠদানের বিষয়ের সংখ্যা, শ্রেণিতে পাঠদানের সময় কত সংখ্যক শিক্ষার্থী যুক্ত থাকবে ইত্যাদি উপাদানের উপর নির্ভর করে।  কোনো শিক্ষার্থী তার শিখন সংশ্লিষ্ট কাজ ছাড়া গ্রন্থাগারে খুব কমই আসে।  সাধারণত ক্লাসনোট আপটুডেট করা কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি, কোন বিষয়ে সহপাঠিদের সঙ্গে আলোচনা করা ও পত্র-পত্রিকা পড়ার জন্যই গ্রন্থাগারে আসে। তবে একটি সাধারণ সূত্র হলো একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর ১০% যে পাঠকক্ষে বসে পড়াশুনার সুযোগ পেতে পারে। এর সঙ্গে আবশ্যকীয় সুবিধাদির পরিকল্পনা নিম্নে বর্ণিত হলো-

আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি:

  • ক. পাঠ কক্ষে থাকবে রিডিং টেবিল, চেয়ার, শেলফ, কার্ড ক্যাটালগ ক্যাবিনেট, কাউন্টার ও ডেস্ক, ফাইল ক্যাবিনেট ও প্রদর্শনীয় কেস ইত্যাদি।
  • খ. গ্রন্থাগারের অফিসকক্ষে কস্পিউটার, স্ক্যানার মেশিন, বারকোড রিডার, ডুপ্লিকেটর মেশিন, ডেস্ক, চেয়ার, শেলফ, চার্জিং ট্রে ফাইল, বুক ট্রাক ও ট্রলি।
  • গ. বিশেষ পরিসরের জন্য মাইক্রোচিপ-মাইক্রোফিল্ম-মাইক্রোকার্ড রিডার, ফনোগ্রাফ রেকর্ড প্লেয়ার, টেপ রেকর্ডার, মোশন পিকচার মেশিন, ভিত্তিও টেপ ও ফটোকপিয়ার ইত্যাদি।
  • ঘ.অন্যান্য আসবাবপত্রের মধ্যে গ্রন্থ ও সাময়িকী প্রদর্শনী র‌্যাক, সাময়িকী র‌্যাক, মাইক্রোফিল্ম ও মাইক্রোফিস ক্যাবিনেট, প্যাম্পলেট, মানচিত্র, ক্যাবিনেট ইত্যাদি। ১৬

অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ সময়ে একাডেমিক ও অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনের গ্রন্থাগার বিকাশের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করেছে। ফলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারসমূহ বিগত প্রায় দুই শতক ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু তারা শিক্ষার যোগ্য সহযোগী হতে পারেনি।

জনবল কাঠামো:

অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ সময়ে একাডেমিক ও অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনের গ্রন্থাগার বিকাশের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করেছে। ফলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারসমূহ বিগত প্রায় দুই শতক ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু তারা শিক্ষার যোগ্য সহযোগী হতে পারেনি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারগুলো উন্নয়নের নতুন নতুন প্রচেষ্টা করা হয়। তথাপি নানা কারণে এদের ফল ব্যাহত হয়; অর্থাভাব, অযৌক্তিক ব্যবস্থাপনা এবং গণশিক্ষার সুযোগের অভাব, এর সবগুলোয় সিষ্টেমের মধ্যে অন্তর্নিহিত ছিল। সমাজের সাধারণ সামাজিক অবস্থা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিদেশী ভাষা এক ধরণের পাঠ্যপুস্তক নির্ভরশীল বাঁধাধরা শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর ফলে গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুফল ব্যাহত হয়। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় গ্রন্থাগারের ভূমিকা গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৭ গ্রন্থাগার ব্যবস্থার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সেবার মান উন্নয়ন ও দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করে আসছে। উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পাঠ্যসামগ্রী সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন, ওয়েবসাইট প্রবর্তন, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রদান, পর্যাপ্ত কম্পিউটার ক্রয় ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার উন্নয়ন ইত্যাদি। এ সকল কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি গ্রন্থাগার স্ব স্ব জনবলের একটি কাঠামো তৈরি করেছে।  ১৮

ড. কুদরত-এ-খুদা কমিশন ১৯৭৪ এর রিপোর্টে বিভিন্ন কলেজের গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার জন্য নিম্নবর্ণিত জনবলের সুপারিশ করেছে।  তা হলো-

পদবি ন্যূনতম যোগ্যতা বড় কলেজ

(ছাত্র সংখ্যা ১০০০ এর উর্ধ্বে)

মাঝারি কলেজ

(ছাত্র সংখ্যা ৫০০-১০০০ এর মধ্যে)

ছোট কলেজ

(ছাত্র সংখ্যা ৫০০ এর কম)

মন্তব্য
গ্রন্থাগারিক ডিগ্রি পাসসহ গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা ০১ জন ০১ জন ০১ জন বড় কলেজের গ্রন্থাগারিক হবেন মাস্টাস ডিগ্রি
সহকারী গ্রন্থাগারিক ০১ জন ০১ জন ০১ জন
ক্যাটালগার ০২ জন ০১ জন ০১ জন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন উচ্চ মাধ্যমিক পাসসহ গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে প্রশিক্ষণ সার্টিফিকেটধারী
গ্রন্থাগার সহকারী উচ্চ মাধ্যমিক পাসসহ গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে প্রশিক্ষণ সার্টিফিকেটধারী ০২ জন ০১ জন ০১ জন
পুস্তক পরিবেশক ০৩ জন ০২ জন ০১ জন
পিয়ন অষ্টম শ্রেণি পাস ০৩ জন ০২ জন ০১ জন
মোট ১২ জন ০৮ জন ০৬ জন

যে সব কলেজ অনার্স ও পোস্ট গ্রাজুয়েট ক্লাস চালু রয়েছে। সে সব কলেজে অতিরিক্ত একজন সহকারী গ্রন্থাগারিক ও অতিরিক্ত দুজন পুস্তক পরিবেশকের প্রয়োজন হবে। কলেজের শ্রেণি বিভাজন বর্তমানে শুধু ছাত্র সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, সঙ্গে শিক্ষা কর্মসূচি বিবেচনা করতে হয়। উন্নত বিশ্বে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারকর্মীর সংখ্যা ও মর্যাদা শিক্ষা কর্মসূচির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক প্রফেসর এর সমমর্যাদা পায়। কাজেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কলেজগুলোর স্ট্যাফিং প্যাটার্ন নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফিং প্যাটার্ন বিবেচনায় আনতে হবে। ১৯

গ্রন্থাগারের অর্থায়ন:

গ্রন্থাগার একটি ব্যয়ধর্মী সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রথমেই প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। পরবর্তীকালে প্রধানত গ্রন্থাগারের তথ্যসম্পদ সংগ্রহকে হালনাগাদ রাখার জন্য পৌনঃপুনিক ব্যয় হয়ে থাকে। কলেজ গ্রন্থাগারের অর্থায়নের জন্য নিম্নবর্ণিত উৎসসমূহকে বিবেচনা করা যেতে পারে।

  • ক.সরকারি অর্থ বরাদ্দ/অনুদান।
  • খ.শিক্ষার্থীদের নিকট হতে মাসিক বা বাৎসরিক আদায়যোগ্য গ্রন্থাগার ফি।
  • গ.দানশীল ব্যক্তি/ সংস্থার নিকট হতে প্রাপ্ত অনুদান (ক্যাশ/সামগ্রী)।
  • ঘ.ফটোকপি সেবা/ অনুবাদ সেবা, গ্রন্থপঞ্জি ও অন্যান্য সেবা হতে প্রাপ্ত আয়।
  • চ.গ্রন্থাগার সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা বিক্রয় হতে আয়।
  • ছ.পুরানো কাগজপত্র বিক্রয় হতে আয়।

ব্যয়ের প্রধান খাতগুলো হলো তথ্যসম্পদ সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ, আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং সংরক্ষণ, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রন্থাগারকর্মীদের বেতনাদি ইত্যাদি।একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারের পৌনঃপুনিক ব্যয়ের জন্য বাজেট সাধারণত ঐ প্রতিষ্ঠানের মোট বাজেটের ৫% হতে ১০% পর্যন্ত হতে পারে। যেখানে গবেষণা কর্মসূচি থাকে এবং সেখানে ব্যয় বরাদ্দের হার বেশি হয়। শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগার ফি ধার্যের ক্ষেত্রে ঐ এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করতে হয় এবং অন্যান্য ফি এর কেমন সে দিকটিও বিবেচনায় আসবে। ২০

গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবহার:

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাদান ও শিখন প্রক্রিয়ার সঙ্গে গ্রন্থাগার তথ্য-সম্পদ ব্যবহারের যোগসূত্র স্থাপনের বিষয়টি এখন পর্যন্ত যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বর্তমানে গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবহার সীমিত অর্থে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত আগ্রহের উপর অনেকটা নির্ভরশীল। কলেজ শিক্ষার কোনো কোনো ক্ষেত্রে (সীমিত অর্থে) অ্যাসাইনমেন্ট ও সমস্যা সমাধান পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলা আছে। কিন্তু কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং সে সম্পর্কে শিক্ষাক্রম তেমন কোন নিদের্শনা দেখা যায় না। সহশিক্ষা কার্যক্রমেও গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবহার করা যায়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কী কী গ্রন্থাগার সেবা দেয়া যায়, কিভাবে গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবহার সম্বন্ধে সচেতন করা যায় নিম্নে সে বিষয়ে আলোচনা করা হলো-

১. গ্রন্থাগার ব্যবহার নিয়মনীতির সম্বলিত ম্যানুয়াল:

এ ম্যানুয়াল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণের ফলে শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগার ব্যবহারে উদ্ধুদ্ধ হবে। কারণ এ ম্যানুয়ালে থাকবে গ্রন্থাগার, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিশদ আলোচনা ও বিবরণ, শিক্ষা উপকরণ সংগঠন, বই খোঁজার নিয়ম-কানুন এবং গ্রন্থাগার সার্ভিসের বিভিন্নমুখী কার্যক্রম ও গ্রন্থাগার বিধি ইত্যাদি।

২. বিষয়-ভিত্তিক গ্রন্থতালিকা:

একজন শিক্ষার্থী কী পরিমাণ বই পড়বে সেটা নির্ধারণ করা যায় বটে। কিন্তু ন্যূনতম কী পরিমাণ টেক্সট বই, রেফারেন্স বই, জার্নাল ও ম্যাগাজিন পড়বে শ্রেণি শিক্ষক তা গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে পরামর্শ করে পাঠভিক্তিক গ্রন্থতালিকা তৈরি করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের বিষয়ের উপর জ্ঞানের প্রসার বৃদ্ধি পাবে।

৩. নতুন বই পুস্তকের তালিকা প্রণয়ন, প্রচার ও বিতরণ:

প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে নতুন বই সংগ্রহের পর প্রসেসিং কার্যক্রম সম্পন্ন হলে বইয়ের জ্যাকেট গ্রন্থাগার নোটিশ বোর্ডে প্রদর্শন ও নতুন বইয়ের তালিকা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উভয় উপকৃত হবে।

৪. অ্যাসাইনমেন্ট:

শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়ে (যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রয়োজনে সম্পন্ন হয়) থাকে। শ্রেণি শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেয়ার পূর্বে গ্রন্থাগারে ঐ বিষয় সম্পর্কিত বই-পুস্তক অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ আছে কী না তা জেনে নেন। এক্ষেত্রে গ্রন্থাগরিক পূর্বে থেকেই শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করে গ্রন্থপঞ্জি তৈরি করে রাখে। এ অ্যাসাইনমেন্ট পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল, চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটে।

৫. শিক্ষক ও অগ্রগামী শিক্ষাথীদের জন্য পরিসেবা:

ক.সাম্প্রতিক জার্নাল/সাময়িকীসমূহের বিষয়বস্তু প্রচার; খ. নির্বাচিত তথ্যে ও বিতরণ পরিসেবা; গ. নির্বাচিত বা কার্য গ্রন্থপঞ্জির পরিসেবা।২১

৬. খোলা তাক পদ্ধতি:

গ্রন্থাগারে সমস্ত বই-পুস্তক খোলা তাকে বিন্যাস করা আবশ্যক। কারণ শিক্ষার্থী এতে নিজের পছন্দের বইটি বাছাই করে নিতে পারে। শুধু তাই নয়, সে তার আগ্রহের বইটি এবং বিষয় সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বইও পাশাপাশি দেখতে পায়। তাই খোলা তাক পদ্ধতিতে (সিস্টেমে) জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে তার আগ্রহ অনুযায়ী পাঠের স্বাধীনতা পেয়ে থাকে।  এ খোলা তাক নীতিতে কিছু বই হয়তো হারিয়ে যেতে পারে ও বিনষ্ট হতে পারে। কিন্তু এতে শিক্ষার্থীর লাভটাই বেশি। খোলা তাক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা (ছাত্র-ছাত্রীরা) প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারকে নিজ গ্রন্থাগার হিসেবে ভাবতে শেখে।

৭. শিক্ষার্থী-বইয়ের মধ্যে সর্ম্পক সৃষ্টি:

গ্রন্থাগারের অতি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্য হলো শিক্ষাথীদের বই ও অন্যান্য পাঠোপকরণের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি ঘটানো। যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ আগ্রহ কার্যকর ও স্থায়ী হয়ে পাঠাভ্যাস গড়ে উঠে।  যা শুধু শ্রেণিকক্ষ ভিত্তিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব হয় না। অথচ বই ও শিক্ষাথীদের উভয়ের মধ্যে এ ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক সেতুবন্ধন সৃষ্টি করা খুবই জরুরি। প্রথমত বিনোদনের জন্য পড়া এর দিকে উৎসাহিত করে বইয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়। প্রথমে শিক্ষার্থী নিজ ইচ্ছাতেই আগ্রহের বইগুলো বেছে নিতে শিখবে এবং পর্যায়েক্রমে সৃজনশীল পুস্তক পড়ার দিকে মনোনিবেশ করবে। এক্ষেত্রে পাঠের আগ্রহ বৃদ্ধিতে গল্প বলা একটি ফলপ্রসূ পদ্ধতি। অনানুষ্ঠানিক পঠন-পাঠন ও তার সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করতে শিক্ষা ও মতামত প্রদানের যোগ্যতা বৃদ্ধি বইয়ের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিবে। ২২

৮. শিক্ষার্থী কর্তৃক পঠিত বই পুস্তকাদির সংরক্ষণ রেকর্ড সংরক্ষণ:

প্রত্যেক শিক্ষার্থী কর্তৃক পঠিত বই-পুস্তকের তারিখ ভিত্তিক রেজিস্টার গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শ্রেণি শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক ও প্রধান শিক্ষক প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পঠন-পাঠন সম্পর্কে অবগত হতে পারে এবং ঐ শিক্ষার্থীর জন্য পঠন-পাঠনের পরামর্শ ও উৎসাহ দিতে পারেন।

৯. শিক্ষার্থী কর্তৃক রিডিং ডায়েরি সংরক্ষণ ও পাঠচক্র চালু:

শিক্ষাথীদের পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য পঠিত বইসমূহ হতে শিক্ষার্থীরা তার আগ্রহের বিষয়গুলো ডায়েরিতে লিখে সংরক্ষণ করবে। শিক্ষার্র্থীকে প্রথম দিন হতেই এ ডায়েরির লিখন সম্পর্কে গ্রুপভিত্তিক দুই বা তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থী কর্তৃক পঠিত গ্রন্থের সারাংশ, তথ্য যা তার ডায়েরিতে সংরক্ষণ করা হয় এসব নিয়ে গ্রুপভিত্তিক পাঠচক্র করা যায়। এ গ্রুপগুলো একাডেমিক বিষয়সহ সহ-পাঠক্রমিক বিষয়গুলো পাঠচক্রে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এতে তাদের জ্ঞানবৃদ্ধিসহ তীক্ষ্ম চিন্তাশক্তি বিকশিত হবে।

১০. স্মরণীয় ও বরণীয় দিবস উদ্যাপন:

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত বিভিন্ন ব্যক্তির জন্ম ও মৃত্যু দিবস দিবস পালন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ পালনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, ছবি আঁকা ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতা মাধ্যমে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি করা যায়। এক্ষেত্রে পঠিতব্য পুস্তকাদিও তালিকা তৈরি করে গ্রন্থাগারিক সহায়তা করতে পারেন আর পুরস্কারপ্রাপ্ত নিবন্ধগুলো প্রতিষ্ঠানের ম্যাগাজিনে প্রকাশ করা এবং বুলেটিন বোর্ডে প্রদর্শন করা যেতে পারে।

১১.কুইজ প্রতিযোগিতা:

প্রতিটি শ্রেণির জন্য গ্রন্থাগার ব্যবহার নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পাঠাভ্যাসকে ত্বরান্বিত করা যায়। লেখক, বইয়ের নাম ও বিষয় ইত্যাদির উপর ভিত্তিক প্রশ্নমালা তৈরি করে কুইজ প্রতিযোগিতা করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস, গ্রন্থাগার ব্যবহার ও সাধারণ জ্ঞানের উন্নয়ন ঘটবে।

শুধু শিক্ষার্থীর জন্য নয়, শিক্ষকদের নিজের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও নিজ বিষয়ে হালনাগাদ জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিতি হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিভাবে অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি বা সমস্যা সমাধান পদ্ধতিতে কার্য সম্পন্ন করতে হয় সে বিষয়ে শিক্ষক ও গ্রন্থাগারিকদের পদ্ধতি সম্বন্ধে ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। এ পদ্ধতিকে গ্রন্থাগার গবেষণা পদ্ধতি (Library Research Method) বলা হয়ে থাকে।

১২.পঠন-পাঠনের উপর পুরষ্কার প্রদান:

প্রতিবছর (শ্রেণিভিত্তিক) শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বই পঠিত শিক্ষার্থীদের পুরষ্কার দেয়ার মাধ্যমে পাঠাভ্যাসের প্রতি ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহের সৃষ্টি করা যেতে পারে। ২৩

১৩.শিক্ষক-গ্রন্থাগারিক সহযোগিতা:

শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টির দায়িত্ব শুধু প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার কর্মীদের উপর বর্তায় না। এক্ষেত্রে শিক্ষকগণ যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করে এবং তখন শিক্ষার্থীদের পাঠ্য-পুস্তক, রেফারেন্স বই অবহিত করে রেফারেন্স তালিকা দিয়ে পাঠের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করবেন। শিক্ষক-গ্রন্থাগারিক শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার অগ্রগতি সমস্যা দিয়ে আলোচনা করবে্ন। শিক্ষকগণও ভাল বইপুস্তক ও ম্যাগাজিন ইত্যাদি সংগ্রহে গ্রন্থাগারিককে সহযোগিতা করবেন। শুধু শিক্ষার্থীর জন্য নয়, শিক্ষকদের নিজের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও নিজ বিষয়ে হালনাগাদ জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিতি হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান বা ঐ বিষয়ে বিভাগীয় প্রধান তার অধস্তন শিক্ষকদের অ্যাসাইনমেন্ট তথ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে উদ্ধুদ্ধ করতে পারেন। কিভাবে অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি বা সমস্যা সমাধান পদ্ধতিতে কার্য সম্পন্ন করতে হয় সে বিষয়ে শিক্ষক ও গ্রন্থাগারিকদের পদ্ধতি সম্বন্ধে ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। এ পদ্ধতিকে গ্রন্থাগার গবেষণা পদ্ধতি (Library Research Method) বলা হয়ে থাকে। এ সব বিষয়ে শিক্ষক-গ্রন্থাগারিক পারম্পরিক আলোচনা করবে এবং শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগার ব্যবহার শিক্ষা দিবে।

১৪. অবহিতকরণ কর্মসূচি:

প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনকরণ উদ্ধুদ্ধকরণের জন্য নিম্নবর্ণিত কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।

Paticipant Resource Person Subject Purpose
কলেজের নতুন শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারিক গ্রন্থাগার ও তথ্যসম্পদ পরিচিতি কলেজের গ্রন্থ ও তথ্য সম্পদ সংগ্রহ, সংগঠন ও ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেয়া
কলেজ শিক্ষার্থী

(শ্রেণিভিত্তিক/ গ্রুপভিত্তিক)

গবেষক /গ্রন্থাগারিক অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি/ সমস্যা সমাধান পদ্ধতি ও লিটারেচার অনুসন্ধান কীভাবে অ্যাসাইনমেন্ট লিখতে হয়। এর সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়া
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ গ্রন্থাগারিক তথ্যসূত্র মাধ্যম (ক্যাটালগ, ক্লাসিফিকেশন, ইনডেক্স,আবস্ট্রাস্ট ও গ্রন্থপঞ্জি ইত্যাদির ব্যবহার) তথ্যসূত্র সম্পর্কে ধারণা প্রদান ও তথা কিভাবে ব্যবহার করা হবে। এর সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া
শিক্ষার্থীবৃন্দ গবেষক/ গ্রন্থাগারিক সুশীল নাগরিক ও সুশীল সমাজ গঠনে গ্রন্থাগারের ভূমিকা পাঠাভ্যাস সৃষ্টির জন্য উদ্ধুদ্ধকরণ
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ গ্রন্থাগারিক বইসমূহ ও জার্নাল ইস্যু হয় কী না ইস্যু হলে কত দিনের জন্য কয়টি বই ও জার্নাল ইস্যু করা হবে। এ সম্পর্কে ধারণা দেয়া

গ্রন্থাগার সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যাবলি:

গ্রন্থাগার পরিসেবা সমুন্নত রাখা ও ব্যবস্থাপনার গতিশীলতার লক্ষ্যে সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ প্রতিটি গ্রন্থাগারের জন্য অপরিহার্য। পরিচ্ছন্নতা গ্রন্থাগার ব্যবহারোপযোগী রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান। পাঠকগোষ্ঠীকে গ্রন্থাগার ব্যবহারে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু কারিগরি পদ্ধতি। এ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে গ্রন্থাগারিক প্রধান ব্যক্তি। তিনি গ্রন্থাগারসামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যবস্থাপনাগত পরিকল্পনা করবেন। কলেজ অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী বিধায় প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করবেন। একটি গ্রন্থাগার সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যাসমুহের মধ্যে নিম্নরূপ-

  • ১. গ্রন্থাগার অপরিচ্ছন্নতা
  • ২. অদক্ষ গ্রন্থাগার কর্মী
  • ৩. গ্রন্থাগার ব্যবহার নিয়মাবলি
  • ৪. বইপুস্তক আলমিরা/ক্লোজ সেল্ফে সংরক্ষণ
  • ৫. পাতা কাটা ও মার্জিনে লেখা
  • ৬. আর্দ্রতা ও বৃষ্টির পানির প্রভাব
  • ৭. অসচেতন ও সস্তায় বাজারজাতকৃত মুদ্রিত তথ্যসামগ্রী
  • ৮. নিম্নমানের আঠা ও দুর্বল সেলাই
  • ৯. অযাচিত দাগ বিমোচনের অসাবধানতা
  • ১০. গ্রন্থাগারে অধিক পুরাতন খবরের কাগজ অপরিকল্পিত জমা রাখা
  • ১১. পোকা-মাকড়ের প্রভাব ও অসচেতন বিন্যাস ব্যবস্থা ইত্যাদি। ২৪

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মানব সম্পদ উন্নয়ন একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে (১৯৯১) এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫% এ দাড়িয়েছে। শিক্ষা হার ৭২.৯%। এখনকার শিক্ষা ব্যবস্থা ও গ্রন্থাগারগুলোর বর্তমান অবস্থা উন্নত বিশ্বের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। অথচ কোন দেশের উন্নয়ন ও গবেষণা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য উন্নতমানের দক্ষতাসম্পন্ন প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রন্থাগারগুলোতে অপরিহার্য। আমাদের দেশের গ্রন্থাগারগুলোর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন ব্যবস্থা অনেকাংশেই দুর্বল। তাছাড়া গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার নীতিগুলোর সঠিকভাবে প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় না। ২৫

গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নমূলক সুপারিশ:

ব্রিটিশ আমলে ব্যবহারকারীদের মাঝে গ্রন্থাগারে ব্যবহার করার প্রবণতা ছিল বেশি। এখন আর আগের মত ব্যবহারকারীরা গ্রন্থাগার ব্যবহার করে না। পূর্বের তুলনায় মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। সেই সাথে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল হয়েছে। তাই পাঠকগণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের কাঙ্খিত বইপুস্তক সহজেই সংগ্রহ করতে পারে। আরও সহজ উপায়ে দুম্প্রাপ্য প্রকাশনা ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা যায়। তা হলো ইন্টারনেট। এজন্য ব্যবহারকারীরা গ্রন্থাগার মুখী না হয়ে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকাশনা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। এ চিত্র সরকারি ও বেসরকারি উভয় একাডেমিক গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারে চাহিদানুযায়ী বইপুস্তক নাই। গ্রন্থাগার সার্ভিসের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কোন জনবল নেই। সরকারি ও বেসরকারি একাডেমিক গ্রন্থাগারে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মীর অভাব। ব্যবহারকারীদের সার্ভিসের তুলনায় নগণ্য। সরকারি ও বেসরকারি একাডেমিক গ্রন্থাগারের সমস্যা উত্তরণের উন্নয়নমূলক সুপারিশ নিম্নে বর্ণিত হলো-

১. গ্রন্থাগার অপরিচ্ছন্নতা:

গ্রন্থাগারের ধূলিবালি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখতে হবে এবং গ্রন্থাগারের সমস্ত পাঠ্যপুস্তক ও আসাবাবপত্রসহ মাসে অন্তত একবার পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করতে হবে।

২. গ্রন্থাগার ভবন:

গ্রন্থাগার ভবনের অব-কাঠামো আধুনিক মানসম্মতভাবে নির্মাণ করা জরুরি। বিশেষ করে ভবনে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো-বাতাস প্রবেশ করার ব্যবস্থা থাকতে পারে। এ রকম সুবিধাজনক এলাকায়/জায়গায় গ্রন্থাগার ভবন নির্মাণ করা ভাল। এতে দুই ধরণের সুবিধা এক. ভবন উন্নতমানের হলে দৈব্যশক্তি থেকে যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি ভবনে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো-বাতাস প্রবেশ করলে পাঠ্যপুস্তক পোকামাকড় থেকে রক্ষা পাবে।

৩. গ্রন্থাগার কর্মী:

গ্রন্থাগারের সকল কর্মকান্ড সচল রাখার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও উপযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারি। গ্রন্থাগার সেবার পরিসর বৃদ্ধির জন্য বিশেষত প্রতিটি শাখায় প্রয়োজনীয় জনবল আবশ্যক। ফলে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের চাহিদা পূরণের নিমিত্তে কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের প্রফেশনাল প্রশিক্ষণসহ প্রেষণামূলক আলোচনা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করা জরুরি।

৪. গ্রন্থাগারকে আধুনিকায়ন:

বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেট সার্ভিস গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি। ব্যবহারকারীদের যুগোপযোগী চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আইসিটি সার্ভিসের প্রয়োজন। ব্যবহারকারীরা ঘরে বসে যে কোনো গ্রন্থাগার থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৫. প্রকাশনাসমূহ:

ব্যবহারকারীদের চাহিদানুযায়ী সকল ধরণের প্রকাশনা গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পত্রিকা সংরক্ষণ করা শ্রেয়। তথাপি প্রতিটি গ্রন্থাগারের তথ্যবহুল নতুন নতুন প্রকাশনা সংরক্ষণ করাও জরুরি।

৬. সারকুলেশন:

প্রত্যেক গ্রন্থাগারে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে বই ইস্যূ করা উচিত। প্রয়োজনবোধে ব্যবহারকারীদের নিকট থেকে প্রতিদিন ভাড়া হিসেবে বই ধার দিতে পারে। ফলে আর্থিক দিক বিবেচনা করলে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ ও ব্যবহারকারী উভয় লাভবান হবেন।

৭. সূচিকরণ ও শ্রেণিকরণ:

প্রত্যেকটি গ্রন্থাগারে AACR-2 অনুযায়ী সূচিকরণ ও ডিডিসি অনুযায়ী শ্রেণিকরণ করা জরুরি। এতে ব্যবহারকারী জানতে পারবে ঐ সব গ্রন্থাগারগুলোতে কী ধরণের পাঠ্যপুস্তক সংরক্ষিত আছে। প্রয়োজনবোধে Online Based Software ব্যবহার করে লাইব্রেরিকে অটোমোশন করা যেতে পারে।

৮. ফটোকপি সার্ভিস:

গ্রন্থাগারে ব্যবহারকারীদের স্বার্থে ফটোকপি সার্ভিস দেয়া প্রয়োজন। এতে ব্যবহারকারীরা বইয়ের প্রয়োজনীয় অংশটুকু ফটোকপি করে নিতে পারে। এর জন্য গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ ফটোকপি বাবদ চার্জ নিবে। বিশেষ করে ব্যবহারকারী সময় অবচয় হলো না এবং গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ লাভবান হলেন।

৯. গ্রন্থাগারে বঙ্গবন্ধু কর্ণার:

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার বঙ্গবন্ধু কর্ণার স্থাপন বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গ্রন্থাগারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানে লেখা বই, তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহের প্রামান্য চিত্রসহ নানা বিষয় গ্রন্থাগারে স্থান পাবে। এছাড়াও তাঁকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন লেখকের প্রবন্ধ, বক্তৃতা, বিবৃতি, বাণী, নির্দেশ, সাক্ষাৎকার, ছরিও বঙ্গবন্ধু কর্ণারে স্থান পাবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের উপর বিভিন্ন বিষয়ে লেখা এই পর্যন্ত দেশ-বিদেশে ১৩ শতাধিক মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। এই বইগুলো বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর উপর বেশসংখ্যক বই চীনা, জাপানি, ইতালিয়ান, জার্মান, সুইডিশসহ বিদেশী ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এসব সমস্ত বই পড়ে ব্যবহারকারীরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের সম্পর্কে জানতে পারবে।

১০.গ্রন্থাগারে মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার:

সরকার কর্তৃক জারিকৃত প্রত্যেকটি গ্রন্থাগারে আলাদা মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার খোলার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। বিশেষ করে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেরই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধ কর্ণারটি পাঠকের নজরে আসার জন্য গ্রন্থাগারে প্রবেশ পথের পাশে প্রতিষ্ঠা করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সকল প্রকাশনা গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করা এবং যা সকল শ্রেণির পাঠকদের চাহিদা পূরণ করে।

১১. গ্রন্থাগার ব্যবহারের নিয়মাবলী:

গ্রন্থাগার ব্যবহার নিয়মাবলী প্রত্যেক গ্রন্থাগারে প্রবেশ পথে লিখিত আকারে টানিয়ে রাখা উচিত। ফলে গ্রন্থাগার ব্যবহারকারী গ্রন্থাগারে প্রবেশ মাত্রই নিয়মাবলী নজরে আসে। এতে বই ব্যবহার করার নিয়ম, বই ইস্যূ করা হয় কীনা, গ্রন্থাগার সময়সূচি ও বইটির পাতা ছিড়লে কী হবে ইত্যাদি নিয়মাবলী লিখা থাকতে পারে। এই সমস্ত নিয়মাবলির বিষয়ে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত।

১২. গ্রন্থাগারে অসামাজিক কর্মকান্ড:

গ্রন্থাগার একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ১৯৪৯ সালে UNESCO Public Library Manifesto-তেও গণগ্রন্থাগারকে “জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়”বলা হয়। কেননা এখানে উচ্চ শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, আবাল-বৃদ্ধা-বণিতা, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই জ্ঞান অর্জনের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। তাই গ্রন্থাগারকে অসামাজিক কর্মকান্ড ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা না করাই উত্তম।

উপসংহার:

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। জীবনের শুভ সকাল থেকেই যদি গ্রন্থাগার বিমূখ ও গ্রন্থাগার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তাহলে তাদের আর ফেরোনো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।  তাই এ সময় থেকেই বইপত্র ও গ্রন্থাগারের সাথে তাদের অন্তরঙ্গতা স্থাপন করে দিতে পারলে তা স্থায়িত্বপ্রাপ্ত হবে এবং ভবিষ্যতে জাতির জীবন হয়ে উঠবে কল্যাণময় ও সম্ভাবনাময়। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি গ্রন্থাগারে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করে তুলতে হবে। তাদের গ্রন্থাগারমুখী করে তাদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে পঠন-পাঠনের অভ্যাস।

আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের পাঠক হয়ে উঠবার সুযোগ অতি সামান্য।  তারা যতটা সিলেবাস সংশ্লিষ্ট হতে পারে, ততটা গ্রন্থাগার সম্পৃক্ত হতে পারে না।  শিক্ষার্থীরা শিক্ষা অর্জন করে কিন্তু জ্ঞান অর্জন করে না।  তারা শিক্ষিত হয় কিন্তু পাঠক হয়ে ওঠে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারা পাঠ্যপুস্তকের সাথে পরিচিত হলেও গ্রন্থাগার তাদের রয়ে যায় অপরিচিত। লাইব্রেরি বলতে তারা জানে বইপত্রের দোকান আর লাইব্রেরিয়ান বইয়ের দোকানদার। এমনকি শিক্ষা জীবন শেষ করার পরেও অনেকের মধ্যে এ ধারণা বহাল থাকে। এ সুযোগ আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় নেই বললেই চলে। গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা শুরু হওয়ার সময় দেখা গেছে যে, তখন একটি গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগার সামগ্রী, জনবল এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল সীমাবদ্ধ। সেই সময়ে যেমন জনবল কম ছিল তেমনি গ্রন্থাগার দায়-দায়িত্ব ও কম ছিল। কিন্তু ব্যবস্থাপনা কার্য সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরণের ব্যবস্থাপনা তত্ত্ব ও তথ্যের উৎপত্তি লাভ ঘটেছে। তন্মধ্যে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আজকের যুগ প্রযুক্তি নির্ভর। তাই পাঠকদের অতিদ্রুত সেবা প্রদানের জন্য গ্রন্থাগারে প্রযুক্তির ব্যবহার অতি জরুরি।


তথ্যসুত্র

  • ১. হক, কাজী মোস্তাক (২০০৮), গাইসুল বিবর্তনের ধারায় সমাজ, তথ্য ও গ্রন্থাগার, ঢাকা: গণ উন্নয়ন গ্রন্থাগার , পৃ. ৯
  • ২. Shera, J.H. (1972), the Foundations of Education for Librarianship, New York. Becker and Hayes, p. 103
  • ৩. খান, আবদুল আউয়াল ও আবু তাহের, মোহাম্মদ (২০০৮), ব্যবস্থাপনা, ঢাকাঃ আবীর পাবলিকেশন, পৃ.১-২
  • ৪. Shera, J.H. (1972), the Foundations of Education for Librarianship, New York. Becker and Hayes, p. 103
  • ৫.  Sharma, C.K (1985), Library Management & Organization, New Delhi: Shee Publishing House, p.2.
  • ৬. আহাম্মদ, এ.ডি.এম. আলী (২০১১), স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও অন্যান্য গ্রন্থাগার পরিচালনা, ঢাকাঃ প্রকাশন, পৃ ১৬
  • ৭. Sharma, C.K, Ibid, p-2
  • ৮. মহাপাত্র, পীযুষকন্তি ও চক্রবর্তী, শতদ্রƒশোভন (১৯৮৬), গ্রন্থাগার প্রশাসন, কলকাতাঃ দি ওয়াল্ড প্রেস ,পৃ.১
  • ৯. ঐ, পৃ.৫
  • ১০. হারুন-অর-রশিদ, মোঃ (২০০৪), গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা, (গ্রন্থাগারবর্ষ স্মারকগ্রন্থ) ঢাকাঃ সূচীপত্র, পৃ.৮৮
  • ১১. খান, আবদুল আউয়াল ও আবু তাহের, মোহাম্মদ (২০০৮), ব্যবস্থাপনা, ঢাকাঃ আবীর পাবলিকেশন, পৃ.১-২
  • ১২. হারুন অর রশিদ, মোঃ (১৯৯৮), “জাতীয় শিক্ষানীতিতে (খসড়া) গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবস্থা এবং শিক্ষা” বেলিড ও ইলিম কর্তৃক আয়োজিত জাতীয় শিক্ষানীতিতে গ্রন্থাগার ও তথ্য ব্যবস্থা এবং শিক্ষাঃ পর্যালোচনা ও সুপারিশ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত, ঢাকা, মে, ১৪
  • ১৩. হারুন-অর-রশিদ, মোঃ, প্রাগুক্ত, পৃ.৮৯
  • ১৪. ঐ, পৃ. ৮৯-৯০
  • ১৫. ঐ, পৃ. ৯১-৯২
  • ১৬. ঐ, পৃ. ৯২-৯৩
  • ১৭. ফজলে কবীর, আবুল ফজলে মোঃ (১৯৪৮), অনুবাদক মাহমুদ-উল-আমীন, বাংলার গ্রন্থাগার (১৭০০-১৯৪৭), ঢাকাঃ বাংলা একাডেমি, পৃ.৩৯
  • ১৮. উদ্দিন, এম. নাসির (২০০৯), বাংলাদেশের গণগ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা: সমস্যা ও সমাধান, (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা), ঢাকাঃ এশিয়াটি সোসাইটি অব বাংলাদেশ, খ–সপ্তদশ, গ্রীম্ম সংখ্যা, পৃ. ১৫৪
  • ১৯. হারুন-অর-রশিদ, মোঃ, প্রাগুক্ত, পৃ.৯৩-৯৪ আরও দেখুন ইসলাম, মোঃ রফিকুল (২০১৮), ঢাকার গ্রন্থাগারের ক্রমবিকাশ ও ব্যবস্থাপনা, ঢাকাঃ সময় প্রকাশন,
  • ২০. ঐ, পৃ. ৯৪
  • ২১. ঐ, পৃ. ৯৫
  • ২২. ঐ, পৃ. ৯৫-৯৬
  • ২৩. ঐ, পৃ. ৯৬
  • ২৪. ঐ, পৃ. ৯৬-৯৮
  • ২৫. বাংলাদেশ অর্খ মন্ত্রণালয়,অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক উপদেষ্ঠা অনুবিভাগ, ১৯৯৬, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা,ঢাকা, ১৯৯৫, পৃ. ১৫.১৬ আরও দেখুন ইন্টারনেট
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close