Blog Post

উন্মুক্ত কেন্দ্রীয় গবেষণা পোর্টাল এর প্রয়োজনীয়তা

কনক মনিরুল ইসলাম:

পূর্বে গবেষণা বলতে কিছু গোপনীয় ব্যাপার বা দরজা জানালাবিহীন নথিপত্র বা তত্ত্বকে বুঝানো হতো, কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে গবেষকরা চান তাঁদের গবেষণার প্রচার-প্রসার। কারণ গবেষক জানেন তাঁর গবেষণার প্রচার ও প্রসার মানেই তাঁর গবেষণাকর্মের বেশি বেশি সাইটেশন (Citation) আর বেশি বেশি Citation  মানেই সেই গবেষণাকর্মের ইমপেক্ট ফ্যাক্ট্র বৃদ্ধি পাওয়া। তাই বর্তমানে কোন গবেষকই তাঁর গবেষণাকর্মকে আর নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতে চান না। গবেষক চান তাঁর গবেষণা উন্মুক্ত থাকুক সবার কাছে। একারণেই প্রতিনিয়ত ওপেন একসেস আন্দোলন জনপ্রিয় হচ্ছে। ওপেন একসেস এর উদ্দেশ্য হল এমন একটি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যার মাধ্যমে গবেষক বিনা খরচে তাঁর গবেষনার বিষয়ে ইতোপূর্বে হয়ে যাওয়া গবেষণাগুলোতে প্রবেশাধিকার পাবেন এবং একইসাথে পূর্বের গবেষক ও নতুন গবেষণাকারি উভয়ে লাভবান হবেন। বর্তমানে উন্মুক্ত গবেষণায় একটি শব্দ বহুল প্রচলিত, তা হলো প্ল্যাজিয়ারিজম (Plagiarism)। যার প্রকৃত অর্থ হলো অন্যের লেখা ও ধারণাকে নিজের বলে চালানো, যা যথাযথ সাইটেশন না দিয়ে কপি করলেই ধরা পড়বে প্ল্যাজিয়ারিজম  চেকার সফটওয়্যারে। গবেষণাপত্র থাকবে উন্মুক্ত, থাকবে বাধামুক্ত প্রবেশাধিকার। এই উদ্দেশ্যে উচ্চতর শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্মুক্ত গবেষণা পোর্টালের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এই ধরণের গবেষণা পোর্টালে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণাপত্রের ডিজিটাল সংস্করণ এবং স্বীকৃত গবেষণার প্রারম্ভিক সংক্ষেপ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে রিসার্চ ইন প্রগ্রেস (Research in progress) অন্তর্ভুক্ত থাকবে।গবেষণা

গবেষণাপত্র হলো প্রাথমিক, অতিমূল্যবান ও অনন্য তথ্য উৎস, যা যে কোন প্রকাশনা মাধ্যমে উপলব্ধ নয়। এই অতিমূল্যবান তথ্য উৎসের যথাযথ ব্যবহার ও গবেষণার মানকে উন্নতকরা জরুরী। এই সম্বন্ধে University Grants Commission of India (UGC) ২০১৬ সালে একটি নির্দেশনা জারি করেছিল যা ভারতবর্ষে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল গবেষণা রিপোজিটরির কাজকে অত্যন্ত বেগবান করেছিল। UGC যে নির্দেশনা দিয়েছিলো তা হলো

“The UGC Notification: (Minimum Standards in procedure for award of MPhil/ PhD degree Regulation, 2016) dated 5th May 2016 mandates submission of electronic version of thesis and dissertation by the researchers in Universities with an aim to facilate open access to Indian thesis and dissertation to the academic community world-wide.”

বাংলাদেশ সরকারও এমন একটি নির্দেশনা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে জারি করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি উম্নুক্ত গবেষণা রিপোজিটরি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।  UGC, India যে গবেষণা রিপোজিটরি প্রতিষ্ঠা করেছে তার নাম হলো শোধগঙ্গা (Shodhganga)। Shodh শব্দটি সংস্কৃতি ভাষা থেকে এসেছে। যার অর্থ হল গবেষণা ও অনুসন্ধান এবং Ganga হল ভারত বর্ষের পবিত্র নদী, যা ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীকভাবে জড়িত। সুতারাং বলা যায় শোধগঙ্গা হল ভারতীয় গবেষণার এক প্রবাহিত রূপ।আজ পর্যন্ত (১০ আগস্ট ২০১৯) Shodhganga এ অন্তর্ভুক্ত সম্পূর্ণলেখ্য (full-text) গবেষণাপত্রের সংখ্যা ২৩৬৬৩৯, গবেষণাসার (Synopses) ৬৪৫০, অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়য় ৩৯৭ এবং MOU স্বাক্ষর করা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সংখ্যা ৪৭০ টি।  বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শোধগঙ্গাতে অংশগ্রহণ ও উচ্চশিক্ষায় এর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ক্রমবর্ধমান।প্রতিনিয়ত গবেষকরা তাদের গবেষণাপত্রের ই-ভার্সন শোধগঙ্গাতে প্রকাশ করার প্রবনতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ গবেষণাপত্রের ই-সংস্করণ না থাকার কারনে সেগুলো একদিকে যেমন সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে এগুলো সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে দূরবর্তী কোন ব্যবহারকারী তাদের গবেষণার কাজে এই গবেষণাগুলো তাদের গবেষণা কাজে ব্যবহার করতে পারছে না। যেহেতু আমাদের কোন কেন্দ্রীয় গবেষণা সংরক্ষণ পোর্টাল নেই। তাই অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের গবেষণা পত্র বই আকারে বা নিজস্ব ওয়েব সাইটে সংরক্ষণ করে রেখেছে। তাই পেপার বেসড গবেষণাপত্রগলো একটি পোর্টালে সংরক্ষণ করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার হবে তাই এক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।  তবে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন একটি নির্দেশনামা জারী করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল গবেষণাপত্রের ই-সংস্করণ কপি কেন্দ্রীয় গবেষণা সংরক্ষণ পোর্টালে জমাকরাকে আবশ্যিক করলে এই কেন্দ্রীয় গবেষণা সংরক্ষণ পোর্টাল দ্রুত সমৃদ্ধ হবে। তাহলে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণাপত্রের ডিজিটাল সংস্করণ এবং স্বীকৃত গবেষণার প্রারম্ভিক সংক্ষেপ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে রিসার্চ ইন প্রগ্রেস (Research in progress) জানতে পারবো। বাংলাদেশের জাতীয় গবেষণা পোর্টলটি হবে উন্মুক্ত গবেষণা রিপোজিটরী যা বাংলাদেশের গবেষকদের গবেষণাপত্রের একটি উন্মুক্ত তথ্য ভান্ডার  যেখানে গবেষণাপত্র গুলো নিয়মাতান্ত্রিক উপায়ে সংরক্ষণ ও বিতরণ করা হবে। তবে ইহার সংরক্ষণ, বিতরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক পরিচালিত হবে।

গবেষণা হল পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের দ্বারা স্বীকৃত কোনো সমস্যা সমাধানে উপনীত বিশেষ জ্ঞান। প্রতিটি গবেষণায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হয় সমাজ কেন্দ্রিক। তাই গবেষণা সর্বসাধারণের কাছ তুলে ধরার জন্যে একটি কেন্দ্রী গবেষণা পোর্টল প্রতিষ্ঠ এখন সময়ের দাবী আমরা যত তাড়াতাড়ি এই পোর্টাল প্রতিষ্ঠা করতে পারবো ততই আমাদের গবেষকদের সমাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক স্থরেও আমাদের গবেষণা তুলে ধরতে একটি প্লাটফরম সৃষ্টির পাশাপাশি আমাদের গবেষকদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সুনিশ্চিত হবে।

তথ্যসূত্র:

ক) About Shodhganga’’ https://shodhganga.inflibnet.ac.in/
খ) Patra, Sukata K and Das, Mousmi (2017). National Level ETD Efforts in ‘’Shodhganga’’ a platform of reserach output in Indian Universities: A Comparative study. ETD 2017: symposium 7-9 Aug 2017, Washington DC.
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close