News

“খুলনাতে ২ দিনের লাইব্রেরি অটোমেশনের কর্মশালা’’

মনজুরুল হক


বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (ল্যাব) এর উদ্দোগে এবং খুলনা বিভাগীয় ল্যাবের আয়োজনে ও সহযোগীতায় গত ১৫-১৬ ফেব্রুয়ারি ২ দিন ব্যাপি লাইব্রেরি অটোমেশন ফর অল প্রোগ্রামের আওতায় ‘SLiMS’ ফ্রি এন্ড ওপেন সোর্স গ্রন্থাগার অটোমেশন সফটওয়ারের উপর এক ‘প্রশিক্ষণ কর্মশালা’ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট)‘ডিজিটাল লাইব্রেরি একসেস সেন্টারে’, অনুষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষণে খুলনা অঞ্চলেরবিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রসার ৩৬জন গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিক অংশ গ্রহণ করেন। প্রথম দিনে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে চীপগেষ্ট হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. কাজী হামিদুর বারি, ডীন, ফ্যাকাল্টি অব সিভিল ইঞ্জিয়ারিং, কুয়েট। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ড. আনোয়ারুল ইসলাম, জেনারেল সেক্রেটারী, বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (ল্যাব) ও গ্রন্থাগারিক, শেরে-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। উপস্থিত ছিলেন মো. আক্কাস উদ্দীন পাঠান, সেন্ট্রাল ডিভিশনাল কাউন্সিলর, খুলনা ও গ্রন্থাগারিক, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, কুয়েট। আরও উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারের সহকারী পরিচালক ড. আহসান উল্লাহ। রিসোর্স পারসন হিসাবে ছিলেন এ. কে.এম. নুরুল আলম (অপু), কান্ট্রি কোঅডিনেটর, ‘SLiMS’ ও ডেপুটি ডিরেক্টর বাংলাদেশ ব্যাংক লাইব্রেরি। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন সালমা সুলতানা মেরী, ক্যাটালগার, কুয়েট ও সরদার মো. মনজুরুল হক, লাইব্রেরিয়ান, খুলনা কলেজ, খুলনা। প্রশিক্ষণে সভাপতিত্ব করেন এম. এম. জাকির হোসাইন, খুলনা কলেজিয়েট গার্লস্ স্কুল এন্ড কে. সি. সি. ওমেন্স কলেজ, ও সহ-সভাপতি খুলনা বিভাগীয় সমিতি। প্রশিক্ষণে সার্বিক সহযোগীতা করেন কুয়েটের ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান মো.মাহবুবুর রহমান, নেটওয়ার্ক ইঞ্জিয়ার প্রদীপ কুমার দাস, সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. আব্দুল বাতেন, সহকারী প্রোগ্রামার মো. আসিফ আনজুম আকাশ, সহকারী প্রোগ্রামার মো. মেহেদী ইসলাম, ক্যাটালগার মো. রাসেদুল ইসলাম, ডকুমেন্টেশন অফিসার হেনা বিশ্বাস, সিনিয়র লাইব্রেরি সহকারী আব্দুর রহিম শেখ ও ডাটা প্রসেসর মো. আফগান ফকির।

প্রশিক্ষণটি ইতোমধ্যে গ্রন্থাগার পেশাজীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। যার ফলে অন্যান্য বিভাগের সহকর্মী পেশজীবি বন্ধুরা প্রশিক্ষণটি নেয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে ইতোমধ্যে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের ৪টি কলেজের গ্রন্থাগারিক তাদের কলেজের গ্রন্থাগার অটোমেশনের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। কলেজগুলো হলো খুলনার দৌলতপুর কলেজ (ডে-নাইট), যার গ্রন্থাগারিক মো. জাকির হোসাইন ও খুলনা কলেজ, যার গ্রন্থাগারিক, সরদার মো. মনজুরুল হক। যশোরের ড. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপাল কলেজ, যার গ্রন্থাগারিক রুমি আক্তার ও শহীদসিরাজউদ্দীন হোসাইন কলেজ, যার গ্রন্থাগারিক মো. আবুল কাশেম। ইতোমধ্যে আরও ২টি কলেজের অধ্যক্ষগণ তাদের গ্রন্থগারিকদের লাইব্রেরি অটোমেশনের জন্য ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশেষ শ্রেণির পেশাজীবি তথা গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিকদের প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। কারণ পেশার মান্নোয়নের জন্য, কাজের গতিশীলতা আনার জন্য, চাইবা মাত্রই তথ্য বা বই সরবরাহ করার জন্য গ্রন্থগার পেশাজীবিদের কর্মজীবনে প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে উন্নত দেশের ডিজিটিলাইড গ্রন্থাগারেরমত আমাদের গ্রন্থাগারসমূহও ডিজিটিলাইড হতে হবে। যদিও নানাবিধ কারণে বিশেষ করে আর্থিক ও অবকাঠামগত কারণে আমাদের গ্রন্থাগারগুলো হয়ত এই মুহুর্তে ডিজিটিলাইড করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা আমাদের গ্রন্থাগারগুলোকে শুধুমাত্র একটি কম্পিউটার দ্বারা অটোমেশনতো করতে পারি।

গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের প্রশিক্ষণের জন্য একাডেমি ফর এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্ট (নায়েম) গ্রন্থাগার পেশাজীবিদেরকে ১৪ দিনের লাইব্রেরি প্লানিং এন্ড ম্যানেজমেন্ট কোর্স (এলপিএমসি) এর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন এন্ড স্টাটিসটিস (ব্যানবেইস) ট্রেনিং কোর্স অন আইসিটি বেইজড লাইব্রেরি এন্ড ইফরমেশন সার্ভিস এর উপর ৭দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। কিন্তু নানাবিধ কারণে ঢাকায় যেয়ে এ সমস্ত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করা সবার পক্ষে সব সময় সম্ভব হয় না। সে কারণে বিভাগীয় বা জিলা পর্যায়ের এরকম ‘প্রশিক্ষণ কর্মশালা’ পেশাজীবি গ্রন্থাগারিকদের মনে নুতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (ল্যাব) ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠালাভ করলেও গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের প্রশিক্ষণের তেমন কোন ব্যবস্থা করতে পারে নাই। ল্যাব ১৯৫৮ সাল থেকে ৬ মাসের গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে সার্টিফিকেট কোর্স এবং পর্যায়ক্রমে গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞানে ১ বছর মেয়যদী ডিপ্লোমা কোর্স, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পর্যায়ে গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা ও পরবর্তীতে গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞানে মাষ্টার্স চালু করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গ্রন্থাগার পেশাজীবি তৈরিতে বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (ল্যাব) অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও নানাবিধ কারণে গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের প্রশিক্ষণের তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে নাই। গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের মাঝে মাঝে যে সমস্ত প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয় তা সবই ঢাকাকেন্দ্রিক ও গণগ্রন্থাগারকেন্দ্রীক। সেখানে আমাদের মত দূর-দূরান্তের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার গ্রন্থাগার পেশাজীবিদের যোগদান করা সম্ভব হয় না। আমার তেইশ বছরের চাকরি জীবনে দেখি নাই বাংলাদশ গ্রন্থাগার সমিতি তাদেরই তৈরিকৃত আমার মত পেশাজীবি গ্রন্থাগারিকদের যুগোপযোগী কোন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান ল্যাবের সেন্ট্রাল কমিটি এমন একটি যুগোপযোগী বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিয়ে পেশাজীবি গ্রন্থাগারিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন এবং খুলনা থেকে শুরু করলেন সেজন্য বর্তমান কমিটিকে আমার ও আমার খুলনা ল্যাবের পক্ষ থেকে সবাইকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। সাথে সাথে বর্তমান ল্যবের সেন্ট্রাল কমিটির কাছে পেশাজীবি গ্রন্থাকারিকদের পক্ষথেকে কতকগুলো দাবী বাস্তবায়নের জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি। দাবীসমূহ নিন্মরূপ-

১) মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক ০১-০৪-২০১৩ তারিখে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে ‘রিভাইজড রুলস ফর ক্লাস থ্রি এ- ষ্টাফ’ শিরোনামে আমাদেরকে শিক্ষক হিসাবে মূল্যায়ণ না করায় যে মানবধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে বোর্ড, মাউশি বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মধ্যমে হোক আর হাইকোটে কেসের মাধ্যমে হোক খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আমাদেরকে শিক্ষক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা।

২) স্কুলের সহকারী গ্রন্থাগারিক বন্ধুরা হাইকোটে যে কেস করেছেন তাতে সহযোগীতা করা।

৩) আত্মীকরণ কলেজের গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিকদের স্ববেতন স্কেলে আত্মীকরণ করা।

৪) স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিকের ক্লোজ পদটি রানিংপদে পরিণত করা।

৫) ইন্টারমিডিয়েট কলেজের যোগ্যতা সম্পন্ন সহকারী গ্রন্থাগারিক ঐ কলেজ ডিগ্রি পর্যায়ে উন্নীত হলে তিনি প্রমোশন নিয়ে বা কলেজ পরিচালনা পর্ষদের রেজুলেশনের মাধ্যমে গ্রন্থাগারিক পদে উন্নীত হতে পারেন সে মর্মে সরকরিভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করানোর ব্যবস্থা করা।

৬) বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মত ধরণ অনুযায়ী জুনিয়র গ্রন্থাগারিক দিয়ে চাকরি শুরু এবং এরপর সহকারী গ্রন্থাগারিক, ডেপুটি গ্রন্থাগারিক, গ্রন্থাগারিক, চীপ গ্রন্থাগারিক হিসাবে চাকরি শেষ হবে; সর্বক্ষেত্রে এরকম রানিং পদবি চালু করার ব্যবস্থা করা।

৭) কলেজের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিক গ্রন্থাগারিকতার পাশাপাশি যাতে শিক্ষাকতা করতে পারে সেরকম নীতিমালা তৈরি করে তা সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জারি করানোর ব্যবস্থা করা। সেজন্য প্রয়োজন হলে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান বিষয়টি চালু করার উদ্যোগ নেয়া।

৮) বর্তমানে খুলনাতে শেষ হওয়া লাইব্রেরি অটোমেশন প্রশিক্ষণ কোর্সটি কমপক্ষে ৩দিন করা এবং পর্যায়ক্রমে সব বিভাগীয় শহরে ও বড় বড় জিলা শহরে আয়োজনর ব্যবস্থা করা।

৯) প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে অবস্থিত পিটিআই, বিএড, এইচটিটিআই এরমত প্রতিষ্ঠানে নায়েম ও ব্যানবেইজের প্রশিক্ষণগুলো সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা।

১০) শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক গ্রন্থাগার বিষয়ক সেমিনার, সিস্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ না করে বড় বড় জিলা শহরে বা বিভাগীয় শহরে আয়োজনের ব্যবস্থা করা।

১১) ল্যাবকে আরও গতিশীল করার জন্য সেন্ট্রাল ল্যাবের আজীবন সদস্য ফি ১০০০/=টাকা করা।

১২)উপজিলা ও জিলা পর্যায়ে শিক্ষকদের মধ্যে থেকে যেমন প্রতিবছর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বচন করা হয়, তদ্রুপ আমাদের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার লাইব্রেরিয়ান ও সহকারী লাইব্রেরিয়ানদের মধ্যে থেকেও উপজিলা ও জিলা পর্যায়ে শেষ্ঠ লাইব্রেরিয়ান ও সহকারী লাইব্রেরিয়ান নির্বাচন করার ব্যাবস্থা করতে হবে।

সবশেষে সর্বস্তরের সহকর্মী পেশাজীবি বন্ধুদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়ে এবং আমরা আমাদের শিক্ষক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারব এই আশাবাদ ব্যাক্ত করে এখানেই শেষ করছি।


মনজুরুল হক (এলএম-১৬২৫)
লাইব্রেরিয়ান
খুলনা কলেজ, খুলনা

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close