বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থাগার পেশা বিষয়ক মাসিক অনলাইন সাময়িকী

logo

librariansvoice@gmail.com

গ্রন্থাগারিকদের পদোন্নতি প্রসঙ্গে

তৃপ্তি সাহা:

আমরা সরকারি কলেজের গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হয়েও এক যুগ পেরিয়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত এবং আমাদের দীর্ঘ বাইশ বছরের চাকরিজীবনে মাত্র একটি পদোন্নতি নিয়ে দুঃখের সাগরে দিন অতিবাহিত করছি। পদোন্নতি হচ্ছে কারও ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া, যোগ্যতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সেখানে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে একই সমান যোগ্যতা নিয়ে এবং একই পরিপত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে যারা প্রদর্শক পদে যোগদান করেছেন তারা ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান হতে পারেন।

অথচ আমরা সহকারী গ্রন্থাগারিক এবং গ্রন্থাগারিকরা যারা একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত তারা সীমাহীন লজ্জা, গ্লানি আর হতাশা নিয়ে বছরের পর বছর পদমর্যাদাবিহীন ব্লক পদে চাকরি করে যাচ্ছি। একই পরিবারের সমান যোগ্যতাসম্পন্ন দুই সন্তানের প্রতি ভিন্নরকম আচরণ।

আমরা যারা শত প্রতিকূলতার মাঝেও গ্রন্থাগার সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের জড়িত রেখেছি-যারা বিশ্বাস করি প্রধান খাদ্য উপাদান শর্করা, আমিষ ও স্নেহ হজাতীয় খাদ্যকে হজম করার জন্য যেমন এনজাইমের প্রয়োজন, তেমনি শ্রেণিকক্ষের পাঠক্রম আত্মস্থ, পরিপুষ্ট করার জন্য শুধু রেফারেন্স বই নয়, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই, গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, জীবনী ও ভ্রমণকাহিনির বইগুলো পড়া অতীব প্রয়োজনীয়। এতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মেধা, নৈতিকতা, মানবিকতা, সৃজনশীলতা সর্বোপরি জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে।

তাই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীর মানবিকতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য শ্রেণি শিক্ষকের পাশাপাশি দক্ষ গ্রন্থাগারিকের বা গ্রন্থাগার কর্মকর্তার অতীব প্রয়োজন। আমরাই ছাত্রছাত্রীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গভীরভাবে ছড়িয়ে দিতে পারি। নৈতিকতা, সৃজনশীলতা বা দেশপ্রেমে আমরাই উজ্জীবিত করতে পারি। শিক্ষার্থীদের পড়তে উৎসাহিত করতে পারি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’, ‘তোমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘আমি বিজয় দেখেছি’, ‘ওরা টোকাই কেন?’ বেবী মওদুদের ছোটদের শেখ মুজিবুর রহমান, মংপুতে রবীন্দ্রনাথসহ হাজার হাজার বই।

শুধু কি তাই! রেফারেন্স বইগুলো যেন সত্যিকার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয় সেজন্য সাহিত্য, ইতিহাস এবং বিজ্ঞানভিত্তিক যথাযথ বই আমরাই নির্বাচন করি। কোন পত্রিকা পড়ে সঠিক তথ্য পাবে সেটা আমরা ঠিক করে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করি। নীরবে আমরা মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করি। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতায় আমরাই তাদের সঠিক বইয়ের মাধ্যমে তথ্য দিয়ে বাংলাদেশের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পোড়া মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রত্যেকটি সরকারি স্কুল-কলেজে গ্রন্থাগার তৈরি এবং পদ সৃষ্টি করে গেছেন। যা কিনা স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতায় বসে ইতিহাস বিকৃতির লক্ষ্যে গ্রন্থাগারের কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদমর্যাদা নিচের দিকে টেনে ধরেছেন। কলেজগুলোর পরিবর্তন পরিবর্ধন হলো। অনার্স, মাস্টার্স শ্রেণি চালু হলো। শিক্ষকদের পদমর্যাদা এবং সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। কিন্তু গ্রন্থাগারটির দিকে কেউ নজর দিল না। সৃজনশীলতাকে উপড়ে ফেলে প্রাইভেটনির্ভর হলো শিক্ষাব্যবস্থা। পিয়ননির্ভর হলো অধিকাংশ গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারের গুরুত্ব কমে গেল ধীরে ধীরে, পাঠাভ্যাস ধীরে ধীরে রহিত হলো।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বাঙালি জাতিকে সরিয়ে আনা হলো। ছাত্রছাত্রীদের মাঝে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম রহিত হলো। এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ কলেজে গ্রন্থাগারিকের বা গ্রন্থাগার কর্মকর্তার পদ নেই। আবার যেসব কলেজে আছে সেগুলোর বেশিরভাগেই শূন্যপদ। বর্তমান সরকারপ্রধান আলোয় আলোকিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকার দেশকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। এই পেশায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি বলেই কি এর দিকে কারও নজর নেই? বর্তমান সরকার সুশিক্ষানির্ভর সরকার। যার জন্য আজ দিকে দিকে শিক্ষা-সংস্কৃতি, খেলাধুলা বিভিন্ন অঙ্গনে পাখা মেলছে। প্রথমবার দেশ পরিচালনায় এসেই প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন কলেজ গ্রন্থাগারগুলোতে সহকারী গ্রন্থাগারিক ও ১ম শ্রেণির গ্রন্থাগারিক নিয়োগ দিয়েছেন।

কিন্তু এটি পদমর্যাদাবিহীন ব্লক পোস্ট। আমরা প্রথম শ্রেণির গ্রন্থাগারিকরা আশায় বুক বেঁধে আছি আমাদের কান্না, আমাদের ব্যথা নিশ্চয়ই আমাদের অভিভাবক প্রাণপ্রিয় মহাপরিচালক স্যার এবং পরিষদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও তার সুযোগ্য শিক্ষামন্ত্রীর হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। তাই আমাদের আকুল আবেদন, খুব শিগগিরই কলেজগুলোতে লাইব্রেরি উন্নয়ন কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করে আমাদের বিদায়কালে পদোন্নতি দিয়ে দীর্ঘদিনের হতাশা-বেদনা ও যন্ত্রণা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিন।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে বর্তমানে যেভাবে কলেজগুলোতে প্রদর্শকদের পদোন্নতির প্রথা চালু আছে, সেই প্রথা অনুযায়ী আমাদের পদোন্নতি দিলে আমরা শিক্ষাকে সুশিক্ষায় পরিণত করতে আনন্দের সঙ্গে কাজ করে যাব। সব গ্রন্থাগারিকের পক্ষে তৃপ্তি সাহা গ্রন্থাগারিক, চাঁদপুর সরকারি কলেজ।


তথ্য সূত্র: আমাদের সময় অনলাইন পত্রিকা থেকে সংগৃহিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *