Blog Post

একবিংশ শতাব্দীর গ্রন্থাগারসমূহের কারুশৈলী

মাহাবুবা আক্তার

তিয়ানজিন বিনহাই লাইব্রেরিঃ 

তিয়ানজিন বিনহাই লাইব্রেরিপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় সারাবিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়, প্রযুক্তির কল্যাণে আদতে কাগজি বই এর গুরুত্ব কমলেও মূলত তামাম দুনিয়ায় লাইব্রেরির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বেড়েই চলেছে। অর্থনৈতিক পরাশক্তির দেশগুলোর অন্যতম দেশ হলো চীন। ২০১৭ সালে সারাবিশ্বকে অবাক করে, নান্দনিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে রাজধানী বেইজিং এর অনতিদূরে চীন নির্মাণ করেছে তিয়ানজিন বিনহাই লাইব্রেরি। লাইব্রেরিটির সংক্ষিপ্ত রূপ The eye যার অর্থ চোখ। লাইব্রেরির গতানুগতিক ধারণা থেকে বের হয়ে সম্পুর্ণ ভিন্ন আংগিকে ও আধুনিক নকশায় নির্মাণ করা হয়েছে লাইব্রেরিটি।

লাইব্রেরিটির ডাক  নাম The Eye কারণ এর গঠন চোখ এর মতোই। ৩৩৭০০ বর্গমিটার আয়তনের পাঁচ তলা বিশিষ্ট লাইব্রেরিটিতে বই রাখার জন্য মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ঢালাই করা স্তর রয়েছে যেখানে প্রায় ১.২ বিলিয়ন বই রাখা সম্ভব। মূল কক্ষেই একটি করিডোর রয়েছে, যেখানে একই সাথে ১১০ জন মানুষ হাঁটাচলা করতে পারেন। প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় মূলত বই পড়ার কক্ষ এবং লাউন্জ রয়েছে। অন্যান্য তলায় রয়েছে কম্পিউটার কক্ষ এবং সাক্ষাৎকার কক্ষ ,পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানোর জন্য রয়েছে ভিন্ন কক্ষ। নীচতলা শিশুদের বই পড়ার জন্য খোলা রাখা হয়েছে। ছাদের উপরের অংশে বহিঃপ্রাঙ্গণ সহ একটি বড় অডিটোরিয়াম রয়েছে, রয়েছে আধুনিক সংগ্রহশালার ব্যবস্থা। নিচ তলায় রয়েছে বড়দের জন্য কম্পিউটার সুবিধা ,লাউঞ্জসহ আধুনিক শ্রবণকক্ষ। শুধু বই এর লাইব্রেরি হিসেবে নয়, এটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ভাবা হচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ লাইব্রেরিটি দেখতে ভিড় করছেন। এ যেন লাইব্রেরি নয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক, গবেষণা কেন্দ্রের মেলবন্ধন। এই লাইব্রেরিটির গঠনশৈলী চোখ এর আদলে নেদারল্যান্ড ভিত্তিক একটি কোম্পানি নির্মাণ করে। এটিকে ভবিষ্যত লাইব্রেরি নির্মাণের অনন্য মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে সারাবিশ্ব জুড়ে।

প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিঃ

২০২০ সালে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় তুর্কি রাষ্ট্রপতির আবাসস্থল প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে তুরস্কের বৃহত্তম গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। গ্রন্থাগারটির নামকরণ করা হয় প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি। ২০১৬ সালে গ্রন্থাগারটির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন স্বয়ং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্, বুদ্ধিজীবী, গবেষকদের পরামর্শে গড়ে ওঠে গ্রন্থাগারটি। দীর্ঘ ৩ বছর ধরে নির্মাণ শেষে ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি গ্রন্থাগারটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উজবেকিস্তানের রাষ্ট্রপতি শাভকাত মির্জিয়োয়েভ।

প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি

গ্রন্থাগারটির আয়তন প্রায় ১২৫০০০ হাজার বর্গমিটার। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই গ্রন্থাগারটির সংগ্রহে বিশ্বের ১৩৪টি ভাষার ৪০ লক্ষাধিক বই, ১২ কোটি ইলেকট্রনিক সংস্করণ, ৫ লক্ষাধিকের অধিক ই-বুক, তুর্কি রাষ্ট্রীয় আর্কাইভের ৪ কোটি ৫০ লক্ষ ডকুমেন্ট, প্রায় ১২ কোটি আর্টিকেল ও প্রতিবেদন, ৬৫ লক্ষ ই –ডিসার্টেশন, রাষ্ট্রীয় আর্কাইভের ১২ লক্ষ অডিও ফাইল এবং ৬০ হাজার ম্যগাজিন রয়েছে।

শ্বেত ও মার্বেল পাথরে সজ্জিত গ্রন্থাগারে সেলজুক ও ওসমানীয় এবং আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন রয়েছে। গ্রন্থাগারটি আমানত গ্রন্থাগার, এখানে তুরস্কের প্রকাশিত বইসমূহ একটি কপি জমা দিতে হয়। বিদেশে অবস্থিত তুরস্কের দুতাবাস এর মাধ্যমে ‍সে দেশের  ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্বন্ধের বই সমূহ সংগ্রহ করে ‘বিশ্ব গ্রন্থাগার’ সেকশনে রাখা হয়। গ্রন্থাগারের অন্যতম আকর্ষণ সিহান্নুমা হলঘর বা বৈশ্বিক মানচিত্রাবলী। ৩,৫০০ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে হলঘরে গম্বুজটির ভূমি থেকে উচ্চতা ৩২ মিটার এবং ২৭ মিটার প্রস্থ। গম্বুজটির ১৬ টি স্তম্ভ প্রধান আকর্ষণ, ১৬ টি তুর্কি সাম্রাজ্য- হুন সাম্রাজ্য, পশ্চিম হুন সাম্রাজ্য, ইউরোপীয় হুন সাম্রাজ্য, শ্বেত সাম্রাজ্য, গোকতুক সাম্রাজ্য, অ্যাভার খাগনাত সাম্রাজ্য, উইঘুর খানাত, তৈমুরীয় সাম্রাজ্য, ওসমানীয় সাম্রাজ্য, গজনভী ,মুঘল ও ওসমানীয় সাম্রাজ্যের নিদর্শন রয়েছে।

গবেষণা গ্রন্থাগারে রয়েছে প্রায় ২,০০০ বই যেখানে দলগত অধ্যয়নের জন্য ২০ টি কক্ষ রয়েছে। সাময়িকী হলঘরে ১,৫৫০টি সংবাদপত্রের বিভিন্ন সংস্করণ, মাল্টিমিডিয়া স্কিনটাচ মনিটরের সাহায্যে ১২০ টি দেশের প্রায় ৭০০০ দৈনিক পত্রিকা একসাথে পাওয়া যায়। গ্রন্থপ্রেমী ভজনরসিকদের জন্য রয়েছে একটি সুসজ্জিত রেস্তোরা ও বেকারি। বইয়ের শেল্ফগুলোকে দাঁড় করালে ২০১ কি.মি. জায়গা জুড়ে বিস্তৃত হবে। এই গ্রন্থাগারটি দিনে ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে, যেখানে তুর্কি নাগরিক বা বিশ্বের যেকোনো পাসপোর্টধারী ব্যক্তি অনায়াসে গিয়ে বই পড়তে পারে এবং দিনে ৫,০০০ পাঠককে অনায়াসে গ্রন্থাগারের সেবা দিতে পারে। মাল্টিমিটিয়া গ্রন্থাগার সেকশনে ৪টি ডিজিটাল কক্ষ রয়েছে, সেগুলোর অভ্যন্তরে ১২ টি পাঠকক্ষ রয়েছে। শিশুদের জন্য ২টি ভাগে গ্রন্থাগার রয়েছে। ডিজিটাল কক্ষ গুলোতে রয়েছে মাল্টিমিডিয়া কক্ষ, টিআরটি আর্কাইভ থেকে লক্ষ লক্ষ অডিও ফাইল। দুষ্প্রাপ্য বইয়ের গ্রন্থাগারে রয়েছে মাহমুদ কাশগড়ি কর্তৃক রচিত অভিধান, তুর্কি কলামিস্ট সেভকেতসহ ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন দুষ্পাপ্য ২০,০০০ বইয়ের ভান্ডার। তুর্কি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এই গ্রন্থাগার নির্মাণে সরকার সবচেয়ে বেশী ব্যয় করেছে। এটি তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের সর্ববৃহৎ আধুনিক গ্রন্থাগার।

মোদ্দাকথা হলো গ্রন্থাগার গুলোতে সংগ্রহের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে নান্দনিকতার ছোয়া। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অপ্রিয় সত্য হলো যে মসজিদে এয়ারকুলার সুবিধা রয়েছে মুসল্লিরা সে মসজিদেই নামাজে যেতে চান। ধর্মীয় উপাসনালয়ের পরে গ্রন্থাগার হলো দ্বিতীয় বৃহত্তম শান্তির জায়গা, যেখানে সব শ্রেণির মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানুষকে গ্রন্থাগারমুখী করতে আধুনিকতার পাশাপাশি ব্যতিক্রমধর্মী স্থাপনার বিষয়টি খেয়াল রাখা জরুরী। দেশের বৃহৎ শপিং সেন্টার এবং রিসোর্টগুলো মানুষকে টানে কারণ এতে রয়েছে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা।

একাডেমিক গ্রন্থাগারগুলোতে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতকরা জরুরি। গ্রন্থাগারগুলোর সংগ্রহ সংখ্যা, মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার, ই-বুক, ই-জার্নাল এর সংগ্রহ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। গতানুগতিক গ্রন্থাগার ভবন নির্মাণের ধারণা থেকে বের হয়ে এই দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে নতুনত্বের মোড়কে সাজানো যেতে পারে আমাদের গ্রন্থাগারগুলোকে।

বই পড়ার গুরুত্ব কমলে চীনের মতো বিজনেস জায়ান্ট একটি রাষ্ট্র লাইব্রেরি নির্মাণে পিছিয়ে থাকতো। যুগোপযোগী গ্রন্থাগার নির্মাণ, পেশাজীবিদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধাসম্বলিত গ্রন্থাগার আমাদের সকলের প্রত্যাশা।


লেখকঃ মাহাবুবা আক্তার ,সহকারি লাইব্রেরিয়ান ,জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার দিনাজপুর।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close