Blog Post

অনলাইন শিক্ষায় গ্রন্থাগারঃ প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

কনক মনিরুল ইসলাম

অনলাইন শিক্ষায় গ্রন্থাগারঃ প্রত্যাশা ও বাস্তবতাশিক্ষা বা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে গ্রন্থাগার প্রসঙ্গটি অনিবার্যভাবে এসে যায়। শিক্ষাব্যবস্থা ও গ্রন্থাগার একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষা প্রদানে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অনিস্বীকার্য। সাধারণ শিক্ষা বা অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে এবং ছাত্র ও শিক্ষকদের মননশীলতা সৃষ্টির প্রয়াসে দীর্ঘকাল যাবত গ্রন্থাগারের ব্যবহার প্রায় সকল দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হয়ে আসছে।

করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর সবার আগেই বন্ধ হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। করোনার কারণে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থ্যা। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সকলেই চিন্তিত। অভিভাবকদের মাঝে সংশয় ও তীব্র আশংকা যে কি হবে তাদের সন্তানের শিক্ষার ভবিষ্যৎ? এবং কেমন করে শেষ হবে এই শিক্ষাবর্ষ? ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যেও রয়েছে নানা কৌতুহল!  তারা আদৌ পরীক্ষা দিতে পারবে কি না! স্কুল কতদিন এভাবে চলবে! পড়াশোনার কি হবে? আর তাই এই সময়ে আমাদের নীতি নির্ধারকদের মূল ভাবনা কিভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনামুখী করা যায়। কোভিড-১৯ এর ফলে সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক যেখানে ঘরবন্দি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহও তালাবদ্ধ এবং কাঠামোবদ্ধ শিক্ষার পরিবেশ একেবারে অসম্ভব, সেখানে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাই এখন অন্যতম উপায়। এখন কেবল অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাই আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনামুখী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষাধারা অব্যাহত রাখার প্রয়াসে চালু করেছে `আমার ঘরে আমার বিদ্যালয়` নামে বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রমের।

মূল আলোচনার পূর্বে প্রথমেই দৃষ্টিপাত করা যাক, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। অনলাইন শিক্ষা হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যা সাধারণ শ্রেণি শিক্ষা থেকে ব্যতিক্রম এবং এটি একটি ডিজিটাল শিক্ষা পদ্ধতি যা বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন হয় আধুনিক প্রযুক্তি তথা কম্পিউটার, মোবাইল কিংবা এ জাতীয় কোন ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগ তা হতে পারে নেট ডাটার মাধ্যমে বা ওয়াই-ফাই বা ব্রডব্যান্ড সংযোগের মাধ্যমে সংযোগকৃত। অনলাইন শিক্ষায় একজন শিক্ষক ক্লাশরুমের বাইরে সুবিধাজনক যে কোন স্থান থেকে পাঠদান করেন এবং শিক্ষার্থীগণ নিজ নিজ বাড়ীতে থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে লাইভ ক্লাশে অংশগ্রহন করে ও পারস্পারিক মতবিনিময় করে থাকে। শুধুমাত্র স্বশরীরে উপস্থিতি ছাড়া একাডেমিক বাস্তব ক্লাশের সাথে অনলাইন ক্লাশের কোন পার্থক্য নাই।

আমাদের দেশে গতানুগতিক শিক্ষা ধারায় ছাত্র-ছাত্রীরা বই গুছিয়ে ও কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দলবল বেধে একসাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার মাঝে অনেক আনন্দ পায়। একই শ্রেণিকক্ষে বসে সরাসরি শিক্ষকদের কাছ থেকে বিদ্যা নেয়ার তৃপ্তিই আলাদা। কিন্তু, করোনা সংকট যদি চলতে থাকে দীর্ঘকাল তাহলে তো আমাদেরকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। তাই আবশ্যক হয়ে উঠেছে অনলাইনে শিক্ষা ধারা অব্যাহত রাখার। অনলাইনে শিক্ষা ধারার সবচেয়ে বড় উপকার হলো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক তাদের পাঠদান ও গ্রহণ তাদের ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস এ সেভ করে রাখতে পারে, যা পরবর্তীতে পুনরায় ডাউনলোড করে পাঠ অনুস্মরণ করতে পারে।

আপদকালীন এ সময়ে অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি যে অতি গুরুত্বপুর্ণ তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। পৃথিবীর সকল দেশই এখন এ পদ্ধতির উপর নির্ভর করে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রথম দিকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও এখন অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রীরা এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। অনলাইন শিক্ষার সুবিধা হলো শিক্ষার্থীরা যেকোনো জায়গা থেকে ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারে।  এমনকি যদি কেউ ক্লাসে যোগ দিতে না পারেন তবুও সে কোর্স শিক্ষকের দেওয়া লেকচার রেকর্ড এবং শিক্ষার অন্যান্য উপকরণ থেকে শিখে নিতে পারেন।

করোনাকলীন সময়ে ছাত্র ছাত্রীদের এখন আর স্কুল-কলেজে যাওয়ার সুযোগ নেই তাই অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাই এখন গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। আর এই অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাকে ফলপ্রসূ ও শক্তিশালী করতে করতে প্রয়োজন অনলাইন গ্রন্থাগারের। আপদকালীন এ সময়ে গ্রন্থাগারিকগণ গতানুগতিক গ্রন্থাগার সেবার পরিবর্তে অনলাইন গ্রন্থাগার সেবা প্রবর্তন করে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো বেশী কার্যকর করতে পারে। অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি রেফারেন্স বই সমূহের প্রয়োজন বেশী হয় । এক্ষেত্রে গ্রন্থাগারিকগকে তাদের প্রয়োজনীয় গ্রন্থাগার সমগ্রীকে ডিজিটাল ভার্সনে রূপান্তর করে অনলাইনে ব্যবহার উপযোগী করতে পারে। এছাড়া ইন্টারনেটে কিছু অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা পোর্টাল বা সাইট আছে যেগুলো সকলের ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত; সেগুলোকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নামে তৈরি করা গ্রুপ বা পেজে প্রকাশ করে ছাত্র-ছাত্রীদের ঘরে বসে লেখা পড়া নিশ্চিত করতে পারে । বেশ কিছু সহজ সুবিধা থাকার পরও স্কুল পর্যায়ে এ দেশে অনলাইনে শিক্ষা দেওয়াটা অনেক কঠিন। এ ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারিকগণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত মাধ্যমিক–উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার বিভিন্ন রিসোর্স শেয়ার করতে পারে যেগুলো খুবই জনপ্রিয় । এগুলোর সঙ্গে যদি নিয়মিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলোর ভিডিও–অডিও’র কিউআর কোড শেয়ার করা যায়, তাহলে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা পৌঁছে যাওয়া যাবে অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে ।

ইতোমধ্যে অনলাইন লাইব্রেরি বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকারি বেসরকারি বেশকিছু লাইব্রেরি অনলাইনে রূপান্তরিত হয়েছে । এই সকল অনলাইন লাইব্রেরিতে ই-বুক (e-book), ই-জার্নাল (e-journal) সহ বিভিন্ন পাঠ্য উপকরণের বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কাগজের ছাপা বইয়ের থেকে ‘ই-বুক’ মানুষের কাছে আরো বেশী জনপ্রিয়। বিশেষ করে প্রাচীন ও পুরানো বই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অনলাইন লাইব্রেরি খুবই কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে। এই সকল অনলাইন লাইব্রেরি থেকে ছাত্র-শিক্ষকগণ তথ্য সেবা গ্রহণ করে অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতিকে আরো বেশী কার্যকর করতে পারে ।

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইন লাইব্রেরিগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও গবেষকদেরও সহায়তা করতে পারে। অনলাইন লাইব্রেরি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও গবেষকরা মেডিসিন, কম্পিউটার, জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, ধর্মবিষয়ক অনেক বই সংগ্রহ করতে পারে । বিভিন্ন গবেষণামূলক বই সংগ্রহের জন্যে ‘ওয়েব বুকস.কম’ (www.web-books.com) ‘ই বুকস রিড’ (www.ebooksread.com) হতে পারে একটি আদর্শ প্লাটফরম । এছাড়া গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে www.freetechbooks.com । গণিত, কম্পিউটার ও প্রোগ্রামিং বিষয়ের বইয়ের বিশাল সংগ্রহশালা হলো- www.freecomputerbooks.com। এ ছাড়াও আপনি ঢুঁ মারতে পারেন www.onlinefreeebooks.net/engineering-ebooks ঠিকানায়। সব বইযে শুধু বিজ্ঞান নিয়েই, তা কিন্তু নয়। কয়েক হাজার ব্যবসায় শিক্ষার বই সংগ্রহে রয়েছে www.free-ebook-download.net/business-book লাইব্রেরিতে । এছাড়া ব্যবসা, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনার বই ফ্রি ডাউনলোড করা যাবে www.free-ebooks.net/?category=Business এই ওয়েব লিংক থেকে । শিক্ষার্থীদের গণিত শিখতে ও জানতে সহায়ক হবে www.mathebook.net। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ‘গণিত অভিধান’ যুক্ত করা হয়েছে সাইটটিতে । গণিত বিষয়ক বই পাওয়া যাবে এমন আরেকটি ওয়েবসাইট হচ্ছে www.xpmath.com/ebooks/math_ebooks.php । বিশ্বের কয়েক হাজার কবির কবিতা পড়া ও ডাউনলোড করা যাবে www.poemhunter.com/eBooks ওয়েবসাইট থেকে ।

অনলাইন শিক্ষকতার অদ্ভুত নিয়মকানুন সম্পর্কে এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি খুব জরুরি শিক্ষা প্রদানের বিভিন্ন বিষয়কে প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো । বিভিন্ন পর্যায়ে কীভাবে অনলাইনে, এক বা একাধিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কোর্স কনটেন্ট বানানো যায় আর শিক্ষা প্রদান করা যায়, সেটা নিয়ে এখন কাজ না করলে বাকি সব উদ্যোগ সফল হবে না ।

শিক্ষা ধারাকে অব্যাহত রাখতে অত্যাধুনিক শিক্ষার মাধ্যম ও শিক্ষা উপকরণ আমাদের ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দিতে পারলে একবিংশ শতাব্দীর যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা সফল হবো।  এজন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারগুলোকে একসাথে কাজ করতে হবে। বলা যেতে পারে অনলাইন শিক্ষাকে কার্যকর করতে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। করোনাকালীন সময়ে অন লাইন শিক্ষা ব্যবস্থা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চাহিদা সমপন্ন করলেও ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীলতা ও মননশীলতা সৃষ্টিতে গ্রন্থাগারের ভূমিকাই অগ্রণী।


লেখক: কনক মনিরুল ইসলাম

সম্পাদকীয় মন্ডলীর সদস্য, লাইব্রেরিয়ার ভয়েস।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close