Blog Post

কোভিড-১৯ পরবর্তীকালীন গ্রন্থাগার পরিষেবা

অন্তরা আনোয়ার

অন্তরা আনোয়ার:

সদ্য আবিষ্কৃত করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) একটি সংক্রামক রোগ। চিকিৎসকদের মতে ভাইরাসে সংক্রামিত বেশিরভাগ মানুষ হালকা থেকে মাঝারি শ্বাসযন্ত্রের অসুখে ভুগতে পারেন। সংক্রামিত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচি, সরাসরি স্পর্শ এমনকি কথোপকথন থেকেও আক্রান্ত  হতে পারে যদি তারা নিরাপত্তাজনিত মাস্ক বা হ্যান্ডগ্লাভস পরিধান না করেন। বর্তমানে পুরো বিশ্ব কোভিড-১৯ এর কবলে লকডাউনের শিকার। বিশ্বব্যাপী গ্রন্থাগারগুলি ন্যূনতম বিধিনিষেধ থেকে পুরো বন্ধের মধ্যে কীভাবে পরিষেবা প্রদান করবে এবং কীভাবে দেওয়া হবে গ্রন্থাগারিকদের সেই প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সচেতনভাবে সরকার থেকেই সমস্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম অংগ গ্রন্থাগারগুলোও বন্ধ রয়েছে।

কোভিড-১৯ পরবর্তীকালীন গ্রন্থাগার পরিষেবা

আশার কথা হলো গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয়ের কারণে গ্রন্থাগারগুলো তাদের ব্যবহারকারিদের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করতে পারছে এবং কিছু কিছু গ্রন্থাগার তাদের সেবা অব্যাহত রেখেছে। এই সময় একদিন পার হয়ে যাবে বলে পুরো বিশ্ব আশাবাদী এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদেরকেও ভাবতে হবে লকডাউন পরবর্তীতে গ্রন্থাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কিভাবে নিজেরা নিরাপদে থেকে এবং সতর্কতা অবলম্বন করে গ্রন্থাগার ব্যবহারকারী ছাত্র, শিক্ষক, গবেষককে নিরাপদ রেখে সেবা প্রদান করতে পারি। গ্রন্থাগারগুলো পুনরায় খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্টতই সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেননা, গ্রন্থাগার এমন একটি জায়গা যেখানে একইসাথে একইসময়ে অনেক লোকসমাগম হওয়া সম্ভব। এই সময়কাল চলে গেলেও নিরাপদ থাকতে গ্রন্থাগারগুলিকে কিছু বিষয়ের দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়।

    • গ্রন্থাগার ভবনগুলো জীবাণুমুক্ত করে নিরাপদে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পর সেখানে জনসমাগমের অনুমতি দিয়ে পুনরায় খোলার পরিকল্পনা শুরু করা।
    • নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে সীমিত ব্যবহারকারীর প্রবেশের উপায়গুলি খুঁজে বের করা এবং এমন পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যেখানে লোকেরা একত্রিত হতে পারে। একাডেমিক গ্রন্থাগারকে উদাহরণস্বরূপ ধরে নিয়ে এই কাজটি এমনভাবে হতে পারে যে, প্রতিদিনের গ্রন্থাগার ব্যবহারের সময়কে কয়েক ভাগে ভাগ করে, প্রতিটি ভাগে কিছু নির্দিষ্ট বিভাগের ছাত্রদেরকে ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়া। আপাতত কিছুদিনের জন্য রিডিং রুমগুলোকে সীমিত করে দেয়া যাতে একই সময়ে অধিক জনসমাগম না হয় বা এমনভাবে বসার ব্যবস্থা করা যাতে করে তারা একে অপর থেকে নূন্যতম দূরত্ব বজায় রেখে তাদের সেবাগুলো পেতে পারে। গ্রন্থাগারে অনুষ্ঠিত সেমিনারগুলোকে অনলাইনভিত্তিক করা ইত্যাদি।
    • গ্রন্থাগার ব্যবহাকারীদের মধ্যে পারস্পরিক নূন্যতম দূরত্ব বজায় রাখতে তাদেরকে উৎসাহিত করা। সেবাগ্রহণকালীন সময়ে সেকশনের ভিতরে নিয়ম মেনে দূরত্ব বজায় রেখে সেবাগ্রহণের মানসিকতা গড়ে তুলতে সেবাগ্রহণকারীদের অণুপ্রাণিত করা।
    • সার্কুলেশনে ফেরত আসা বইগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব অপসারণ করে পরবর্তী ব্যবহারকারী ব্যবহারের পূর্বেই জীবাণুমুক্ত করা অথবা একটি নির্দিষ্ট সময় (২৪ ঘন্টা/৭২ ঘন্টা) পর্যন্ত সেগুলোকে আলদাভাবে রেখে নিরাপদ করা। বইয়ের কভারগুলির জন্য কিছুটা ক্ষারযুক্ত ক্লিনার ব্যবহার করা বা সম্পুর্ণ বইগুলোকে স্প্রে এর মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করা। বইগুলোকে কেন্দ্রীভূত ভাবে নিরাপদ করার পদ্ধতি সম্পর্কে ভাবার সময় এসেছে।
    • নিয়মিতভাবে পুরো লাইব্রেরীকেই জীবাণুমুক্তকরণ করার প্রক্রিয়াগুলি প্রয়োগ করা। লাইব্রেরীতে প্রবেশের সময়, কম্পিউটার ব্যবহার এবং চেক-আউট মেশিন ব্যবহারের আগে ও পরে ব্যবহারকারিদেরকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার নিশ্চিতসহ যেসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নেওয়া দরকার বলে মনে হয় সেগুলো সুনিশ্চিত করা।
    • গ্রন্থাগারে প্রবেশের দরজার হ্যান্ডেল,ব্যবহৃত কম্পিউটার-কীবোর্ড,অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণ বা হেডসেটগুলি সবাই ব্যবহার করে থাকে। একজন থেকে অন্যজনে ডিভাইসগুলো ব্যবহারে ভাইরাসটি বহন করতে পারে তাই এগুলোও নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত।
    • কর্মীদের সুরক্ষিত থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব সেকশনগুলোতে যেমন, সার্কুলেশন, রেফারেন্স এ সর্বাধিক ব্যবহারকারির সংস্পর্শে আসা হয়, সেক্ষেত্রে সেখানে সেবাপ্রদানকারী ও গ্রহণকারীকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ডিজইনফ্যাক্ট স্প্রে, হ্যান্ড-গ্লাভস সরবরাহ করতে হবে। অফিসিয়াল কাজে ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলো ব্যবহারের আগে ও পরে জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করা। WHO কর্তৃক ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে বেশকিছু পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে, যেগুলো নিয়মিত মেনে চলার মাধ্যমে আক্রমণ হওয়া থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব। আমরা গ্রন্থাগারিকগণ এই পরামর্শগুলো মেনে ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে উৎসাহিত করে নির্দেশিকা প্রদান করতে পারি।
    • গ্রন্থাগারে অনলাইন পরিষেবা চালু এবং ক্ষেত্রবিশেষে বৃদ্ধি করা এবং তা প্রচার করা। ব্যবহারকারীদেরকে অনলাইন পরিষেবাগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করা এবং সেগুলো ব্যবহারে তাদের উৎসাহিত করা। অনলাইন পরিষেবাগুলো সঠিকভাবে প্রদানের জন্য গ্রন্থাগারিকদের নিজেদেরকে প্রশিক্ষিত করে তোলাও বাঞ্ছনীয়।
    • নিরাপদে গ্রন্থাগার ব্যবহারের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরী করা এবং সেগুলো ব্যবহারকারীদেরকে অনলাইনে এবং অনসাইটে নতুন নিয়ম সম্পর্কে স্পষ্টভাবে অবহিত করা।

গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, করোনভাইরাস বহনকারী উপাদানের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে এর সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে গ্রন্থাগার কর্মীদের সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। স্পষ্টতই, ভাইরাস থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে ব্যাক্তিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে আমাদের সবার সচেতনতা প্রয়োজন। সেইসাথে ব্যবহাকারীদের সাথে যেসব সেকশনে বেশি যোগাযোগ করতে হয় সেখানে কর্তৃপক্ষের যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে কর্মীদেরকে কাজে উৎসাহ যোগানো বাঞ্ছনীয়। স্পর্শবিষয়ক পরিষেবাগুলোতে ঝুঁকি কমাতে গ্রন্থাগারিকদের নিজ জায়গা থেকেও সচেতনতা কাম্য। সঠিক সময়ে, সঠিক ব্যবহারকারীকে, সঠিক তথ্যটি সরবরাহ করার পাশাপাশি ব্যবহারকারী এবং গ্রন্থাগারিক উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি। মহামারির এই পরিবর্তিত বাস্তবতা গ্রন্থাগার পেশাজীবীদেরকে আরো নতুন অনেক ভাবনায় উৎসারিত করবে বলে মনে করি।

তথ্যসূত্রঃ ইফলা ওয়েবসাইট

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close